দুই মাস আগে যেটা ছিল শুধু একটা অনলাইন ব্যঙ্গ, আজ সেটাই নরেন্দ্র মোদির ১২ বছরের শাসনের সবচেয়ে বড় রাজপথ-চ্যালেঞ্জ। ককরোচ জনতা পার্টির ডাকে দিল্লির যন্তর মন্তরে হাজারো তরুণের অবস্থান, দাবি একটাই, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। প্রশ্ন ফাঁস, বেকারত্ব আর জবাবদিহির ক্ষোভ এক জায়গায় এসে মিশেছে। আর পাশের দুই দেশে, বাংলাদেশ ও নেপালে, ঠিক এই ধাঁচের তরুণ আন্দোলন সরকার ফেলে দেওয়ায় প্রশ্নটা আরও জোরালো হয়ে উঠছে, মোদি সরকার কি সত্যিই বিপদে?
উত্তর খুঁজতে হলে তিনটা জিনিস আলাদা করে দেখা দরকার, ঝুঁকিটা ঠিক কোথায়, ইতিহাস কী শেখায়, আর কোন কাঠামোগত দেয়াল ভারতে এই ধরনের পতনকে কঠিন করে রাখে।
গত এক সপ্তাহে যা যা ঘটল
ঘটনাগুলো দ্রুত সাজিয়ে নেওয়া যাক, কারণ প্রতিটা ঘটনাই মোদি সরকারের ওপর আলাদা রকম চাপ তৈরি করেছে।
২০ জুলাই, সংসদ অভিমুখে মিছিলে পুলিশের কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ। দিল্লি পুলিশের হিসাবেই আহত প্রায় ১৮০ জন, আটক ৭০।
সপ্তাহজুড়ে দিল্লি মেট্রোর একের পর এক স্টেশন বন্ধ, মধ্য দিল্লিতে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ, কলকাতা থেকে সিআরপিএফের ২০ কোম্পানি বিমানে দিল্লি আনা।
আন্দোলন দিল্লি ছাড়িয়ে মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, পাটনা, কলকাতা, হায়দরাবাদ, লখনৌসহ নানা শহরে ছড়িয়ে পড়া।
বৃহস্পতিবার গভীর রাতে মোদির প্রথম ভিডিও বার্তা, প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে কঠোর আইন আর ফাস্ট ট্র্যাক আদালতের ঘোষণা। পরদিন দ্বিতীয় একটি ভিডিও, এবার শুধু তরুণদের ‘ধন্যবাদ’।
শুক্রবার ভোরে সোনম ওয়াংচুকের ২৬ দিনের অনশন ভাঙা, আর দুপুরে সরকারের দুই মন্ত্রীর সঙ্গে সিজেপি প্রতিনিধিদের প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক।
একই দিনে মন্ত্রিসভায় পরীক্ষা-আইনের সংশোধনী অনুমোদন, উচ্চশিক্ষা সচিব বদল। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ নিয়ে সরকার একচুলও নড়েনি।
এই টুকরোগুলোর মধ্যেই আসল কথাটা আছে, দুই মাস গা না করার পর সরকার হঠাৎ এক সপ্তাহে এতগুলো পদক্ষেপ নিয়েছে। এটাই সবচেয়ে বড় প্রমাণ যে চাপটা ঠিকমতই পড়েছে মোদি সরকারের উপরে।
দুই ভিডিওর রাজনীতি
নরেন্দ্র মোদির ভিডিও দুটো আলাদা করে দেখা দরকার, কারণ এখানেই মোদি সরকারের কৌশল ধরা পড়ে।
প্রথম ভিডিওতে ছিল শাস্তির কথা, ব্যবস্থা সংস্কারের কথা নয়। আন্দোলনকারীরা ঠিক এই ফাঁকটাই ধরেছেন, প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার পর কে জেলে গেল সেটা মূল প্রশ্ন নয়, প্রশ্ন হলো ফাঁস হয় কেন। সিজেপির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা ফাস্ট ট্র্যাক আদালতের প্রস্তাবকে ‘শুধু নজর ঘোরানোর কৌশল’ বলেছেন। কংগ্রেসের খোঁচাও জোরালো, সংসদ চলাকালে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী সংসদে না বলে মধ্যরাতে ভিডিও বানাচ্ছেন কেন।
