জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ব বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা, নাট্যাচার্য ড. সেলিম আল দীনের আলোচিত মঞ্চনাটক ‘নিমজ্জন’। নাটকটির বিষয়বস্তু ‘গণহত্যা’।
নিমজ্জনে একটার পর একটা দৃশ্যপটে উঠে আসে হিটলারের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প, হিরোশিমা-নাগাসাকির পারমাণবিক ধ্বংসলীলা, রুয়ান্ডার জাতিগত নিধন, বসনিয়ার যুদ্ধ এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া গণহত্যা। এক কথায় নাটকটি মানবজাতির ইতিহাসের এক ‘গণহত্যা জাদুঘর’-এর মতো কাজ করে।
‘নিমজ্জন’ নিঃস্ব, নিপীড়িত ও নিভে যাওয়া মানুষের করুণ আর্তনাদ। কোন একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল বা সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, নাটকটি দেখায় কীভাবে যুগে যুগে শক্তিশালীরা দুর্বলদের ওপর শোষণ চালিয়েছে এবং লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করেছে।
১৮ আগস্ট নাট্যাচার্যের ৭৭ তম জন্মদিন উপলক্ষে ‘সেলিম আল দীন নাট্যোৎসব ২০২৬’ শিরোনামে তিন দিনব্যাপী যৌথ উৎসবের আয়োজন করেছে ঢাকা থিয়েটার ও বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার। উৎসবের প্রথম দিনে সন্ধ্যা ৭ টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় মঞ্চস্থ হয় ‘নিমজ্জন’। নাট্যাচার্যের ছাত্র-ছাত্রী ও শুভাকাঙ্খীদের পদচারনায় মুখরিত ছিল শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণ।
সাধারণত কোন না কোন গল্পকে কেন্দ্র করে নাটক তৈরি হয়। কিন্তু ‘নিমজ্জন’ একেবারেই গল্পহীন এক মঞ্চায়ন। মঞ্চায়নের আগে নিমজ্জনের নির্দেশক নাসির উদ্দিন ইউসূফ বাচ্চু বলেন,“একবার আমি ও সেলিম আল দীন জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসে হাঁটছিলাম। আলোচনার এক পর্যায়ে আমি সেলিমকে বললাম, এমন একটা নাটক করা যায় না যেটার কোন গল্প নাই। তখন সেলিম আল দীন উত্তর করলেন, কেন নয়, করা যায়। প্রায় দু-বছর পরিশ্রমের পর সারা পৃথিবীর গণহত্যা নিয়ে সেলিম আল দীন লিখেন-নিমজ্জন। পুরো নাটকটা প্রায় আট ঘণ্টার মতো। আমরা সেখান থেকে আনলাম ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিটে।”
নাট্যাচার্যের কথা স্মরণ করে বাচ্চু বলেন, সেলিম আল দীনের মৃত্যু আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গণে অনেক বড় ধাক্কা, যে ধাক্কা এখনও পুষিয়ে উঠতে পারছি না। সেলিমের নাটকে কেবল মানুষ নয়, সর্বপ্রাণবাদের উপস্থিতি দেখা যায়।
নাসির উদ্দিন ইউসূফ বাচ্চু বলেন, জাহাঙ্গীর নগর ক্যাম্পাসের কুয়াশাভেজা সকালে আমরা প্রায়ই হাঁটতাম। গাছের নিচে সেলিম বসে পড়তেন। সেলিম দেখাতেন কোন পাতায় কুয়াশা পড়লে কোন পাতার কী ক্যারেক্টার তৈরি হয়। কোন মাছের কী ক্যারেক্টার। কোন প্রাণীর কী ক্যারেক্টার। আকাশ-নক্ষত্র-মাটির এমন কোন বিষয় ছিলনা, সেলিম জানতেন না। অর্থ্যাৎ সেলিম পৃথিবীর সর্বপ্রাণবাদের কথা তার নাটকে তুলে ধরেছেন।
নিমজ্জন-এ যারা অভিনয় ও দৃশ্য রূপায়ণ করেছেন—আসাদুজ্জামান আমান, এ.কে.এম. সিরাজুল ইসলাম, মোস্তফা রতন, তরিকুল ইসলাম লিটন, রনি হোসাইন, সাজ্জাদ আহমেদ রাজীব, জয়শ্রী মজুমদার লতা, সাইদুল ইসলাম রিংকু (সাঈদ), হাবিবা আজিজ হ্যাপী, রফিকুল ইসলাম, সাজ্জাদ রহমান, ফাহমিদা কামাল রিপা, স্বৈরিন্দ্রী রেজা অগ্নি, মিলু চৌধুরী, গাজী মোরাদ আহমেদ রিংকু।
