তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ও বিদ্যুতের দাম বাড়ার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে রাজধানীর রেস্তোরাঁ খাতে। পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক রেস্তোরাঁ খাবারের দাম বাড়িয়েছে, আবার কেউ কেউ নতুন মূল্যতালিকা তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, কাঁচামাল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, ভাড়া ও শ্রমিক ব্যয়—সব মিলিয়ে আগের দামে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।
রোববার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৭০ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৫৯৮ টাকা নির্ধারণ করেছে। একই সময়ে বিদ্যুতের ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে জ্বালানিনির্ভর রেস্তোরাঁ ব্যবসায় নতুন করে খরচের চাপ তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, শুধু জ্বালানিই নয়, গত কয়েক মাসে চাল, মাংস, মাছ, ডিম, ভোজ্যতেল, দুধ, মসলা ও সবজির দামও বেড়েছে। অনলাইন ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মের কমিশন, দোকান ভাড়া এবং কর্মচারীদের বেতনও আগের তুলনায় বেশি। সব মিলিয়ে লাভের পরিমাণ কমে এসেছে।
শুধু গ্যাস নয়, পুরো পরিচালন ব্যয় বাড়ছে
রেস্তোরাঁ পরিচালনায় কেবল রান্নার গ্যাসই নয়, বিদ্যুৎ, পানি, কর্মীদের বেতন, ভাড়া, কাঁচামাল, পরিবহন ও ডিজিটাল ডেলিভারি কমিশন—সব মিলিয়ে ব্যয়ের বড় একটি অংশ তৈরি হয়। রাজধানীর গুলশান, বনানী, ধানমণ্ডি ও উত্তরার মতো বাণিজ্যিক এলাকায় পরিচালিত রেস্তোরাঁগুলোর ব্যয় তুলনামূলক বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানে রান্নার জন্য প্রতিদিন একাধিক এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার হয়। পাশাপাশি সারাদিন শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, রেফ্রিজারেটর, ডিপ ফ্রিজ, ওভেন, কফি মেশিন এবং আলোকসজ্জা চালাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। ফলে জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব সরাসরি তাদের পরিচালন ব্যয়ে পড়ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত এক বছরে মাংস, চাল, ভোজ্যতেল, ডিম, দুগ্ধজাত পণ্য, মসলা ও সবজির দাম কয়েক দফা বেড়েছে। এর সঙ্গে এলপিজি ও বিদ্যুতের নতুন মূল্য যুক্ত হওয়ায় ব্যয় আরও বাড়বে।
দাম না বাড়িয়ে টিকে থাকা কঠিন
তেহারী ঘর-সোবহানবাগের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে চাল, মাংস, মসলা, ভোজ্যতেল, এলপিজি, বিদ্যুৎ, শ্রমিকের মজুরি এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় খাবারের মূল্য সমন্বয় করতে হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, নতুন মূল্যতালিকা গতকাল ১ আগস্ট থেকে কার্যকর হয়েছে। তবে মূল্য বাড়লেও খাবারের গুণগত মানে কোনো ধরনের আপস করা হবে না। বরং আগের মতোই মানসম্পন্ন খাবার ও সেবা নিশ্চিত করতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, “গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের আস্থা ও ভালোবাসাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। আমরা আশা করি, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে গ্রাহকরা এই মূল্য সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করবেন এবং আগের মতোই আমাদের পাশে থাকবেন।”
গুলশানের একটি মাঝারি আকারের রেস্তোরাঁর মালিক খালেদ মাহমুদ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, আমরা যতটা সম্ভব দাম না বাড়িয়ে ব্যবসা চালানোর চেষ্টা করি। কিন্তু গ্যাস, বিদ্যুৎ, কাঁচামাল ও শ্রমিক ব্যয় একসঙ্গে বাড়তে থাকলে আগের দামে খাবার বিক্রি করা কঠিন হয়ে যায়। তার ভাষ্য, একটি রেস্তোরাঁয় প্রতিদিন একাধিক এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার হয়। মাস শেষে এই অতিরিক্ত ব্যয় কয়েক হাজার থেকে কয়েক দশ হাজার টাকায় পৌঁছাতে পারে।
দাম একই, পরিবেশনে কাটছাঁট
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম বাড়লেও অনেক হোটেল ও রেস্তোরাঁ এখনো খাবারের মূল্য বাড়ায়নি। তবে দাম অপরিবর্তিত রাখতে গিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান পরিবেশনের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে। কোথাও ভাত, কোথাও মাংসের পরিমাণ, আবার কোথাও সালাদ বা অন্যান্য সাইড আইটেম আগের তুলনায় কম দেওয়া হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, কাঁচামাল, এলপিজি, বিদ্যুৎ, শ্রমিকের মজুরি ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় একদিকে খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে খাবারের দাম বাড়ালে ক্রেতা হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। তাই আপাতত অনেকেই মেন্যুর দাম অপরিবর্তিত রেখে পরিবেশনের পরিমাণ কিছুটা কমানোর কৌশল নিয়েছেন। তবে তাদের মতে, ব্যয় বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে চলতে থাকলে শুধু পরিমাণ কমিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না; একসময় খাবারের দামও সমন্বয় করতে হতে পারে।