দ্বিতীয় ভিডিওর তাৎপর্য বিষয়বস্তুতে নয়, কৌশলে। প্রথম ভিডিও ২৪ ঘণ্টায় ৩০ কোটির বেশি ভিউ পেয়েছে, মোদির ইনস্টাগ্রাম অনুসারী দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ কোটি ১০ লাখে। যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনের জন্ম, সরকার এখন সেটাকেই পাল্টা অস্ত্র বানাতে চাইছে, লড়াইটাকে রাজপথ থেকে আবার অনলাইনে ফিরিয়ে নিতে চাইছে যেখানে সংখ্যা তার পক্ষে।
খেয়াল করার মতো বিষয় হলো, দুই ভিডিওর একটিতেও পুলিশি দমন বা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ নিয়ে একটি শব্দও নেই।
মোদি সরকারের ঝুঁকি কোথায়
মোদি সরকারের আসল বিপদ সংখ্যায় নয়, অন্য জায়গায়। পাঁচটা লক্ষণ আলাদা করে দেখা দরকার, কারণ একসঙ্গে এগুলোই মোদি সরকারের জন্য বিপজ্জনক।
প্রথম বিপদ, আন্দোলন আর ছাত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। লেখক অরুন্ধতী রায়, অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ ও রত্না পাঠক শাহ, অর্থনীতিবিদ জয়তী ঘোষসহ বিশিষ্ট নাগরিকদের যৌথ বিবৃতি, অরিজিৎ সিং থেকে শাবানা আজমি পর্যন্ত শিল্পীদের সংহতি, প্রকাশ রাজের হাতে সংবিধান নিয়ে বিক্ষোভস্থলে বক্তৃতা, সবই আন্দোলনের সামাজিক বৈধতা বাড়াচ্ছে। এর রাজনৈতিক গুরুত্ব প্রতীকী নয়, কাঠামোগত। শিল্পী-লেখক-শিক্ষক যুক্ত হলে রাষ্ট্রের পক্ষে আন্দোলনকে ‘বিপথগামী তরুণদের কাজ’ বলে ট্যাগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিজেপির এক নেতা আন্দোলনকারীদের ‘দেশ ফাঁপা করে দিতে চাওয়া লোক’ বললেও, যত প্রতিষ্ঠিত মুখ যুক্ত হচ্ছে, এই বিজেপির দাবি তত অকার্যকর হয়ে পড়ছে।
দ্বিতীয় বিপদ, প্রধান বিরোধী দলের যুক্ত হওয়া। রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী মোদির বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন, পুলিশ তাঁদের আটকও করেছে। রাস্তার ক্ষোভ এখন কংগ্রেসের মাধ্যমে ভারতীয় সংসদে ঢুকছে, বিরোধীরা টানা কয়েক দিন অধিবেশন অচল করে রেখেছে। এটা আন্দোলনের জন্য একই সঙ্গে নতুন শক্তি আর নতুন ঝুঁকি, কারণ তরুণরা চাইবে কি না তাদের আন্দোলন একটা পুরনো দলের ছায়ায় চলে যাক, সেটাও একটা প্রশ্ন।
তৃতীয় বিপদ, নৈতিক। ২০ জুলাইয়ের মিছিলে পেলেট গান ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। দিল্লি পুলিশ একে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বললেও হাসপাতালের নথি অন্য কথা বলছে, দুই বিক্ষোভকারীর চোখ থেকে অস্ত্রোপচার করে ধাতব ছররা বের করা হয়েছে বলে খবর। ‘পেলেট গান’ ভারতে এতদিন কাশ্মীর-মণিপুরের মতো সংঘাত এলাকার সঙ্গে যুক্ত ছিল। রাজধানী দিল্লিতে শিক্ষার্থীদের ওপর তা ব্যবহৃত হয়েছে কি না, এই প্রশ্নই মোদি সরকারের জন্য বিব্রতকর। বিষয়টি প্রমাণিত হলে এটা আন্দোলনের সবচেয়ে বড় নৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠবে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টিও পুলিশের বলপ্রয়োগের নিন্দা করেছে।
