ইস, রাজধানীতে এক মায়ের নিঃসঙ্গ মৃত্যু বুকে পাথর হয়ে দুদিন ধরে নির্ঘুম। ভাবছি যে মায়ের চার সন্তান, তিনি এতটা নিঃসঙ্গ হলে হালে ছোট্ট এক-দুটি সন্তান যাদের, সেই পরিবারে প্রবীণ জীবনের বিষণ্ন দিন কিভাবে কাটবে। কথা বলে, এক ছেলের মা কুকুর আর সাত ছেলের মা ঠাকুর। মানে কোনো মায়ের যদি এক ছেলে থাকে আর সে যদি কোনোভাবে বিগড়ে যায় তবে সেই মায়ের কপালে শনি নিশ্চিত। আর সাত ছেলে হলে একটা না একটা মাকে দেখবেই দেখবে। তাই ৭ ছেলের কোনো না কোনোটা মাকে দেখবেই– এ প্রবাদ বহু পুরাকালের। হালের বাস্তবতা ভিন্ন। তথাপিও রাজধানীতে এক মায়ের নিঃসঙ্গতা ও একাকী ঘরে মৃত্যুর ঘটনাটি মন থেকে সরাতে না পেরে হাতে কলম ধরা।
জীবন একটি টোটাল প্যাকেজ। সুখ, দুঃখ, সন্তানের বেড়ে ওঠা, সন্তানের সাফল্য, তাদের প্রতিষ্ঠা, সময়ের ধারায় সন্তানের দেশ-বিদেশ ছড়িয়ে পড়া টোটাল প্যাকেজ। পিতা-মাতার আনন্দ-আবেগ সব সেই সন্তানের পিছে পিছে ঘোরে জীবনের বেশিরভাগ সময়ই। সন্তানের সাফল্য যত বাড়ে অভিভাবক পিতা-মাতার আনন্দ তত বাড়ে। এক্ষেত্রে আলবার্ট আইনস্টাইনের সেই কালজয়ী উক্তি– “অন্যের জন্য বেঁচে থাকা জীবনই সার্থক জীবন।” উল্লেখ করা চলে। আর একজন পিতা-মাতা যে তার সন্তানের জন্যই বাঁচেন এর চেয়ে বড় সত্য আর কিছু আছে কি? এদিকে পাল্লা দিয়ে বাড়ে পিতা-মাতার বয়স। একদা পূর্ণ ঘর ছোট হতে হতে শূন্য হয়ে পড়ে। নিঃসঙ্গ মনে একাকিত্বের যন্ত্রণা। আবেগ, প্রিয়জনের মনোযোগ পেতে মরিয়া মা-বাবা দিন-প্রহর গোনেন তসবির পুঁতিতে, নামাজে, প্রার্থনায়। তাতে আর কতক্ষণই বা সময় কাটে?
প্রবল ব্যক্তিত্বের, প্রখর প্রজ্ঞার মা কিংবা পিতা সন্তানের অনুপস্থিতিতে একটু একটু করে ঘরের বাইরে চারপাশের কারো না কারো প্রতি নির্ভরশীল হতে চান। ভাগ্য ভালো হলে তাঁরা তাদের নিঃসঙ্গ দিনে একাকী সময়ে ভালো মনের মানুষের সন্ধান পান। যার কাছে তাঁরা খুঁজে নেন নির্ভরতা। কিংবা কথা বলার খানিক সময়। বয়সের বিবেচনায় ঘরের সব কথায় যে বলা যায় কিংবা বলা যায় না সেই বোধটুকু আগের মতো তাদের সবার মনে থাকে না। নিঃসঙ্গ দিনের একাকীত্বের বেদনা ঘোচাতে তাঁরা মেলে বসেন দিনপঞ্জির খেরো খাতা। পরিবারের সুখ-দুঃখ, সন্তান-সংসারের পুরোনো পুঁথির ঝাঁপি মেলে দেন সেই অনাত্মীয়, দূরের কিংবা কাছের আত্মীয়ের কাছে। যে পিতা-মাতা প্রখর ব্যক্তিত্বের টানাপোড়েনে ভোগেন, সন্তানকে নির্ভরতার প্রতীক ভাবেন না কিংবা সেভাবে আঁকড়ে ধরেন না, তাহাদের মনস্তাপ খানিকটা ভিন্ন। তারা হয়তো ভাবেন, “থাকো তোমরা তোমাদের মতো, ভালো থাকো! আমি আমার মতো আছি!” এই যে শেষ ধাপে এসে মায়েরা-পিতারা সন্তানের কাছ ছাড়া হলেন এখানে তাদের মনে কাজ করে আবেগ। তার কতকটা অভিমানে, কতকটা আবেগে। আর নির্মম সত্য হলো স্বজন-আত্মীয়ের চারপাশের কারো কারো কানকথায়। বয়সের অভিমান বড্ড ইগো-জনিত। সেখান থেকেই বাড়ে আরো নিঃসঙ্গতার আঁধার।