বনানীর একটি ক্যাফের উদ্যোক্তা শারমীন জাহান চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, খাবারের দাম বাড়ালে বিক্রি কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। আবার দাম না বাড়ালে লাভের মার্জিন কমে যায়। ফলে ব্যবসায়ীরা দুই দিক থেকেই চাপে পড়ছেন। তিনি জানান, অনেক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে পরিমাণ কিছুটা কমানো, মেন্যু পুনর্বিন্যাস অথবা কম লাভে বিক্রির মতো কৌশল বিবেচনা করছে।
তেজগাঁও নাখালপাড়ার একটি রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপক মো. সিরাজুল ইসলাম চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, আমাদের রেস্তোরাঁর অধিকাংশ গ্রাহকই আশপাশের বিভিন্ন ব্যাংক, অফিস ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। তাদের কথা বিবেচনায় রেখে এখন পর্যন্ত আমরা খাবারের দাম বাড়াইনি এবং খাবারের গুণগত মানও আগের মতোই বজায় রেখেছি।
তিনি বলেন, এলপিজি, বিদ্যুৎ ও কাঁচামালের দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তারপরও গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে আমরা আপাতত সেই ব্যয় নিজেরাই বহন করার চেষ্টা করছি। তবে বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ভবিষ্যতে মূল্য সমন্বয়ের বিষয়টি বিবেচনা করতে হতে পারে।
ছোট উদ্যোক্তারাই বেশি ঝুঁকিতে
বড় চেইন রেস্তোরাঁগুলো কিছুটা সময় অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে পারলেও ছোট ও স্বাধীন রেস্তোরাঁগুলোর জন্য পরিস্থিতি কঠিন হতে পারে। তাদের অনেকেরই লাভের মার্জিন সীমিত। মোহাম্মদপুরের একজন ছোট রেস্তোরাঁ উদ্যোক্তা শাকিলা মুনিরের ভাষ্য ‘আমাদের মতো ছোট ব্যবসার জন্য প্রতিটি সিলিন্ডারের দাম গুরুত্বপূর্ণ। মাসে ৫০–৬০টি সিলিন্ডার ব্যবহার হলে খরচ অনেক বেড়ে যায়। সব চাপ নিজেরা বহন করা সম্ভব হয় না।’
প্রভাব পড়বে ভোক্তার আচরণে
ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, জ্বালানি ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে খাবারের দাম বাড়লে বাইরে খাওয়ার অভ্যাসেও পরিবর্তন আসতে পারে। মূল্য বৃদ্ধির ফলে অনেক পরিবার রেস্তোরাঁয় খাওয়ার সংখ্যা কমিয়ে দিতে পারে বা তুলনামূলক কম খরচের বিকল্প বেছে নিতে পারে। একই সঙ্গে করপোরেট অর্ডার, পারিবারিক অনুষ্ঠান, সামাজিক আয়োজন এবং অনলাইন ফুড ডেলিভারির চাহিদাও কিছুটা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রেস্তোরাঁ খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ভোক্তারা ব্যয় কমানোর চেষ্টা করছেন। ফলে খাবারের দাম সামান্য বাড়লেও এর প্রভাব বিক্রিতে পড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি ও বিদ্যুতের ব্যয় বৃদ্ধি উৎপাদন ও সেবা খাতের সামগ্রিক ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। এর প্রভাব ধীরে ধীরে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার দামে প্রতিফলিত হয়। রেস্তোরাঁ শিল্পও এর বাইরে নয়। তাদের মতে, জ্বালানির পাশাপাশি কাঁচামাল, পরিবহন ও শ্রম ব্যয় বাড়তে থাকলে খাবারের মূল্য সমন্বয় অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।
ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা
রেস্তোরাঁ খাতের উদ্যোক্তারা মনে করছেন, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়লেও ব্যবসাবান্ধব নীতিগত সহায়তা, কর-সংক্রান্ত সুবিধা এবং সরবরাহব্যবস্থা স্থিতিশীল থাকলে মূল্যবৃদ্ধির চাপ কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব হবে। তাদের মতে, কাঁচামালের বাজার স্থিতিশীল রাখা গেলে এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো গেলে খাবারের দাম বড় পরিসরে বাড়ানোর প্রয়োজন নাও হতে পারে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, “বিদ্যুৎ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির কারণে আগেই রেস্তোরাঁ পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছিল। এর মধ্যে এলপিজির দাম বৃদ্ধিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা আরও বড় সংকটে পড়েছেন। অনেকের জন্য ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।”
তিনি বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতির চাপে ইতোমধ্যে অনেক রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সরকার যদি রেস্তোরাঁ খাতকে একটি শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা না দেয়, তাহলে ভবিষ্যতে এ খাত বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।”
সরকারের কাছে প্রত্যাশার বিষয়ে ইমরান হাসান বলেন, “ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য দেশে সুশাসন ও স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে উদ্যোক্তারা স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ও স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ব্যবসাবান্ধব নীতি গ্রহণ করা গেলে রেস্তোরাঁ খাতের ওপর বর্তমান চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।”







