রাখাইনে চীনের মূল লক্ষ্য বিনিয়োগ সুরক্ষা, গুরুত্ব পাচ্ছে ভারতকে মোকাবিলা

ছবি: সংগৃহীত।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিজেদের কৌশলগত বিনিয়োগ ও জ্বালানি অবকাঠামো সুরক্ষায় মনোযোগ দিচ্ছে চীন। একই সঙ্গে অঞ্চলটিতে ভারতের প্রভাব বিস্তার ঠেকানোও বেইজিংয়ের অন্যতম লক্ষ্য। এ জন্য মিয়ানমারের সামরিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি আরাকান আর্মির (এএ) সঙ্গেও অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ রাখছে দেশটি।
মিয়ানমার অ্যানালাইসিস গ্রুপের অক্টোবর মাসের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ‘চায়নাস ক্যালকুলাস ইন ওয়েস্টার্ন মিয়ানমার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের রাজনৈতিক সংকট সমাধানের চেয়ে কিয়াউকফিউ এলাকায় নিজেদের বিনিয়োগ ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষা করাই চীনের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার।
রাখাইন রাজ্যে চীনের স্বার্থের কেন্দ্রে রয়েছে তেল ও গ্যাসের পাইপলাইন, গভীর সমুদ্রবন্দর এবং প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডর। মালাক্কা প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে কিয়াউকফিউ থেকে চীনের ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত তেল ও গ্যাসের পাইপলাইন নির্মাণ করেছে বেইজিং। ২০১৩ ও ২০১৭ সালে চালু হওয়া এসব পাইপলাইনে চীনের বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ২৫০ কোটি মার্কিন ডলার। এগুলো মিয়ানমারে চীনের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত।
এ ছাড়া কিয়াউকফিউয়ে গভীর সমুদ্রবন্দর ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে চীনের। রেলপথ ও মহাসড়কের মাধ্যমে অঞ্চলটিকে মান্দালয় এবং চীনের সীমান্তের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগও রয়েছে। পাশাপাশি মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে ইউনানের সঙ্গে বাংলাদেশকে যুক্ত করতে চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডর গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে বেইজিং।
তবে মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া ‘অপারেশন ১০২৭’-এর পর আরাকান আর্মির সামরিক অভিযান জোরদার হয়। সংগঠনটি রাখাইন রাজ্যের ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ১৪টির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত জান্তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে সিত্তে, মুনাউং ও কিয়াউকফিউ।
এতে চীনের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। কারণ, দেশটির গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো এমন এলাকায় অবস্থিত, যেখানে সংঘাত চলছে অথবা আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পাইপলাইন চালু থাকলেও টার্মিনাল ও পাম্পিং স্টেশনসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ঝুঁকির মুখে রয়েছে। সংঘাতের কারণে চীনা কর্মীদেরও এলাকা ছাড়তে হয়েছে। গভীর সমুদ্রবন্দর, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, রেলপথ ও মহাসড়ক নির্মাণের কাজও স্থবির হয়ে আছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর চীনের প্রভাব তুলনামূলক বেশি হলেও আরাকান আর্মির ক্ষেত্রে তা সীমিত। রাখাইন রাজ্য চীনের সীমান্ত থেকে দূরে হওয়ায় সংগঠনটি ভারত ও বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ পায়। ফলে আরাকান আর্মিকে চাপ দেওয়ার পরিবর্তে কূটনৈতিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক প্রণোদনার মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করছে বেইজিং।
অন্যদিকে ভারতের কালাদান মাল্টিমোডাল ট্রানজিট প্রকল্পের মাধ্যমে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মিজোরামের সঙ্গে রাখাইনের সিত্তে বন্দরের যোগাযোগ স্থাপনের উদ্যোগ রয়েছে। চীনের কিয়াউকফিউকেন্দ্রিক পরিকল্পনার জন্য এটিকে সম্ভাব্য প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখছে বেইজিং। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডর বাস্তবায়িত হলে এই অঞ্চলে ভারতের প্রভাব মোকাবিলায় সুবিধা পেতে পারে চীন।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়েও জটিলতায় রয়েছে বেইজিংয়ের পরিকল্পনা। মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে প্রত্যাবাসন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেয় চীন। কিন্তু রাখাইনের বড় অংশ আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে থাকায় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগও নিরাপদ ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
প্রতিবেদনে চীনের ভবিষ্যৎ নীতির তিনটি সম্ভাব্য দিক তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে সম্ভাব্য হলো, সামরিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক বজায় রেখে আরাকান আর্মির সঙ্গেও অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ চালিয়ে যাওয়া। সংঘাত কমলে আরাকান আর্মির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে চীন। আর চীনা অবকাঠামো গুরুতর হুমকির মুখে পড়লে মধ্যস্থতা বা নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের মাধ্যমে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে দেশটি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাখাইনে শান্তি প্রতিষ্ঠা বা রাজনৈতিক সমঝোতার চেয়ে নিজেদের বিনিয়োগ, জ্বালানি সরবরাহ ও কর্মীদের নিরাপত্তা রক্ষাই চীনের প্রধান বিবেচনার বিষয়। কিয়াউকফিউয়ের আশপাশে সংঘাতের গতিপ্রকৃতি এবং উত্তর মিয়ানমারে যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্বের ওপর নির্ভর করবে বেইজিংয়ের পরবর্তী পদক্ষেপ।