ব্যক্তি নারী-পুরুষেরা জীবনের শেষ সময়ে এসে এই যে নিজেকে একাকী বা বিচ্ছিন্ন করার যে প্রবণতা, তা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের জনক এবং মনোসমীক্ষণ পদ্ধতির উদ্ভাবক সিগমুন্ড ফ্রয়েডের তত্ত্বের আলোকে খানিক ব্যাখ্যার দাবি রাখে। বিশ্বখ্যাত অস্ট্রিয়ার মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েডের তত্ত্বের আলোকে, “নিঃসঙ্গতা হলো মানুষের মনের অবদমিত অনুভূতি।
অতৃপ্ত শৈশবকালীন আকাঙ্ক্ষা এবং নিজের অন্তর্নিহিত ইগো এবং সুপার ইগোর মধ্যকার মানসিক দ্বন্দ্বের একটি বাহ্যিক প্রকাশ।
বিশ্বখ্যাত এই মনোবিদ তাত্ত্বিক মনে করেন, “নিঃসঙ্গতায় মানুষেরা মনের দ্বন্দ্ব ও উদ্বেগ থেকে বাঁচতে ব্যক্তির ইগো আরো প্রখর হয়ে ওঠে। তখন সেই ব্যক্তি তার অবচেতন মনে কতক অবচেতন কৌশল ব্যবহার করে। যেমনঃ প্রথমতঃ দমন বা জোর করে নিজের জীবনের বেদনাদায়ক স্মৃতি ভুলে যেতে চাওয়ার। দ্বিতীয়তঃ প্রক্ষেপণ বা নিজের দোষ অন্যের উপর চাপানো এবং তৃতীয়তঃ যুক্তি প্রদান, মানে কোনো ব্যর্থতার জন্য খোঁড়া যুক্তি দেখানো৷ বাস্তবতায় প্রবীণদের মধ্যে উল্লেখিত তিনটিরই উপস্থিতি দেখা যায়। বাস্তববে বহু মানুষের সাথে কথা বলনে-চলনে আজকাল সমস্যাগুলো আরো বেশি চোখে পড়ছে। হয়তো সন্তানেরা ডাকবেন, এসো মা ঘুরে যাও, না না এখন ধান উঠবে, গাছের আম নামবে এখন কোথাও যাবো না। খোঁজ নিলে দেখবেন ধান উঠতে আরো মাস দেড় মাস বাকি, আম পাকতে বাকি ঢের দিন। আসলে এখানে মায়েদের মনস্তাত্ত্বিক বোধে কাজ করে নিজের স্বামীর ভিটে ছেড়ে আর কোথাও না যাওয়া। তাছাড়া বয়সের সাথে সাথে একের অধিক সন্তান পালনে দিন-রাত এক করা অনেক মায়েরাও চান না ছেলের সন্তান হয়েছে সুদূর কানাডায় যাবেন কিংবা নিজ ঘর ছেড়ে আরেক জায়গায় যেতে তাদের মন টানে না।
ঘুরে ফিরে নিজের গণ্ডিবদ্ধ জীবনে এক গতানুগতিক চক্রিতে ঘুরতে থাকেন। বাড়তে থাকে নিঃসঙ্গতা৷ কেননা উন্নত বিশ্বের মতো আমাদের দেশের মায়েরা-নারীরা নিজেদের জীবনকে পরম যত্নে লালন-পালনের চিন্তা করেন না বা অধিকাংশ নারীর/মায়েদের সেই সুযোগ থাকে না বললেই চলে। এদেশের নারীরা স্বামী-সন্তানের মধ্যে নিজের জীবনের সকল চাওয়া-পাওয়ার হিসেব খোঁজেন। ব্যক্তি তাঁর নিজের কিছু আবেগ, আনন্দ, বিনোদনের কথা কজন নারী ভাবেন বলেন তো। আবার যারা আলাদা করে ভাবেন না বটে