চ্যানেল আই এর বিশেষ আয়োজন ‘অমর জিয়া’ অনুষ্ঠানে সকলকে স্বাগত জানাচ্ছি আমি সাঈদ পান্থ। আজ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের শাহাদাত বার্ষিকী। ১৯৮১ সালের এই দিনে চট্টগ্রামে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রবর্তক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাত বার্ষিকীতে আজ আমরা কথা বলব এমন একজন ব্যক্তির সঙ্গে যিনি নানা পর্যায়ে শহীদ জিয়ার সান্নিধ্য পেয়েছেন, হয়েছেন স্নেহধন্য। তিনি বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।
চ্যানেল আই: স্যার কেমন আছেন?
হাফিজ: ধন্যবাদ। চ্যানেল আইয়ের সকল দর্শক শ্রোতাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
চ্যানেল আই: কবে কোথায় শহীদ জিয়ার সাথে আপনার প্রথম পরিচয় এবং সাক্ষাত হয়েছিল?
হাফিজ: রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এ দেশের এক ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্ব, মহান রাষ্ট্রপতি যাকে দেশের জনগণ অভূতপূর্ব ভালোবাসা দিয়েছে, শ্রদ্ধা দিয়েছে। তার সাথে আমার প্রথম পরিচয় পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে ১৯৬৮ সালে। আমি মিলিটারি একাডেমিতে একজন ক্যাডেট ছিলাম এবং তিনি ছিলেন আমাদের প্রশিক্ষক। একদিন ফুটবল মাঠে মিলিটারি একাডেমির দুটি দলের মধ্যে ফুটবল খেলা হচ্ছিল। আমি একটি দলের অধিনায়ক ছিলাম। রেফারি সাদা প্যান্ট সাদা গেঞ্জি পরা চোখে সানগ্লাস হুইসেল বাজিয়ে আমাকে ডাকলেন। আমি তার কাছে গিয়ে হ্যান্ডশেক করলাম। তিনি তার পরিচয় দিলেন। বললেন যে মেজর জিয়া। আমি আমার নাম বললাম এবং তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন যে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দলে ফুটবল খেলেছি কিনা।
সে সময় আমি অলরেডি পাকিস্তান জাতীয় দলের সদস্য হিসেবে বিদেশে খেলে এসেছি, কিন্তু মিলিটারি একাডেমিতে ক্যাডেটদের পক্ষে বাড়তি কথা বলা অনেকটা বিপদের কারণ হতে পারে। সেজন্য আমি সহজ সরল উত্তর দিলাম যে স্যার আমি বিশ্ববিদ্যালয় দলে খেলেছি। তারপর তিনি বললেন যে আর্মিতে আমার ফুটবল টিম প্রথম ইস্ট বেঙ্গল চ্যাম্পিয়ন ফুটবল টিম এটা মনে রেখো। ‘ইয়েস স্যার, রাইট স্যার’ বললাম। তার সাথে এই প্রথম পরিচয়। পরবর্তী দেখা ৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে। আমি যশোর ক্যান্টনমেন্টে ৩০শে মার্চ তারিখে বিদ্রোহ করি এবং আট ঘণ্টাব্যাপী যুদ্ধের পর ক্যান্টনমেন্টে বেরিয়ে এসে ছাত্র যুবক সৈনিকদেরকে নিয়ে মুক্তিবাহিনী গড়ে তুলে যশোর কুষ্টিয়া অঞ্চলে যুদ্ধে লিপ্ত হই। জুন মাসে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রথম, তৃতীয় এবং অষ্টম ব্যাটালিয়ন নিয়ে গঠিত হয় জেড ফোর্স। এই প্রথম সামরিক ব্রিগেড বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর। এবং তার নামের আধ্যক্ষর জেড দিয়েই এই জেড ফোর্স সৃষ্টি। মুক্তিযুদ্ধে জেড ফোর্স কমান্ডার হিসেবে বিভিন্ন রণাঙ্গনে তিনি সাহসিকতা এবং দেশপ্রেমের অনন্য নিদর্শন উপস্থাপন করেছিলেন। সে সময় একাত্তরে বাংলাদেশে ১৮টি জেলা ছিল। একটি মাত্র জেলা মুক্তিবাহিনী একক প্রচেষ্টায়, ভারতীয় বাহিনীর সমর্থন ছাড়াই দখল করেছিল, সেটি হল সিলেট জেলা। একাত্তর সালের ১৫ই ডিসেম্বর তারিখে জেড ফোর্সের একজন সেনা কমান্ডার রূপে জিয়ার নেতৃত্বে আমি সিলেট শহরে এমসি কলেজে পাকিস্তানি ঘাঁটির উপর আক্রমণ চালাই এবং সারাদিনব্যাপী ব্যাপী যুদ্ধের পর এই ঘাঁটিটি দখল করি।

