যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিন বিভিন্ন রাজ্যের আবহাওয়া দেশটির ভোটদানের হার এবং ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতিতে বেশ প্রভাব ফেলে। নির্বাচনের দিন শীত, ভারী বৃষ্টি, তুষারপাত বা তুষারঝড়ের কারণে অনেক ভোটার ভোট দিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন বা তাদের পক্ষে ভোটকেন্দ্রে পৌঁছানো কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনের দিনের আবহাওয়া ভোটদানের হারে ১ থেকে ২ শতাংশের মতো পার্থক্য সৃষ্টি করতে পারে, যা নির্বাচনের ফলাফলেও প্রভাব ফেলতে পারে।
আগামী ৫ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ৬০তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এটিই হবে সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন। সর্বশেষ জনমত সমীক্ষা প্রকাশ্যে এসেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে প্রায় সমান অবস্থানে আছেন রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কমলা হ্যারিস। তাই এবারের নির্বাচনে আবহাওয়ার প্রভাবে যেকোন মুহূর্তেই বদলে যেতে পারে নির্বাচনের ফলাফল।
যা বলছে গবেষণা
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং ভোটদানের মধ্যে শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষত শীতকালীন মাসগুলোতে যখন নির্বাচনী তাপমাত্রা হ্রাস পায়, বরফ বা তুষারপাত হয়, তখন অনেক ভোটার বিশেষত প্রবীণ এবং দূরবর্তী ভোটকেন্দ্রের ভোটাররা ভোটদানে অনাগ্রহী হন। ২০১৯ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, প্রতি ১ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রা হ্রাস ভোটদানের হার প্রায় ১ শতাংশ কমিয়ে দিতে পারে। ভারী বৃষ্টিপাতের ক্ষেত্রেও এই হার প্রায় ১ শতাংশ কম হতে পারে। এই গবেষণাগুলো প্রমাণ করে যে, খারাপ আবহাওয়া ভোটারদের সিদ্ধান্ত এবং ভোটদানের ইচ্ছায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।

শীতের প্রভাব
নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের অনেক স্থানে শীতের প্রভাব দেখা যায়। বিশেষ করে নর্থ ডাকোটা, উইসকনসিন, মিনেসোটা, এবং মেইন রাজ্যের মতো উত্তরের রাজ্যগুলোতে তাপমাত্রা কমে যায় এবং অনেক সময় তুষারপাতও হয়ে থাকে। তীব্র ঠান্ডা আবহাওয়ার কারণে বিশেষ করে প্রবীণ ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়া কষ্টকর হয়ে পড়ে। এছাড়া, খারাপ আবহাওয়ার কারণে সড়কপথে তুষার বা বরফ জমে যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটে, ফলে অনেকেই যাতায়াতের ঝুঁকি নিতে চান না। এই পরিস্থিতিতে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-মধ্য পশ্চিমাঞ্চল এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে ভোটদানের হার তুলনামূলকভাবে কম থাকে।
বৃষ্টি এবং ঝড়ের প্রভাব
নির্বাচনের দিন ভারী বৃষ্টি এবং ঝড়ও ভোটদানে প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, নির্বাচনের দিনে ভারী বৃষ্টি হলে ভোটদানের হার প্রায় ১ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। বৃষ্টি হলে মানুষ প্রায়শই ঘর থেকে বের হতে চান না বা ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিরক্তি অনুভব করেন। তাছাড়া, ঝড়ের কারণে বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা ভোটকেন্দ্রগুলোর কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটতে পারে, যার ফলে ভোটারদের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। বিশেষ করে তীব্র বৃষ্টি এবং বন্যা পরিস্থিতিতে অনেক ভোটারই ভোটদানে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। নির্বাচনের দিন ঝড়-বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলে, বিশেষ করে দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে অনেক ভোটার ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত না থেকে বাড়িতেই থাকেন।
