শেষ সেমিফাইনাল ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজতেই আটলান্টার স্টেডিয়াম বদলে যায় এক রাজনৈতিক মঞ্চে। ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে ওঠার আনন্দে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা মাঠেই মেলে ধরেন একটা ব্যানার, লেখা ‘লাস মালভিনাস সন আর্জেন্তিনাস’, অর্থাৎ ফকল্যান্ড আর্জেন্টিনার। প্রথমে ব্যানারটা ধরেন জিওভানি লো সেলসো, পরে যোগ দেন লিসান্দ্রো মার্তিনেজসহ আরও কয়েকজন। যদিও লো সেলসো নিজে একসময় ইংল্যান্ডের টটেনহাম হটস্পারে খেলেছেন। কিছুক্ষণ ব্যানার ধরে রাখার পর সেটা মাঠেই রেখে যান খেলোয়াড়রা। গ্যালারিতে তখন হাজারো সমর্থক গলা মিলিয়ে গাইছেন, ‘এল কে নো সালতা, এস উন ইংলেস’, মানে ‘যে লাফায় না, সে ইংরেজ’।
গোলশূন্য প্রথমার্ধের পর ৫৫ মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে এগিয়ে গিয়েছিল ইংল্যান্ড, কিন্তু ৮৫ মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজ আর যোগ করা সময়ে লাউতারো মার্তিনেজের গোলে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেয় আর্জেন্টিনা, দুটোতেই বল বাড়ান মেসি। এই জয়ে টানা দ্বিতীয়বার ফাইনালে আর্জেন্টিনা, রোববার প্রতিপক্ষ স্পেন।
মজার ব্যাপার হলো, ম্যাচের আগে কোচ লিওনেল স্কালোনি নিজেই বলেছিলেন, তিনি চান না এই লড়াই পুরনো যুদ্ধের প্রসঙ্গে জড়িয়ে যাক। কিন্তু জেতার মুহূর্তেই খেলোয়াড়রা ঠিক সেই পথেই হাঁটলেন।
মাঠে নামার আগেই কথার লড়াই

ব্যানার তো পরের ঘটনা, আসল উত্তাপ শুরু হয়েছিল ম্যাচের কয়েকদিন আগে থেকেই, রাজনীতিকদের মধ্য দিয়ে। আর্জেন্টিনার ভাইস-প্রেসিডেন্ট ভিক্টোরিয়া ভিয়াররুয়েল ম্যাচের আগের রাতে এক্সে পোস্ট করে ইংল্যান্ডকে বলেন ‘দখলদার জলদস্যু’ আর ‘হানাদার’। ৫১ বছর বয়সী এই রাজনীতিকের বাবা নিজে ১৯৮২ সালের যুদ্ধে লড়েছিলেন, ফলে তাঁর কথায় ব্যক্তিগত আবেগও ছিল স্পষ্ট। তিনি লেখেন, ইংরেজদের বিপক্ষে খেলা মানেই বাড়তি কিছু, এটা মালভিনাসের ব্যাপার, দিয়েগোর ব্যাপার, লিওর শেষ বিশ্বকাপের ব্যাপার।
একা ভিয়াররুয়েলই নন। এপ্রিলে যুদ্ধের ৪৪তম বার্ষিকীতে প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই বলেছিলেন, দ্বীপ ফিরিয়ে আনতে যা করা সম্ভব সবই করবে আর্জেন্টিনা। ম্যাচের আগে আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাবলো কির্নো দ্বীপের বাসিন্দাদের ‘কৃত্রিমভাবে বসতি স্থাপন করানো মানুষ’ বলে মন্তব্য করলে পাল্টা জবাব আসে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের দপ্তর থেকে। সেখানে বলা হয়, ‘দ্বীপবাসীরা ব্রিটিশ, নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই ঠিক করার অধিকার তাদের আছে।’
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপারও বলেন, সবার উচিত ফুটবলেই মনোযোগ দেওয়া, যা কখনো বদলায়নি তা নিয়ে নতুন করে বিভ্রান্ত না হওয়া। তবে ম্যাচ শেষের ব্যানার নিয়ে এখনো ব্রিটিশ সরকারের কোনো পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি। তবে ব্রিটিশ মিডিয়া কথা বলতে শুরু করেছে বিষয়টি নিয়ে।
ফকল্যান্ড ইস্যুটা আসলে কী
১৯৮২ সালে দক্ষিণ আটলান্টিকের ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে আর্জেন্টিনা আর ব্রিটেনের মধ্যে ৭৪ দিনের যুদ্ধ হয়। আর্জেন্টিনা দ্বীপটি দখলের চেষ্টা করেছিল, ব্যর্থ হয়। সেই যুদ্ধে প্রাণ হারান ৬৫৫ জন আর্জেন্টাইন সেনা, ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনা, আর দ্বীপের ৩ জন বাসিন্দা।
দ্বীপটি আজও ব্রিটেনের অধীনে, কিন্তু আর্জেন্টিনা একে ‘লাস মালভিনাস’ বলে নিজেদের ভূখণ্ড দাবি করে আসছে। ফুটবল মাঠেও এই দাবি নিয়মিত ফিরে আসে, সমর্থকদের গানে, ব্যানারে, স্লোগানে।
ফিফার নিয়ম কী বলে
ফিফার স্টেডিয়াম আচরণবিধি অনুযায়ী, রাজনৈতিক, আপত্তিকর বা বৈষম্যমূলক প্রকৃতির ব্যানার, পতাকা বা যেকোনো সরঞ্জাম মাঠে আনা নিষিদ্ধ। কেউ এমন কিছু নিয়ে এলে চাইলে কর্তৃপক্ষ তা বাজেয়াপ্ত করতে পারে। এ ছাড়া ফিফার শৃঙ্খলা কোডের ৫৪ নম্বর ধারায় ‘দর্শকদের উসকানি দেওয়া’র মতো আচরণের জন্য আলাদা শাস্তির বিধান আছে, যার আওতায় নিষেধাজ্ঞা পর্যন্ত হতে পারে।
এই ম্যাচের জন্য নিয়মটা আরও কড়াভাবে প্রয়োগ করা হয়েছিল। মার্কিন নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মিলে ফিফা আগে থেকেই ঘোষণা দিয়েছিল, স্টেডিয়ামে ফকল্যান্ড সংক্রান্ত কোনো ছবি বা লেখা নিয়ে প্রবেশ করা যাবে না, দুই দেশের জাতীয় পতাকা ছাড়া বাকি সবকিছুই এই তালিকায় পড়বে।