চতুর্থ বিপদ, গণমাধ্যম নিয়ে আস্থার সংকট। ভারতের বড় টিভি চ্যানেল আর সংবাদপত্রের একটা বড় অংশকে সমালোচকরা ‘গদি মিডিয়া’ বলে ডাকেন, অর্থাৎ যে মিডিয়াগুলো সরকারের কোলে বসে আছে। ককরোচ আন্দোলনে সেই অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে। অনেক তরুণের ক্ষোভ, মূলধারার চ্যানেলগুলো শুরুতে যন্তর মন্তরের হাজারো মানুষের খবরই দেখায়নি, বরং প্রশ্ন ফাঁসের বদলে আন্দোলনের ‘বিশৃঙ্খলা’কেই বড় করে দেখিয়েছে। খোদ সাংবাদিকরাও বিক্ষোভস্থলে বাধার মুখে পড়েছেন। কর্মরত কয়েকজন সাংবাদিক জানিয়েছেন, পুলিশ তাঁদের ছবি তুলতে বা সরাসরি সম্প্রচার করতে দেয়নি, ক্যামেরা সরিয়ে দিয়েছে। আর ২০ জুলাইয়ের লাঠিচার্জে অন্তত একজন সাংবাদিক আহত হয়েছেন। মধ্য দিল্লিতে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ রাখাও ছবি আর ভিডিও বাইরে যাওয়া ঠেকিয়েছে। এর ফল হয়েছে উল্টো, তরুণরা টিভির ওপর আস্থা হারিয়ে নিজেরাই ইনস্টাগ্রাম আর ইউটিউবে সরাসরি সম্প্রচার শুরু করেছে। আর সেভাবেই আন্দোলন সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে। অর্থাৎ প্রচারমাধ্যম চেপে ধরার চেষ্টা আন্দোলনকে থামায়নি, বরং তাকে নতুন মঞ্চে ঠেলে দিয়েছে।
পঞ্চম এবং সবচেয়ে গভীর বিপদ, প্রাতিষ্ঠানিক পথগুলো ছোট হয়ে আসা। একটা গণতন্ত্রে আন্দোলনের চাপ সামলানোর তিনটি পথ থাকে, সংসদ, আদালত আর নির্বাহী বিভাগ। এই মুহূর্তে সংসদ অচল, প্রধান বিচারপতি পুলিশি নির্যাতনের অভিযোগের জরুরি শুনানি নাকচ করেছেন, আর সরকার আলোচনায় বসেও মূল দাবি মানছে না। উল্লেখ্য, এই একই বিচারপতির মন্তব্য থেকেই আন্দোলনের জন্ম, ফলে বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতার প্রশ্নও এখন এর অংশ। এই পথগুলো যত বন্ধ হয়, রাস্তার গুরুত্ব তত বাড়ে। বাংলাদেশ-নেপালের অভিজ্ঞতা এটাই বলে, ভেতরের প্রচলিত পথ বন্ধ হয়ে গেলে মানুষ বাইরের ভিন্ন পথ বেছে নেয়।
ভারতে রাস্তার আন্দোলনের ইতিহাস
ভারতে রাস্তার আন্দোলনের ইতিহাস দীর্ঘ, কিছু আন্দোলন সরকার নাড়িয়েছে, কিছু নীতি বদলেছে, কিন্তু সরাসরি কেন্দ্রীয় ক্ষমতা ফেলে দেওয়ার নজির আসলে নেই।
জেপি আন্দোলন: সবচেয়ে কাছের উদাহরণ ১৯৭৪-৭৫ সালের জেপি আন্দোলন। ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে বিশাল ছাত্র-জনতার ক্ষোভ, কিন্তু সেই আন্দোলন সরকারকে সরাসরি রাস্তায় ফেলতে পারেনি, উল্টো জরুরি অবস্থা এসেছিল। ক্ষমতার হাতবদল হয় ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে গিয়ে। অর্থাৎ আন্দোলন ক্ষেত্র তৈরি করেছিল, চূড়ান্ত কাজটা করেছিল ব্যালট।