তুষারঝড় এবং ভোটদানের হার
যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাঞ্চলীয় কিছু রাজ্যে তুষারঝড় বা ব্লিজার্ডের কারণে ভোটদান প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। নির্বাচনের সময় যদি তুষারঝড় বা তীব্র শৈত্যপ্রবাহ থাকে, তবে ভোটারদের অনেকেই তাদের বাড়ি থেকে বের হতে চান না। এমন পরিস্থিতিতে যারা কিছুটা দুর্বল বা বয়স্ক তারা বাড়িতে থাকাটাই বেশি নিরাপদ মনে করেন। তুষারঝড়ের কারণে প্রায়শই রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে যায়, এবং জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া কেউ বাইরে যেতে চান না। ফলে, এই ধরনের আবহাওয়ার পরিস্থিতি ভোটদানের হার প্রায়শই কমিয়ে দেয়। এই পরিস্থিতি অনেক সময় ভোটদানের ওপর বড় প্রভাব ফেলে, বিশেষত যেখানে ভোটের পার্থক্য খুব সামান্য।

বিভিন্ন প্রার্থী ও দলের সমর্থকদের ওপর প্রভাব
আবহাওয়ার প্রভাব পার্টি অনুযায়ী ভোটদানের ওপরেও প্রভাব ফেলতে পারে। কিছু গবেষণা ইঙ্গিত করে যে, প্রতিকূল আবহাওয়া রক্ষণশীল ভোটারদের তুলনায় উদারপন্থী বা প্রগতিশীল ভোটারদের ভোটদানের হার বেশি হ্রাস করে। কারণ ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভোটারদের মাঝে তরুণ এবং শহুরে জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বেশি থাকে, যারা আবহাওয়ার কারণে ভোটকেন্দ্রে যেতে অনেক সময় বিরক্তি বা অসুবিধা অনুভব করেন। অপরদিকে, রক্ষণশীল বা রিপাবলিকান ভোটাররা তুলনামূলকভাবে নিয়মিত এবং বাধ্যবাধকতামূলকভাবে ভোটকেন্দ্রে যেতে আগ্রহী। তাই ফলাফলে পড়তে পারে আবহাওয়ার প্রভাব।
মেইল-ইন এবং আগাম ভোটের ভূমিকা
কঠিন আবহাওয়ার প্রভাব থেকে রক্ষা পেতে অনেকেই মেইল-ইন বা আগাম ভোটের সুযোগ বেছে নেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যে মেইল-ইন ভোট এবং আগাম ভোটের পদ্ধতি চালু রয়েছে, যা ভোটারদের নির্বাচনের দিন আবহাওয়ার ঝুঁকি এড়াতে সহায়ক। বিশেষত ২০২০ সালের নির্বাচনে মহামারীর কারণে মেইল-ইন ভোটের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, যা কঠিন আবহাওয়ার ক্ষেত্রেও ভোটদানে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে। তবে মেইল-ইন ভোট ব্যবস্থা এখনও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি রাজ্যে সমানভাবে কার্যকর নয়। কিছু রাজ্যে এই পদ্ধতি সীমিত, এবং কিছু রাজ্যে আগাম ভোটের সুযোগ কম থাকে, যার ফলে এসব রাজ্যের ভোটারদের আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করেই ভোট দিতে হয়।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং নির্বাচনী প্রস্তুতি
বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে আবহাওয়ার পূর্বাভাস আগেই জানা যায়, যা নির্বাচন পরিচালনা কমিটিকে প্রস্তুতি নিতে সহায়তা করে। নির্বাচনের দিন প্রতিকূল আবহাওয়ার পূর্বাভাস থাকলে কর্তৃপক্ষ ভোটকেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম সচল রাখতে আগাম ব্যবস্থা নিতে পারে, যেমন তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, সড়ক পরিষ্কার, এবং ভোটারদের সহজে পৌঁছানোর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা। কিছু রাজ্যে নির্বাচন কমিশন এমনকি প্রয়োজনে ভোটের সময় বাড়িয়ে দেন যাতে প্রতিকূল আবহাওয়া ভোটদানে বাধা না দেয়।