এটি মুক্তিবাহিনীর জন্য এবং জিয়াউর রহমানের জন্য অত্যন্ত গৌরবের একটি বিষয়। তিনি ইচ্ছা করলে সীমান্তের ওপারে নির্বিঘ্ন জীবন কাটাতে পারতেন। অন্যান্য কমান্ডাররা যেভাবে দূরে দূরে ছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে তিনিও ওখানে থাকলে দোষের কোন কিছুই ছিল না। সেনাবাহিনীর সিনিয়র অফিসাররা সাধারণত পেছনেই থাকেন, কিন্তু তিনি সামনের কাতারে এসে জীবন বিপন্ন করে আমাদের সাথে থেকে আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করেছেন। এটি আমার জন্য এক বিরল অভিজ্ঞতা। মেঘালয়ের তেলঢালা নামক এক বনাঞ্চলের আমরা জেড ফোর্সের রিক্রুটদেরকে ট্রেনিং দিচ্ছিলাম, ছাত্রদেরকে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলাম। সেই সময় তিনি এসে জেড ফোর্স ব্রিগেডের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তার সাথে দেখা হলো। যুদ্ধের পরবর্তী পাঁচ মাস তার সাথেই ছিলাম, তাদের অধীনস্ত সেনা কর্মকর্তা ছিলাম। অনেক আক্রমণ এবং রক্ষণভাগে তার নেতৃত্বে যুদ্ধ করেছি। এবং স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ এবং ৭৪ এর দেড় বছর আমি তার একান্ত সচিব রূপে, সেনা কর্মকর্তা রূপে সেনা সদর দপ্তরে তার একান্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করেছি।
সুতরাং মিলিটারি একাডেমি, তারপরে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং তারপর শান্তিকালীন সময়ে তার পিএস হিসেবে অনেক কাছাকাছি তাকে দেখেছি। তার ব্যক্তিত্ব এবং বিশেষ করে যুদ্ধের সময় তার সমযর কুশলতার, যুদ্ধ পরিচালনায় যে তার দক্ষতা এটি দেখে অত্যন্ত মুগ্ধ হয়েছিলাম।
চ্যানেল আই: একাত্তরে আপনি ছিলেন একজন ক্যাপ্টেন এবং জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন মেজর। সেক্ষেত্রে একটি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে গিয়ে বিদ্রোহ করে আপনি যে যুদ্ধে যাওয়ার সাহস দেখিয়েছেন এই সাহসটা আসলে কোথা থেকে পেলেন আপনি এবং আপনারা?
হাফিজ: একাত্তরের মার্চ মাসে সারা দেশ ছিল উত্তাল বাঙালিদের ন্যায্য দাবির প্রতি কর্ণপাত করা তো দূরে থাকুক, তারা ২৫শে মার্চ তারিখে একটা ভয়াবহ সামরিক ক্র্যাকডাউন করে বহু নিরীহ বাঙালিকে হত্যা করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। এর প্রতিক্রিয়াস্বরূপ পাঁচটি ক্যান্টনমেন্টে বাঙালি সৈনিকেরা বিদ্রোহ করে। সর্বপ্রথম বিদ্রোহ করেন মেজর জিয়াউর রহমান। চট্টগ্রামে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গলের উপঅধিনায়ক উনি ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা করেন। আমি এই ঘোষণাটি শুনিনি। আমরা সে সময় সীমান্ত এলাকায় সামরিক ট্রেনিং এ ব্যস্ত ছিলাম, শীতকালীন ট্রেনিং এ। ২৬শে মার্চ তারিখে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল, ২৭শে মার্চ তারিখে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল জয়দেবপুরে, ২৮ তারিখে চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল সৈয়দপুরে এবং ৩০ তারিখে আমরা প্রথম ইস্ট বেঙ্গল যশোরে বিদ্রোহ করি। আমাদেরকে ২৯ তারিখে ডেকে নেওয়া হয়। সীমান্ত এলাকা থেকে ক্যান্টনমেন্টে ফিরে আসতে বলা হয়। ফিরে আসার পরেই আমাদেরকে কে পাক বাহিনী তারা আমাদেরকে নিরস্র করার আদেশ জারি করে, কারণ বেঙ্গল রেজিমেন্টের অন্যান্য ব্যাটালিয়নগুলো ইতিমধ্যে বিদ্রোহ করেছে। তারা ধরে নিয়েছে যে আমার ইউনিট প্রথম ইস্ট বেঙ্গল এরাও নিশ্চয়ই বিদ্রোহ করবে।
আমরা কিন্তু অন্যান্য বিদ্রোহের খবর জানতাম না। আমরা ক্ষুব্ধ ছিলাম বাঙালি হিসেবে। কিন্তু মিলিটারি ক্র্যাকডাউনের খবরও আমি জানতাম না। যখনই আমাদেরকে ৩০শে মার্চ সকালে যশোর ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার দূররানী এসে আমাদেরকে নিরস্র করার আদেশ জারি করেন, সাথে সাথে আমরা সৈনিকেরা বিদ্রোহ করি এবং পাকিস্তান বাহিনীর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হই। উপরে মুহূর্মুহূ আক্রমণ করে পাক বাহিনী, মররটারে গোলা নিক্ষেপ করে। প্রত্যেকটি আক্রমণই আমরা ব্যর্থ করে দেই। এই সময় আমি তরুণ ছিলাম,অবিবাহিত ছিলাম। সাহস অনেক বেশি ছিল এখনকার তুলনায়। সুতরাং আমি ভেবেছি যে এই বাঙালিদের যুদ্ধে বাঙালি এবং পাকিস্তানি সেনাদের মধ্যে যুদ্ধে আমি আমার সেনাদল নিয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছি। আমার কমান্ডিং অফিসার ছিলেন বাঙালি লেফটেন্যান্ট কর্নেল রহল জলিল। আমরা তার নির্দেশের অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু তিনি বয়স্ক কিছুটা দুর্বলচিত্তের ছিলেন। সেজন্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। তারপরেই নেক্সট সিনিয়র আমি ছিলাম। আড়াই বছর চাকরি আমার তখন। আমি সৈনিকদের ঐক্যবদ্ধ করে আট ঘণ্টাব্যাপী যুদ্ধ করার পর ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে আসি। বের হয়ে আসার পর দেখলাম যে হাজার হাজার ছাত্র জনতা তারা আমাদেরকে বুকে জড়িয়ে ধরছে, আলিঙ্গন করছে, গাছ থেকে ডাব পেড়ে খাওয়াচ্ছে। তাদের কাছে জানতে পারলাম যে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে, বাঙালিদের স্বাধীনতার যুদ্ধ। মেজর জিয়ার ঘোষণা, অন্যান্য ক্যান্টনমেন্টে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের যে সাহসিক পদক্ষেপ, বাঙালিদের হয়ে যে প্রতিরোধ যুদ্ধ; এটি শুনে আমি অত্যন্ত অনুপ্রাণিত হলাম, অনেকটা আশ্বস্ত হলাম।
সেসময় যে বাঙালিদের যে স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস কিন্তু জনগণ জানে না। কোনো রাজনৈতিক নেতার এই ঘোষণা দেওয়া উচিত ছিল জনগণের পক্ষ থেকে। রাজনৈতিক নেতারাই এ ধরনের ঘোষণা দেন। কিন্তু যখন পাকিস্তানিরা আমাদের উপর আক্রমণ চালায় সে সময় রাজনৈতিক নেতারা নিজেরাই প্রাণ রক্ষার্থে পাশের দেশে পালিয়ে যান। সাধারণ মানুষকে প্রশ্ন তারা করেননি এবং কিছু বলেও যান নাই জনগণের উদ্দেশে। যেমন জনাব তাজউদ্দিন সাহেব একটা টেপ রেকর্ডার নিয়ে তৎকালীন প্রধান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে গিয়েছিলেন, বলেছিলেন যে আপনি এই টেপ রেকর্ডারের স্বাধীনতার ঘোষণা দিন। কিন্তু তখন শেখ সাহেব বলেছেন যে আমি বিচ্ছিন্নতাবাদী নই, পাকিস্তান ভাঙ্গার দায়িত্ব আমি নেবো না। অর্থাৎ একটা স্বাধীনতা যুদ্ধের কোনো প্রস্তুতি তাদের মধ্যে ছিল না, মন মানসিকতাও তাদের ছিল না। সুতরাং তারা নিজের প্রাণ রক্ষার্থে চলে গেলেন দেশবাসীকে অরক্ষিত রাখে।