ওই দিন সকাল ১০টায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সেলিম আল দীনের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে ‘তোমার সম্মুখে অনন্ত মুক্তির অনিমেখ ছায়াপথ’ প্রতিপাদ্যে উৎসবের উদ্বোধন করা হয়। উৎসবের দ্বিতীয় দিন বুধবার (১৯ আগস্ট) সন্ধ্যায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ পরিবেশন করবে কাজী নজরুল ইসলামের গল্প অবলম্বনে আনন জামানের রচনা ও নির্দেশনায় নাটক ‘জহরনামা’।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) উৎসবের সমাপনী দিনে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের নাট্য সংগঠন ‘সুন্দরম’ পরিবেশন করবে এ এইচ রাজন ও রফিকুল ইসলামের যৌথ রচনা এবং নাসির উদ্দীন ইউসুফের নির্দেশনায়—‘একসাথে চলি একসাথে বাঁচি’।
অপরদিকে, নাট্যাচার্যের ৭৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে তিন দিনব্যাপী ‘নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন জন্মোৎসব ২০২৬’-এর আয়োজন করেছে নাট্যসংগঠন ‘স্বপ্নদল’। ঐতিহ্যধারায় সম্মুখযাত্রী বাঙলা নাট্যরথ, রবীন্দ্রনাথ-সেলিম আল দীনে পায় পূর্ণতার পথ’ স্লোগানকে সামনে রেখে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটারে এ উৎসব চলছে।
এ উৎসবে বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যনাট্য ‘চিত্রাঙ্গদা প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে। সমাপনী দিন ২১ আগস্ট (শুক্রবার) একই স্থানে বিকেল ৫ টা ও সন্ধ্যা ৭.৩০ মিনিটে সেলিম আল দীনের বিখ্যাত নাটক ‘হরগজ’-এর ৫২ ও ৫৩তম প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে। জাহিদ রিপনের নির্দেশনায় দুটি নাটকই গবেষণাগার পদ্ধতিতে ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যরীতিতে নির্মিত।
মহাভারতের গল্প অবলম্বনে রচিত ‘চিত্রাঙ্গদা’ নাটকে নর-নারীর মনোদৈহিক সম্পর্কের টানাপোড়েন ও আত্মপরিচয়ের সংকট তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে, ১৯৮৯ সালে মানিকগঞ্জের প্রলয়ংকারী টর্নেডোর ভয়াবহ অভিজ্ঞতা নিয়ে রচিত ‘হরগজ’ নাটকে বিধ্বস্ত মানবভুবন এবং আর্ত মানুষের প্রতি সহমর্মিতার এক অনন্য রূপক ফুটিয়ে তুলেছেন নাট্যাচার্য।
সেলিম আল দীনের জন্মবার্ষিকী ঘিরে প্রতিবছরই নাট্যাঙ্গনে নানা আয়োজন হয়ে থাকে। তার রচিত ‘কীত্তনখোলা’, ‘কেরামতমঙ্গল’, ‘যৈবতী কন্যার মন’, ‘চাকা’, ‘হরগজ’, ‘নিমজ্জন’, ‘ধাবমান’ সহ বহু নাটক বাংলা মঞ্চনাটকের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছে।
অন্যদিকে, ‘সেলিম আল দীন সংগ্রহশালা’ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে দুই দিনব্যাপী কর্মসূচি পালন করেছে। গত সোমবার (১৭ আগস্ট) বিকেল ৫টায় একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার হলে ‘আলাপে সেলিম আল দীন ও নাটকের রাজনীতি’ শীর্ষক আলোচনায় একক বক্তব্য উপস্থাপন করেন শিক্ষাবিদ আজফার হোসেন। সেদিন সন্ধ্যা ৭টায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের পরিবেশনায় মঞ্চস্থ হয় সেলিম আল দীনের আলোচিত নাটক ‘ধাবমান’।