আন্না হাজারের আন্দোলন: ২০১১ সালের আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন দিল্লিতে লাখো মানুষ নেমেছিল, সরকারকে লোকপাল বিল আনতে বাধ্য করেছিল। কিন্তু সেটিও কেন্দ্রীয় সরকারকে সরাতে পারেনি, বরং তার ভেতর থেকে জন্ম নেয় ‘আম আদমি পার্টি’, যারা পরে নির্বাচনী রাজনীতিতে জায়গা করে নেয়। ককরোচ পার্টির জন্য এই উদাহরণটাই সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক, রাস্তার ক্ষোভ শেষ পর্যন্ত ব্যালট বাক্সে রূপ নিয়েছিল, রাস্তায় নয়।
সংরক্ষণ-বিরোধী মণ্ডল আন্দোলন: ১৯৯০ সালের সংরক্ষণ-বিরোধী মণ্ডল আন্দোলন কেন্দ্রীয় রাজনীতির ভোট-সমীকরণ আর জাতপাতের হিসাব বদলে দিয়েছিল।
নকশালবাড়ি আন্দোলন: ১৯৬৭ সালের নকশালবাড়ি আন্দোলন বামপন্থী রাজনীতিকে নতুন খাতে নিয়েছিল, যার রেশ কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা নীতিতে বহুদিন থেকে গেছে।
আর ভারতের স্বাধীনতার আগে লবণ সত্যাগ্রহ দেখিয়েছিল, একটা ছোট্ট প্রতীকী দাবি কীভাবে সারা ভারতবর্ষকে এক করতে পারে, ঠিক যেমন আজ ‘ককরোচ’ নামটা অপমানকে গণবিক্ষোভে বদলে দিয়েছে।
প্রতিটা আন্দোলনের প্রভাব আলাদা, কিন্তু মিল এক জায়গায়, যে আন্দোলনগুলো সত্যিকার বড় দাগ কেটেছে। সহজ কথায়, ভারতে রাস্তার আন্দোলন করে সরকার ফেলে দেওয়া কঠিন। সরকার বদলায় গণতান্ত্রিক ভোট, আর সেই আন্দোলনই ভোটের মাঠটা তৈরি করে দেয়।
যে দেয়াল ভারতে পতনকে কঠিন করে
সম্প্রতি বাংলাদেশ-নেপালে যা হলো, ভারতে তা কেন কঠিন? উত্তরটা কয়েকটা কাঠামোগত কারণে।
আকার আর বৈচিত্র্য: নেপাল তিন কোটি, বাংলাদেশ প্রায় বিশ কোটির দেশ, দুটোই মোটামুটি একরকম ভাষাগত ও রাজনৈতিক গঠনের। ভারত ১৪০ কোটি, ২৮ রাজ্য, শতাধিক ভাষা, প্রতি রাজ্যে আলাদা রাজনৈতিক সমীকরণ। দিল্লিতে জোরালো আন্দোলন তামিলনাড়ু, পশ্চিমবঙ্গ বা কেরালায় একই গতিতে ছড়াবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
নিরাপত্তা কাঠামো: সংবিধানে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা মূলত রাজ্যের বিষয়, তাই বিক্ষোভের দায় প্রথমে রাজ্যের ওপর পড়ে, কেন্দ্র দূরত্ব রাখতে পারে। বাহিনী বিশাল, প্রয়োজনে যেকোনো জায়গায় সরানো যায়, কলকাতা থেকে সিআরপিএফ আনার ঘটনাই তার প্রমাণ। আর পাঁচ বছর পরপর নির্বাচন ক্ষোভ প্রকাশের একটা প্রাতিষ্ঠানিক পথ সবসময় খোলা রাখে, যে পথ বাংলাদেশ-নেপালে কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
বিশেষজ্ঞরাও এই কাঠামোগত পার্থক্যেই জোর দিচ্ছেন। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের অধ্যাপক ডানকান গ্রিন ব্রিটিশ গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘আন্দোলন একা জেতে না, সরকারকেও হারতে হয়, আর সরকার তখনই পড়ে যখন রাষ্ট্রের নিজের প্রতিষ্ঠানে ফাটল ধরে, বিশেষ করে সেনাবাহিনী যখন সরকারকে পড়তে দেয়। যেসব আন্দোলন ব্যর্থ হয়, সেখানে রাষ্ট্র ঐক্যবদ্ধ থেকেছে, ভারতে এখনো প্রতিষ্ঠানগুলো তেমনই ঐক্যবদ্ধ।’
ভারতের মানুষ যতক্ষণ বিশ্বাস করে নির্বাচন আসছে আর ভোটেই এদের (সরকার) সরানো যাবে, ততক্ষণ এখনই টেনে নামানোর তাগিদ কম থাকে।
মধ্যবর্তী নির্বাচন কি সম্ভব