এই সময় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের এবং ইপিআরের সৈনিকেরা, বাঙালি সৈনিকেরা তারা রাজপথে নেমে আসেন। বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে বিদ্রোহ করে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে লিপ্ত হন। একটি কথা বলা দরকার: সে সময় আমরা সৈনিকেরা যদি প্রতিরোধ যুদ্ধে লিপ্ত না হতাম তাহলে আজও পাকিস্তান থাকতো। কিছুদিন পর আন্তর্জাতিক নেগোসিয়েশন বা দেশের মধ্যে রাজনৈতিক গোলটেবিল মিটিং এর ফলে আবার হয়তো শেখ সাহেবকে প্রধানমন্ত্রী করা হতো। এমপি এমএনএরা যারা ভারতে পালিয়ে গিয়েছিলেন তারা এসে আবার জাতীয় সংসদে বসে যেতেন। কিন্তু স্বাধীনতার ঘোষণা করার ফলে বাঙালিদের মধ্যে পুরা জাতি নেমে আসে। শহরে বন্দরে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করে। এটার জন্য বাঙালি সৈনিকেরা কৃতিত্ব দাবি করতে পারে এবং প্রধানত মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণায় দেশবাসী অনুপ্রাণিত হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ বেগবান হয়েছে এবং বাংলার বীর সন্তানেরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাহসিকতার সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। এ হলো মুক্তিযুদ্ধের গোড়ার কথা, এটাই প্রকৃত ইতিহাস।
চ্যানেল আই: জিয়াউর রহমান একদিকে যেমন সার্কের স্বপ্ন দেখেছেন, অন্যদিকে মুসলিম উম্মার নেতৃত্ব দিয়েছেন। এই যে পররাষ্ট্রনীতি বা দর্শন, এই দর্শনকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
হাফিজ: জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন স্বাধীনচেতা মানুষ। তার স্বাধীনচেতা মনোভাব তার পররাষ্ট্রনীতিতেও প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের ব্যাপারে কারো সাথে কোনো ধরনের আপোষ করেননি। সেজন্যই তিনি পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করেন যার মূল কথা ছিল সবার সাথেই বন্ধুত্ব কারো প্রতি বৈরীতা নয়। এবং তার যে সততা-দেশপ্রেম, দেশব্যাপী জনপ্রিয়তা–এটি মুসলিম বিশ্বেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সেজন্য মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম রাষ্ট্রসমূহ তারা জিয়াউর রহমানকে তাদের নিজস্ব বিবাদ বিসম্বাদ মিটিয়ে ফেলার জন্য আলকুদস কমিটির সদস্য অর্থাৎ একটা শালিশী বৈঠকের সদস্য রূপে তাকে মনোনীত করেন। এটা বাংলাদেশের অনেক গৌরবের, জিয়াউর রহমানের জন্যও। তার যে স্বাধীনচেতা মনোভাব এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে তাঁর যে দক্ষতা এবং তার যে ভাবমূর্তি অত্যন্ত ইতিবাচক ছিল– এজন্যই এটি সম্ভব হয়েছে।
চ্যানেল আই: জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালে শাহাদাত বরণ করেন। তার আদর্শ, তার দর্শন– এই বিষয়গুলোর জন্য তাকে আজীবন মানুষ মনে রাখবে। এই বিষয়গুলিকে আপনি পরবর্তীতে যারা নেতৃত্বে আসবেন, তাদের ভিতরে তার আদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য কী বলবেন?