আর্জেন্টিনার নিরাপত্তামন্ত্রী আলেহান্দ্রা মন্তেওলিভাও এই সিদ্ধান্ত সমর্থন করেছিলেন। অর্থাৎ খেলোয়াড়রা শুধু সাধারণ নিয়মই ভাঙেননি, ম্যাচের জন্য আলাদাভাবে ঘোষিত একটা নিষেধাজ্ঞাও ভেঙেছেন।
অতীতে কারা শাস্তি পেয়েছিল
রাজনৈতিক প্রতীক নিয়ে ফিফার শাস্তির নজির নতুন নয়।
– ২০১৮ বিশ্বকাপে সুইজারল্যান্ডের গ্রানিত জাকা আর জেরদান শাকিরি সার্বিয়ার বিপক্ষে গোল করে আলবেনীয় ঈগল প্রতীক দেখিয়ে উদযাপন করেছিলেন, কসোভোর প্রতি সমর্থন জানাতে। ফিফা দুজনকে ১০ হাজার সুইস ফ্রাঁ করে জরিমানা করে, অধিনায়ক স্তেফান লিখটস্টাইনারকে ৫ হাজার ফ্রাঁ, কারণ তিনিও একই উদযাপনে যোগ দিয়েছিলেন। নিষেধাজ্ঞা এড়ালেও সতর্ক করা হয় তাদের।

– একই বিশ্বকাপে সার্বিয়ার ফুটবল ফেডারেশনকে সমর্থকদের বৈষম্যমূলক ব্যানার আর স্লোগানের জন্য জরিমানা করা হয়, যা সুইস তিন খেলোয়াড়ের মোট জরিমানার চেয়েও বেশি।
– পোল্যান্ডের ফুটবল ফেডারেশনও একই বিশ্বকাপে সেনেগালের বিপক্ষে ম্যাচে রাজনৈতিক ব্যানারের জন্য জরিমানা গোনে।
– ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচের আগে সার্বিয়া দল কসোভোর মানচিত্র আর ‘নো সারেন্ডার’ লেখা একটি ব্যানার টাঙিয়েছিল, যার জন্য ফিফা সার্বিয়ান ফেডারেশনকে জরিমানা করে।

এই বিশ্বকাপেই আগের একটা ঘটনা
ফকল্যান্ড প্রসঙ্গ এই টুর্নামেন্টে নতুন নয়। মিশরের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচ জেতার পর ড্রেসিংরুমে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের মালভিনাসের উল্লেখ থাকা গান গাইতে দেখা যায়, যার ভিডিও নিজেরাই সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করে। নিয়ম অনুযায়ী এটাও লঙ্ঘন হওয়ার কথা, কিন্তু ফিফা তখন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
একই সময়ে ইংল্যান্ডের কিছু সমর্থকের কাছ থেকে সেনার ছায়ামূর্তি আঁকা পতাকা, আর ব্যারো সমর্থকদের ডুবোজাহাজের ছবি সংবলিত পতাকা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, সামরিক প্রতীক হিসেবে গণ্য করে। এই দ্বৈত আচরণ নিয়ে তখনই প্রশ্ন উঠেছিল।
এখন কী হতে পারে
আগের বার লঙ্ঘন হয়েও পার পেয়ে যাওয়া আর এবারের ঘটনার মধ্যে ফারাক অনেকখানি। আগেরটা ছিল ড্রেসিংরুমের গান, সাধারণ নিয়মের সম্ভাব্য লঙ্ঘন। এবারেরটা প্রকাশ্যে মাঠে, খেলোয়াড়দের নিজ হাতে ধরা ব্যানার, তাও এমন এক নিষেধাজ্ঞা ভেঙে যা এই ম্যাচের জন্য আলাদাভাবে ঘোষণা করা হয়েছিল। ফিফা এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। সুইজারল্যান্ড আর সার্বিয়ার নজির বলছে, ফিফা চাইলে জরিমানা বা সতর্কবার্তা দিতে পারে, নিষেধাজ্ঞাও অসম্ভব না। তবে এই টুর্নামেন্টেই একবার আর্জেন্টিনাকে ছাড় দেওয়ার নজির থাকায় প্রশ্ন উঠছে, ফিফা কি আবারও একই পথে হাঁটবে, নাকি আলাদাভাবে ঘোষিত নিষেধাজ্ঞা ভাঙার কারণে এবার সিদ্ধান্ত বদলাবে।
আপাতত আর্জেন্টিনার মনোযোগ রোববারের ফাইনালে, স্পেনের বিপক্ষে। কিন্তু মাঠের বাইরের এই বিতর্ক শেষ পর্যন্ত কোন দিকে গড়ায়, সেদিকেও চোখ থাকবে ফুটবলবিশ্বের।