প্রশ্নটা উঠছে, তাই স্পষ্ট করে বলা দরকার। মধ্যবর্তী লোকসভা নির্বাচনের জন্য দরকার সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো, নয়তো প্রধানমন্ত্রীর নিজে থেকে লোকসভা ভেঙে দেওয়ার সুপারিশ। কোনোটাই এই মুহূর্তে ঘটছে না, এনডিএর সংখ্যাগরিষ্ঠতা ঠিক আছে, শরিকরাও সরেনি। বরং সরকার বিল পাস করিয়ে দেখাতে চাইবে যে তারা সাড়া দিয়েছে, তারপর সময় নেবে।
তাই বাস্তব প্রশ্নটা হলো, এই ক্ষোভ পরের নির্বাচনে কতটা ভোটে বদলে যাবে। ককরোচ জনতা পার্টি এখনো নিবন্ধিত দল নয়, তাদের সাংগঠনিক কাঠামোও নেই। প্রতিষ্ঠাতা ৩০ বছরের অভিজিৎ দীপকে বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জনসংযোগে স্নাতকোত্তর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে অস্ত্র বানানো তাঁর জানা। তবে বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বলে, প্রতিবাদের জন্য মানুষ জড়ো করা আর নির্বাচনে লড়ার মতো অবকাঠামো গড়া, দুটো সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস।
শেষ পরিণতি কী
পরিস্থিতি বিবেচনা করে মনে হচ্ছে মোদি সরকার এমন পথে হাঁটছে যা আসলে আইন, আদালত, সচিব বদল টাইপ পদক্ষেপ। কিন্তু জেন-জি ককরোচদের মূল দাবি ‘পদত্যাগ’ প্রশ্নে অনড়। মোদি সরকার শনিবার (২৫ জুলাই) দুপুর পর্যন্ত সময় চেয়েছে দাবির জবাব দেওয়ার জন্য, সেই জবাবই হয়তো এই আন্দোলনের গতিপথ ঠিক করে দেবে। জবাব পদত্যাগ না হলে আন্দোলন নতুন করে জোরালো হতে পারে। আর পদত্যাগ হলে সেটা হবে বিরাট ব্যতিক্রম, কারণ আন্দোলনের চাপে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর পদত্যাগের উদাহরণ বিরল।
সব মিলিয়ে বলতে গেলে মোদি সরকার এই মুহূর্তে ক্ষমতা হারানোর ঝুঁকিতে নেই, কিন্তু নতুন জেনারেশন তথা ভোটারদের কাছে তাদের ইমেজ সবচেয়ে শক্ত আঘাত খাচ্ছে। যে তরুণ ভোটারদের ভরসায় ২০১৪ সাল থেকে বিজেপি রাজনীতি সাজিয়েছে, আজ তারাই রাস্তায়।
এক কথায়, জেন-জি আর ককরোচদের এই আন্দোলন বিপজ্জনক হয়ে মোদি সরকারের মূল ভোটব্যাংকে ফাটল ধরাতে পেরেছে বললে ভুল হবে না। রাজনীতিতে সরকার পড়ে যাওয়া সবচেয়ে বড় ক্ষতি নয়, সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো নিজের ভোটব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হওয়া। ককরোচ আন্দোলনের আসল প্রভাব হয়তো দেখা যাবে ভারতের আগামী নির্বাচনে।
প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশের জন্যও ভারতের এই উত্তাল পরিস্থিতি শুধু প্রতিবেশীর খবর নয়। ভারতে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হলে বাণিজ্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আর আঞ্চলিক কূটনীতিতে তার ঢেউ লাগতে বাধ্য।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, রয়টার্স, এনপিআর, দ্য ইনডিপেনডেন্ট, সিএনএন, টাইম, এনবিসি নিউজ, দ্য গার্ডিয়ান, টাইমস অব ইন্ডিয়া, ডেকান হেরাল্ড ও পিটিআইয়ের প্রতিবেদন (২৫ জুলাই সকাল পর্যন্ত আপডেট)।