তবে সন্তানের সাহচর্যে কতটা আনন্দময় হবে একজন নারীর জীবন সেটা তো বহুমুখী শর্তে নির্ভরশীল। বউ-শাশুড়ি, ছেলের সম্পর্ক, আন্তরিকতা কত কিছুর উপর নির্ভর করে তবেই শেষ জীবনে নারীর ভালো বা মন্দ থাকাটা নির্ভর করে। আবার ঘরের বাইরে নারীরা প্রয়োজনে ওল্ডহোমে যাবেন এমন মানসিকতার জন্য যে পূর্বপ্রস্তুতি থাকে তাও আজকের সমাজ বাস্তবতায় যৌক্তিক হয়ে উঠতে পারেনি। একজন কর্মজীবী নিঃসন্তান নারী শেষ জীবনে আত্মীয়-স্বজন ছাড়া একান্ত সন্তান-স্বজনের বাইরে প্রয়োজনে প্রবীণ নিবাসে থাকবেন বা থাকাটা খুব জরুরি হলেও সেই সুযোগ নারীর জন্য আছে কি না। খোদ রাজধানীতে কর্মজীবী নারীদের জন্য হোস্টেলে কত নারী দিনের পর দিন কাটিয়ে দিচ্ছেন? আবার জাতীয় প্রেসক্লাবে কত প্রবীণ সাংবাদিকের থাকা-খাওয়া, সময় কাটানোর সেই হিসেব কজন রাখেন! সর্বোপরি ঢাকা ক্লাবের সদস্য কত কত ধনী, বিত্তশালী, বনেদি পরিবারের নারী-পুরুষেরা জীবনের শেষ সময় কাটাতে বেছে নিয়েছেন “ক্লাবের হোটেল-জীবন”।
এসব কত ঘটনা আমরা জানি, সামনে আনি? আনি না কারণঃ একটি পর্যায়ের একদল মানুষের সমাজে অবস্থান আছে, আছে সুযোগ ও পর্যাপ্ত অর্থ। এর বাইরে নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের যত রকমের সমস্যাঃ অর্থের সমস্যা, লোকলজ্জার সমস্যা, মানিয়ে নেওয়ার সমস্যা, বলা বা না বলার জন্য তাই নিরবে নিভৃতে নিঃসঙ্গতার বলি হওয়া। যৌথ পরিবার, যুক্ততার জীবন যখন হালের কয়েক দশকে উপযোগিতা হারিয়েছে তখন প্রবীণ নারী কিংবা পুরুষের জন্য প্রয়োজনে মানসম্মত প্রবীণ নিবাস এবং নিবাসে থাকার মতো মানসিক প্রস্তুতি— এর কোনটাই মধ্যবিত্তের মনস্তাত্ত্বিক বোধে আসে বলুন তো।
কোন নারীর ছেলের বউয়ের সাথে বনিবনা না হতেই পারে তাই বলে তিনি বেছে নেবেন একাকী নিঃসঙ্গ জীবন? কিংবা একজন বিধবা নিঃসঙ্গ নারী/মা কিংবা স্ত্রী হারিয়ে একাকী জীবন কাটানো স্বামী/পিতার জীবনে সঙ্গত কারণেই আগের সেই ঘর উজাড় করা সুখ, সন্তানের কলকাকলি, স্কুল-কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের, মেডিকেল কলেজে ভর্তি কিংবা প্রথমবার সন্তানের দেশের বাইরে গমনের আনন্দের পরিবেশ প্রতিদিন নতুন লাগবে না। পাশাপাশি তাঁর নিজের শৈশব-কৈশোরের সুখ-দুঃখের স্মৃতি, পাওয়া-না-পাওয়ার হিসেব-খাতা মেলানোর বিস্তর অবকাশ মেলতেই পারে একাকী জীবনে। আর তখন যদি তিনি কারো সাহচর্য না পান তবে আরো একাকী হবেন, এটাই স্বাভাবিক। সেই নারী-পুরুষ/পিতা-মাতা নিঃসঙ্গতাকে বেছে নিয়ে নিজের মনের আকাঙ্ক্ষার অবদমন করবেন? সন্তানেরাও কেন মা-বাবাকে উদ্দীপ্ত করবেন না যে, “বাবা-মা তোমরা আনন্দে বাঁচো”?
