কোভিড ও কোভিড পরবর্তী সময়ের বিশ্ব পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের স্টিল শিল্প বর্তমানে এক চরম সংকটে নিপতিত উল্লেখ করে বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেছেন, বাংলাদেশের স্টিল শিল্প একটি অতি পুরাতন শিল্প। এই শিল্পের সাথে তথা নির্মাণ শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০ লাখ জনবলের কর্মসংস্থান সম্পৃক্ত।
মঙ্গলবার ১৯ মার্চ বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স এসোসিয়েশন আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
অবকাঠামো উন্নয়নে স্টিল সেক্টরের অবদানের কথা উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, দেশের ক্ষুদ্র থেকে মেগা প্রজেক্ট সকল ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্টিল ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে স্টিল এম এস প্রোডাক্ট আমদানি বাবদ যে বিপুল পরিমান বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হতো তা সাশ্রয় হচ্ছে। এছাড়াও দেশে উৎপাদনের কারনে উৎপাদন খরচ কম হচ্ছে এবং ভোক্তার চাহিদা স্বল্প সময়ে পূরন করা সম্ভব হচ্ছে।
সংগঠনের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, প্রধানমন্ত্রী দেশকে উন্নত দেশের তালিকায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে ভিশন ২০৪১ ঘোষণা করেছেন। অর্থাৎ ২০৪১ সালের মধ্যে দেশ বিশ্বের অন্যান্য উন্নত দেশের তালিকায় স্থান করে নিবে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন সবার আগে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অবকাঠামো উন্নয়নে আমাদের দেশে উৎপাদিত বিশ্বমানের স্টিলের কোন বিকল্প নাই এবং সেই লক্ষ্যে আমাদের স্টিল উৎপাদনের পরিমান ভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ স্টিল শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণ উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, বর্তমান সরকারের সক্রিয় সহযোগিতায় বিগত এক দশকে এই শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটে। আধুনিক প্রযুক্তিতে উৎপাদিত বাংলাদেশের স্টিল আজ বিশ্বমানের। কিন্তু বাংলাদেশের এই উদীয়মান স্টিল শিল্প বর্তমানে এক চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন। ডলার সংকট ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব এই শিল্পে প্রভাব ফেলছে উল্লেখ করে তারা বলেন, বর্তমানে ডলার সংকটের কারনে স্টিলের কাঁচামাল আমদানির জন্য দেশের ব্যাংকগুলো আমাদের প্রয়োজন অনুযায়ী ঋনপত্র খুলতে পারছে না। ঋনপত্র খুলতে সমস্যা হওয়ার কারনে স্টিলের কাঁচামাল কম আসছে। ফলে স্টিলের কাঁচামালের সাপ্লাই চেইন ব্যাহত হচ্ছে।
এছাড়াও ব্যাংকে আমাদের মোট ঋন সীমা একই অবস্থানে থাকলেও ক্রয়ক্ষমতা ১০০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশে হ্রাস পেয়েছে। ডলারের মূল্য ৮৫ টাকা দরে যখন আমরা ১০০ কোটি টাকার আমদানি করেছি, তখন আমরা ১২ মিলিয়ন ডলার মূল্যের এলসি পেতাম। কিন্তু একই টাকা দিয়ে বর্তমানে ১২৫ টাকা মুদ্রার হারের বিনিময়ে আমরা ৮ মিলিয়ন ডলার মূল্যের এলসি পাচ্ছি, যার ফলে স্থানীয় মুদ্রার ৪৭ শতাং পর্যন্ত মূল্য হ্রাস হয়েছে।
অতিরিক্ত বিনিময় মূল্যের কারনে মূলধন ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা ডেফার্ড এলসি’র মাধ্যমে সমস্ত আমদানিকার্য সম্পন্ন করি। বিলম্বিত ঋনপত্র সর্ব্বোচ্চ ৩৬০ দিনের জন্য হয়ে থাকে। বিলম্বিত ঋনপত্রের বিপরীতে আমদানিকৃত কাঁচামালের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্য বিক্রয়সহ এর লাভ লোকসানের হিসাব পূর্বেই সম্পন্ন হয় বিধায় আমাদের পক্ষে ডলারের অতিরিক্ত বিনিময় মূল্য ১ বছর পরে সমন্বয়এর কোন সুযোগ থাকে না। ফলে আমাদের জন্য অতিরিক্ত বিনিময় মূল্য সম্পূর্ন লোকসানে পরিনত হয় এবং ব্যবসার দায় পরিশোধ করতে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হয়। এই ক্ষতি অতিরিক্ত অর্থের পরিমান মোট আমদানি ব্যয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ। এক্ষেত্রে আমাদের মূলধনের যে ঘাটতি হয়েছে তা আর কখনো পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে না।