হাফিজ: জিয়াউর রহমান, তিনি আজ নেই কিন্তু তার কালজয়ী আদর্শ বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ রয়েছে। বাংলাদেশের প্রত্যেকটি মানুষ এই বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদকে ধারণ করে এবং এর মাধ্যমে তিনি দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব যাতে চিরদিন অক্ষুন্ণ থাকে সেই বীজ বহন করে গিয়েছেন। তার দল বিএনপি আজ দেশের সবচাইতে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল। জনগণের ভোটে তারা চারবার রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছে। এটির মূল কারণ হলো জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তা। তার যে দেশ গড়ার স্বপ্ন, তার দেশের প্রতি যে দেশাত্মবোধ এবং তাঁর সততা, কোনো ধরনের স্বজনপ্রীতি তাকে কখনো স্পর্শ করেনি; এসব কারণে বাংলাদেশের মানুষ তাকে অত্যন্ত পছন্দ করেছেন এবং এখন তিনি না থাকার ফলেও তার দল যে জনপ্রিয়তা পেয়েছে প্রধানত তার কর্মকাণ্ডের কারণে তিনি দেশকে উন্নতির পথে স্বাবলম্বী করেছেন এবং বিশেষ করে আজকের যে গার্মেন্ট শিল্পের যে বিকাশ হয়েছে এবং বাংলাদেশের যে প্রধান বিদেশী মুদ্রা অর্জনকারী যে শিল্প এটিও তিনি গোড়াপত্তন করেছিলেন।
তো বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষাকবচ, এবং যতদিন বাংলাদেশ থাকবে জিয়াউর রহমানের এই অমর কীর্তি এবং তার এই যে আদর্শ, এটি ধারণ করেই বাংলাদেশের জনগণ তাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে অক্ষুন্ন রাখতে সমর্থ হবে।
চ্যানেল আই: জিয়াউর রহমানের যে রাজনৈতিক দর্শন সেই পতাকা বহন করেছেন বেগম খালেদা জিয়া। তিনিও চলে গেছেন। আমরা জানি যে আপনি খালেদা জিয়ারও স্নেহধন্য ছিলেন। আপনি খালেদা জিয়াকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?
হাফিজ: বেগম জিয়া সাম্প্রতিককালে দেশের সবচাইতে জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা। তিনি যে এতটা জনপ্রিয় তা জীবিত অবস্থায় আমরা অনুভব করিনি যদিও তিনি পাঁচ পাঁচটি আসন থেকে বারবার নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। কিন্তু তার মৃত্যুর পর যে অবিস্মরণীয় দৃশ্য আমরা দেখলাম তার জানাযায়, যেভাবে স্বতস্ফুর্তভাবে কোটি মানুষের আগমন হয়েছে; এ থেকে আমরা বিস্মায়াভিভূত হয়েছি।
মৃত্যুর পর তো কারো কাছে কারো কিছু আশা করার কিছুই থাকে না। কিন্তু যখন তার জানাযাস্থলে যাচ্ছিলাম, আমরা একটা বাসে করে স্থায়ী কমিটির সদস্যরা যাচ্ছিলাম, বেগম জিয়ার ভাই এবং তার কিছু আত্মীয়স্বজন এই বাসে ছিল; রাস্তার দুদিকে তাকিয়ে দেখি যে মানুষের দুই চোখ দিয়ে অবিরল ধারায় অশ্রু বিসর্জন করছে। সাধারণ মানুষ তো যারা রাজনীতি করে না, খেটে খাওয়া মানুষ, বিভিন্ন পেশার মানুষ, তারা যেভাবে বেগম জিয়ার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করছে, যেভাবে তারা কাঁদছিল– এটি দেখে আমরা অত্যন্ত অবাক হয়ে গিয়েছি। বোঝা গেল যে তিনি সাধারণ মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করেছেন এবং তিনি যে এতটা জনপ্রিয়। সেটি তিনি শহীদ জিয়ার জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকে আরো বেগবান করেছেন এবং তার রাষ্ট্র শাসনকালে সকলের প্রতি বন্ধুত্ব তিনি রেখেছেন কারো প্রতি কখনো খারাপ মন্তব্য করেননি। তিনি স্বল্পবাক ছিলেন, প্রতিদ্বন্দ্বীকে কখনো নোংরা ভাষায় আক্রমণ করেননি। এ কারণে মানুষ তাকে অত্যন্ত পছন্দ করেছিল এবং সাম্প্রতিককালে তাঁর মতো জনপ্রিয়তা কেউ ইদানীং পেয়েছেন বলে আমার জানা নেই।
চ্যানেল আই: শহীদ জিয়ার দলের এখন উত্তরাধিকারী তারেক রহমান। তারেক রহমানের নেতৃত্ব নিয়ে আপনি কীস বলবেন?