তবে আমাদের সমাজে আরেক ভিন্ন চিত্রও আছে। বিশেষ করে গ্রামে গ্রামে এবার ঈদের ছুটিতে গিয়ে কত কত অভিযোগ— সন্তানের সাথে মায়ের দূরত্ব, মাকে খাওয়া-পরা, ওষুধের টাকা না দিতে অস্বীকার করার অভিযোগ শুনলাম। মনটা বিষণ্ন হলেও ঘরে ঘরে অশান্তির বিষবাষ্প এতটা বেড়েছে কেন, সেই অনুসন্ধান করেছি খানিক। কেননা শহর থেকে গ্রামে গেলে কতক প্রবীণ প্রত্যাশা ঘরে আসেন, তাদের জন্য কিছু করার চেষ্টায় পূর্বপ্রস্তুতি নিয়েই যাই৷ এবারে পুরাতনের ভিড়ে অনেক নতুনের আগমন দেখে বিস্মিত হয়েছি! যে ছেলেটি ৬ মাস আগেও ভালো ছিল আজ সে বিগড়ে গেছে। মুরব্বিরা বসে যখন জানতে চাইলেন তখন ছেলের সাফ জবাব, ইনকাম নেই, কাহাতক মায়ের ভরণপোষণ করবেন? এটা তো হালের আরেক বাস্তবতা। তথাপিও গ্রামের সেই মায়েরা অপেক্ষাকৃত ভালো আছেন এই বিবেচনায় যে, তিনি একাকী বা নিঃসঙ্গতায় ভুগছেন না। বরং গ্রামের এ বাড়ি সে বাড়ি, ঘরে ঘরে গিয়ে চেয়ে-চিন্তে খাচ্ছেন৷ সাথে ছেলে, ছেলের বউয়ের বিরুদ্ধে নানান নালিশ-সালিশ করে মনের খেদও মেটাচ্ছেন। সেই গ্রামীণ নিম্ন হতদরিদ্র মায়ের লাজ-লজ্জার বালাই নেই বটে। এই হতদরিদ্র নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী পরিবারের মায়েদের ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করবেন কি করবেন না, মনের সেই ইচ্ছাকে অবদমিত করার কোনো প্রশ্ন নেই, তাই তাদের মন খারাপের বা অপরাধবোধের বালাই প্রসঙ্গও অবান্তর।
তবে শিক্ষিত সুশীল মধ্যবিত্ত, উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারে নারী-পুরুষ/পিতা-মাতার নিঃসঙ্গতার সমস্যা ভয়ানক। কেননা এই পরিবারের নারী-পুরুষেরা সমাজে তাদের অবস্থান, সম্মান, মর্যাদার যে আসনে আসীন সেখান থেকে সম্মানহানির ভয় প্রবল। আবার সেই পিতা কিংবা মাতার ইগোও কিন্তু টনটনে। প্রখর ইগোর কারণে নিঃসঙ্গতায় তাঁরা তাদের অবদমিত মনের যা ইচ্ছা তা প্রকাশের স্বাধীনতা রাখেন না, বরং সীমিত করেন। ফলে নিঃসঙ্গতার আঁধার তাঁদের কুড়ে খেয়ে বন্দিত্বের বাসিন্দা করে। “ঘরের কথা পরকে বলাটা ঘরের প্রাইভেসি নষ্টের সমস্যা”— তা মা-বাবা, সন্তান তথা ছেলে-মেয়ে উভয় তরফের জন্যই প্রকট সমস্যা।
তাই সমাজের অপেক্ষাকৃত বিত্তশালী, বনেদি, সফল ও মর্যাদাসম্পন্ন পরিবারের মায়েদের হয়তো খাওয়া-পড়ার অভাব নেই। তবে আছে ব্যক্তিত্বের টানাপোড়েন এবং একদা ঘরভর্তি অসংখ্য স্বজন-আত্মীয়ের ভিড়ে হঠাৎ সন্তান-স্বজনের ভিড়ে একদিন একাকী নিঃসঙ্গ হওয়ার যন্ত্রণা। এর জন্য অবশ্য বাঙালি জনমানুষ ও বাংলাদেশের সমস্যা খুব গভীরে এদেশের মানুষের
মনস্তাত্ত্বিক বোধে সেই আঙ্গিকে চিন্তার জটিলতায়। যেমনঃ আমাদের সমাজে কারো সন্তান লেখাপড়ায়, প্রতিষ্ঠায় সাফল্য পায়, সমাজে তাদের আদর-কদর যেমন বাড়ে তেমনি তাদের সাফল্যে হিংসা-বিদ্বেষও দ্বিগুণ হারে বাড়ে। যে সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে মা-বাবা কষ্ট করে সন্তানদের বড় করেন, সন্তানেরা বুয়েটে, মেডিকেলে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, ভালো চাকরি, সমাজে প্রতিষ্ঠা পায়, তখন স্বজন-আত্মীয়ের মর্মবেদনা ও পীড়ার কারণ হয় একটি পরিবারের সফল উত্থান।