এছাড়াও বাংলাদেশে বর্তমানে ৪০টি বৃহৎ স্টিল শিল্প প্রতিষ্ঠানসহ মোট স্টিল শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ২০০টি। আমাদের স্টিল মিলগুলোর বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ টন। দেশে স্টিল ব্যবহার হচ্ছে প্রায় ৭৫ লাখ টন। বর্তমান পরিস্থিতিতে স্টিলের ব্যবহার নিম্নমুখী। ফলে মিল মালিকগণের পক্ষে ক্যাপাসিটি অনুযায়ী উৎপাদন করা সম্ভব হয় না। পূর্ণ উৎপাদনক্ষমতা ব্যবহার করতে না পারায় ওভারহেড খরচ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধিতেও ব্যাপক প্রভাব পড়েছে এই শিল্পে। বক্তারা বলেন, ইতোপূর্বে কয়েকবার বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করা সত্ত্বেও গত ২৯ ফেব্রুয়ারির প্রজ্ঞাপনে সরকার পুনরায় বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করেছে এবং বিদ্যুতের খুচরা মূল্যহার ও অন্যান্য চার্জ ফেব্রুয়ারি মাস হতে কার্যকর করেছে। পূর্ববর্তী সময়ে বিদ্যমান বিদ্যুতের মূল্য’র উপর ভিত্তি করে উৎপাদিত পণ্য যা ইতোমধ্যেই বিক্রীত হয়েছে তার জন্য অতিরিক্ত বিদ্যুৎ মূল্য প্রদান করতে হলে উৎপাদনকারীগণ আর্থিকভাবে লোকসানের সন্মুখীন হবেন। বিদ্যুতের মূল্য ভূতাপেক্ষভাবে কার্যকর করা মৌলিক আইনের পরিপন্থী বলেও আমরা মনে করি।
এছাড়াও আয়কর আইনের মৌলিকনীতি হচ্ছে প্রকৃত আয়ের উপর আয়কর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক মূল্যায়নের ভিত্তিতে আয়কর নির্ধারণ করা। বর্তমানে বাজেটে ২ শতাংশ উৎসে কর কর্তন মাত্রাতিরিক্ত এবং স্টিল সেক্টরের প্রকৃত মুনাফার সঙ্গে এর কোন সামাঞ্জস্যতা নেই। এই ২শতাংশ কোন মূল্যায়িত কর নয়। অধিকন্তু এই কর ন্যূনতম কর। কোন প্রকার আয় ব্যতীত উৎপাদনকারীকে আয়কর প্রদান করতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদনকারীগণ ভীষনভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন।
সর্বোপরী বর্তমানে দেশের ভৌত অবকাঠামো কাজের মাত্রা মন্থর হওয়ায় এবং বেসরকারি ব্যক্তিগত পর্যায়ে নির্মাণ কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়ায় স্টিল শিল্প ভীষনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। সেই সঙ্গে নির্মান শিল্পের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হাউজিং,সিমেন্ট,সিরামিক,হার্ডওয়ারসহ শতাধিক শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত। সামগ্রিকভাবে স্টিল শিল্পসহ উক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহে কর্মরত ৫০ লাখ জনবল অর্থনৈতিকভাবে বিপন্ন। বিপুল পরিমান অর্থ যা প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকা তা বিনিয়োগ ও সুদীর্ঘ সময়ের পরিশ্রমে গড়ে উঠা স্টিল শিল্প বর্তমানে ভীষনভাবে সংকটের সম্মুখীন হয়েছে।
এসময় বক্তারা বলেন, ৭১ বছরের এই পুরানো স্টিল শিল্পটি বর্তমানে ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। স্টিল শিল্প মালিকপথের ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ব্যবসা বন্ধ করার উপক্রম হয়েছে। যার ফলে চূড়ান্তপর্যায়ে ব্যাংকঋণ খেলাপিতে পরিনত হওয়ার আশংকা রয়েছে। অতএব, স্টিল শিল্পকে রক্ষার লক্ষ্যে অবিলম্বে এই সেক্টরকে সুরক্ষা দেয়া অতীব জরুরী।
এসময় সমস্যাগুলোর মোকাবেলায় সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ডলারের মূল্য বৃদ্ধির কারনে চলতি মূলধনের যে ৪০ শতাংশ ঘাটতি হয়েছে তা পরিশোধের জন্য স্বল্পমেয়াদী ঋণকে ১২ বছর পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী ঋনে রুপান্তর করা; বৈদেশিক মুদ্রার মূল্য বৃদ্ধির কারনে ক্ষয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্য এলসি সুবিধা ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা; স্টিল শিল্পের জন্য ব্যাংকে বর্তমান গ্রাহক ঋনসীমা পননার ক্ষেত্রে বর্তমান ১৫ শতাংশ হতে বাড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্লান্টের ন্যায় ২৫ শতাংশ ভারিত হারে নন-ফান্ডেড দায় গননার বিষয় বিবেচনা করা।
বিদ্যুতের নতুন দাম ফেব্রুয়ারি মাসের পরিবর্তে মার্চ মাস হতে কার্যকর করা; ভারি শিল্প পর্যায়ে বান্ধ বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের শিল্পকারখানা সমূহ চলমান রাখার স্বার্থে গত ২১ ফেব্রুয়ারি প্রজ্ঞাপনে ক্ষেত্রে বিদ্যুতের যে মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে তা বৃদ্ধি না করা; বিদ্যুতের ডিমান্ড চার্জ-এর ক্ষেত্রে ২৯ ফেব্রুয়ারি প্রজ্ঞাপনে যে ন্যূনতম চার্জ বৃদ্ধি করা হয়েছে তা বৃদ্ধি না করা।
স্টিল সেক্টরের জন্য উৎসে কর কর্তন ২ শতাংশ এর পরিবর্তে ০ দশমিক ৫০ শতাংশ নির্ধারন করা; স্টিলের কাঁচামাল স্ক্র্যাপের জন্য আমদানি পর্যায়ে ন্যূনতম অগ্রিম আয়কর টনপ্রতি ৫০০ টাকার পরিবর্তে ২০০ টাকা নির্ধারন করা।
এছাড়াও শিল্প মন্ত্রনালয়ের সি এম সনদ ফি বৃদ্ধি সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপন বাতিল করা এবং সি এম সনদ কি টার্নওভার’র ভিত্তিতে নির্ধারন না করে নির্দিষ্ট করে দেয়া।