হাফিজ: তারেক রহমান প্রথমবারের মতো এমপি, প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী। তিনি ইতিমধ্যেই তার যোগ্যতা প্রমাণ করছেন। নির্বাচনকালে যেসব প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছেন, সবগুলোই তিনি পালন করার উদ্যোগ নিয়েছেন। বোঝাই যাচ্ছে যে তার কথা এবং কাজের মধ্যে মিল রয়েছে। এজন্য জনগণ আস্তে আস্তে তাকে পছন্দ করা শুরু করেছে। তিনি সহজ সরলভাবে জীবন আচরণ, জিয়া যেরকম সাধারণভাবে চলাফেরা করতেন এবং তারেক রহমানও তার পোশাকে আশাকে মানুষের সাথে ব্যবহারে সাধারণ মানুষের সাথে কাছাকাছি আসা যে তার চেষ্টা; সবকিছু জিয়াউর রহমানকেই মনে করিয়ে দেয়।
আমার মনে হয় যে সবে মাত্র তিন মাস তিনি প্রধানমন্ত্রী রূপে দায়িত্ব পালন করছেন। আর কিছুদিন গেলেই মানুষ বুঝতে পারবে যে তিনি জিয়া এবং খালেদা জিয়ার প্রকৃত অনুসারী এবং তার পিতা-মাতার যে গৌরবময় ঐতিহ্য সেটি তিনি ধারণ করেন। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের জন্য তার পক্ষ থেকে সকল ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে যাতে করে ইতিহাস তাঁকে দীর্ঘদিন মনে রাখে সে ব্যাপারে তিনি সচেতন রয়েছেন। আমি আশা করি তিনি তাঁর পিতা এবং মাতার ঐতিহ্যকে ধারণ করে দেশকে আরো অগ্রগতির পথে নিয়ে যাবেন।
চ্যানেল আই: আমরা একেবারে শেষ পর্যায়ে। আপনি দেশসেরা ফুটবলার ছিলেন, স্ট্রাইকার ছিলেন। আপনি শহীদ জিয়ার সঙ্গেও ফুটবল খেলেছেন। আমরা একটু গল্প শুনতে চাই।
হাফিজ: সামরিক বাহিনীতে অফিসাররা খেলাধুলায় পারদর্শী থাকে, ফিজিক্যালি ফিট থাকে। একাডেমিতে তাঁর সাথে ফুটবল খেলেছি। পরবর্তীকালে একদিন তিনি যখন সেনাপ্রধান সে সময় নিজেই তিনি আমাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ডেকে বলেন, হাফিজ- আজ বিকালে আমরা ফুটবল খেলি। তিনি তখন রাষ্ট্রের অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। সেনাপ্রধান ছাড়াও রাষ্ট্র পরিচালনায় তিনি, পরোক্ষভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছিলেন। তখনও রাষ্ট্রপতি হননি। সেদিন বিকালে অনেকদিন পরে আবার সেই মিলিটারি একাডেমির পরে আবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টেডিয়ামে দুটি দলের মধ্যে খেলা হলো। আমি আর উনি আমরা একই দলে ছিলাম। উনি একজন দক্ষ খেলোয়াড় ছিলেন, দক্ষ বক্সার ছিলেন, ক্রীড়ানুরাগী ছিলেন।
বাংলাদেশের যে ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিকেএসপি– এটি তারই চিন্তার ফসল। খেলাধুলাকে তিনি ভালোবাসতেন এবং আমাকে তিনি আরো স্নেহ করতেন অধিক ভাবে আমার ক্রিয়া নৈপুণ্যের জন্যে। আমি জাতীয় দলের খেলোয়াড় ছিলাম এবং ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবেও খেলছিলাম, সেনাবাহিনীর সদস্য হয়েও অংশগ্রহতে সক্ষম হয়েছি। তিনি খেলাধুলার খবর রাখতেন। দেখা হলে, বিকেলবেলা দেখা হলেই বলতেন যে আজকে পেপারে তোমার সম্বন্ধে ভালো লিখেছে কিংবা তুমি কয়েকটা মিস করেছো। তো তার সাথে এইসব স্মৃতি আমাকে খুবই নাড়া দেয়। তার অত কাছাকাছি ছিলাম। একজন সৎ পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যিনি মূলত একজন সৈনিক ছিলেন। রাজনীতির কালিমা তাকে স্পর্শ করেনি। সৎ এবং দেশপ্রেমিক হিসেবে বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে তিনি চিরস্থায়ী আসন থাকবে বলে আমার ধারণা।








