৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যাংক ঋণ নিচ্ছে সরকার

ছবি: সংগৃহীত
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন এবং বকেয়াসহ বেতন পরিশোধের পরিকল্পনা করছে সরকার। এ জন্য বাড়তি অর্থের সংস্থান করতে চলতি অক্টোবর মাসে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এক মাসে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে এটিই সর্বোচ্চ লক্ষ্যমাত্রা।
তবে এই ঋণের পুরো অর্থ নতুন ব্যয়ে ব্যবহার হবে না। এর একটি বড় অংশ আগের ঋণ পরিশোধ ও সমন্বয়ে ব্যয় হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বাজেট ঘাটতি মেটাতে ঋণ নেওয়া ও পুরোনো ঋণ পরিশোধ সরকারের নিয়মিত আর্থিক কার্যক্রমের অংশ। এর পাশাপাশি দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয় এবং রাজস্ব আদায়ের ঘাটতিও সরকারের ঋণের চাহিদা বাড়াচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী বকেয়াসহ বেতন দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। একই সময়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের ব্যয় বেড়েছে। অন্যদিকে, প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় হচ্ছে না এবং বিদেশি ঋণ ছাড়ের তুলনায় পরিশোধের পরিমাণ বেশি। এসব কারণে অক্টোবর মাসে সরকারকে বাড়তি ঋণ নিতে হচ্ছে।
বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ঋণ
সরকার সাধারণত ট্রেজারি বিল ও বন্ড নিলামের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালিত এসব নিলামে ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য ব্যবহার করে সরকারি ঋণপত্র কেনা হয়। প্রচলিত নিয়মে প্রতি রোববার বিল এবং মঙ্গলবার বন্ডের নিলাম অনুষ্ঠিত হয়।
সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে রোববার বিভিন্ন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে ১০ হাজার কোটি টাকা এবং মঙ্গলবার বন্ডের মাধ্যমে ৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। সরকারি ছুটির কারণে আগামী মঙ্গলবারের নিলাম এক দিন এগিয়ে সোমবার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ওই নিলামের মাধ্যমে আরও ৪ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে।
সব মিলিয়ে অক্টোবর মাসে ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে আরও ৩৫ হাজার কোটি টাকা এবং বন্ডের মাধ্যমে সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
আগামী মাসগুলোতেও ব্যাংকঋণের চাহিদা উল্লেখযোগ্য থাকবে। নভেম্বর মাসে বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ৫৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা এবং ডিসেম্বরে ৩৮ হাজার ২০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর আগে চলতি অর্থবছরের জুলাই মাসে নিলামের মাধ্যমে ৫৬ হাজার কোটি টাকা, আগস্টে ৫০ হাজার কোটি টাকা এবং সেপ্টেম্বরে ৪১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার।
ব্যাংকব্যবস্থায় সরকারের ঋণ প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকা
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ বেড়েছে ১২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। এতে ব্যাংকব্যবস্থায় সরকারের মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯৮ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা।
এই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের চেয়ে ৩ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা বেশি পরিশোধ করেছে সরকার। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে সরকারের ঋণের স্থিতি কমে ৯০ হাজার ৩২৩ কোটি টাকায় নেমেছে।
অন্যদিকে, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরকারের ঋণ বেড়েছে ১৬ হাজার ৬০১ কোটি টাকা। এতে আগস্ট শেষে বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছে সরকারের ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৮ হাজার ২৬ কোটি টাকা।
বার্ষিক ঋণ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়ানোর আশঙ্কা
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে আগের অর্থবছরেও ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য থাকলেও প্রকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরের শুরুতেই ব্যাংকঋণের চাহিদা বাড়ায় নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ধরে রাখা সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। বেতন-ভাতা, জ্বালানি ব্যয়, রাজস্ব আদায় এবং বিদেশি ঋণ পরিশোধের পরিস্থিতি আগামী মাসগুলোতে সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।