সন্তানের উন্নতিতে পরিবারটির মান যত বাড়ে আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষের বিষবাষ্প ততটাই ছড়ায়। সন্তানেরা কাজের প্রয়োজনে দূরে গেছে, মা-বাবা ক্রমশ একাকী হন। এর মধ্যে মায়ের মৃত্যুতে বাবার কিংবা বাবার মৃত্যুতে মায়ের শোক ও নিঃসঙ্গতা বাড়ে। যে অভিভাবকেরা একসময় সন্তানের সাফল্যে ঈর্ষাপরায়ণ আত্মীয়-স্বজনদের থেকে সন্তানদের দূরে সরিয়ে রাখতেন, নিজেরাও দূরত্ব রাখতেন। একাকী জীবনে সেই মা-বাবার নিঃসঙ্গ সময়ে হিংসা-বিদ্বেষ নিয়ে ঘোরা স্বজনেরা নিঃসঙ্গ বাবা-মায়ের কাছের আত্মার আত্মীয় হয়ে ওঠেন। তখন কিন্তু হিতে বিপরীতটাই ঘটে। অপেক্ষাকৃত ব্যর্থ ও অসফল আত্মীয়রা সফল স্বজনদের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষের বিষবাষ্প ক্রমশ আরো ঘনিয়ে প্রকাশের সুযোগ কাজে লাগান।
যেহেতু বয়সের সাথে সাথে একাকী নিঃসঙ্গ প্রবীণ মা-বাবা ক্রমশ শিশু হতে থাকেন। সন্তানের ব্যস্ততা, ছোট ছোট অজুহাত বড় হতে হতে মনের গভীরে রাগ, ক্ষোভ, ঘৃণার জন্ম নেয়। সন্তানের বিরুদ্ধে ক্ষোভ নিঃসঙ্গ বাবা কিংবা মা জনে জনে বলেন। সেই বলাটাই আরো কাল হয়। স্বজনেরা মা কিংবা বাবার একাকী জীবনের সেই সব অভিযোগে “ঘি” ঢালেন, আরো চেতিয়ে ও তাতিয়ে দেন। সন্তানের সাথে মায়েদের/বাবাদের দূরত্ব বাড়ে! এভাবে তৃতীয় পক্ষের প্ররোচনায় বয়সী মানুষের খেদ বাড়ে, রাগ-অভিমানে জেদ বাড়ে। এক পর্যায়ে রাগে-অভিমানে সন্তানেরাও আরো দূরে সরে যায়!
আরেক বাস্তবতা হলোঃ ছেলে সন্তানেরা তো তাদের স্ত্রীর দ্বারা প্রভাবিত হন। পরের মেয়েটি যদি শাশুড়িকে তাঁর মনস্তাত্ত্বিক আঙ্গিক ধরে কাছে না টানেন তবে তো সেই দূরত্ব আরো বাড়তেই থাকে৷ আমাদের সমাজে ছেলেরা নিজ মায়ের প্রতি যতটা দায়িত্বশীল, এর চেয়ে ঢের বেশি সচেতন স্ত্রীর মা মানে শাশুড়ির প্রতি, এটাও এদেশের একটি বাস্তবতা। খুব কম ছেলে আছে যারা বিয়ের পরেও নিজ মায়ের প্রতি সমানভাবে দরদি, সমব্যথী। কিংবা স্ত্রীর অনুমতি-সাপেক্ষের ঊর্ধ্বে উঠে নিজের মায়ের প্রতি যথাযথ দায়িত্বশীল আচরণ করতে পারেন। তবে এর ব্যতিক্রমও আছে৷ অনেক মা কিংবা বাবার একাকী জীবনে ছেলে-বউমা দেবতা তুল্য করে রাখেন। সেই সংখ্যা কম হলেও দৃষ্টান্ত হিসেবে কম হবে না। আর হালের সমাজব্যবস্থায় নৈতিকতায়, মূল্যবোধে, দায়িত্বশীল মানুষের সংখ্যা এতটা কমেছে যে, নারীরা আরেক মাকে সেভাবে গ্রহণ করে না, আবার ছেলেও কিন্তু মেরুদণ্ড নিয়ে মা-বউয়ের মধ্যে ভারসাম্যের আচরণ বজায় রাখতে পারে না।
উন্নত বিশ্বের ভিন্ন দেশে বাঙালি জনমানুষের ন্যায় হিংসা-বিদ্বেষ, বিষবাষ্পের সেই মনস্তাপ অনেকটাই কম। তাছাড়া সেসব দেশে নারীরা ব্যক্তি-স্বাধীনতা উপভোগ করেন নিজের মতো করে। বার্ধক্যের জীবনও তারা স্বাধীন ও নানানভাবে উদযাপনে আনন্দে কাটান, যা এদেশের নারীদের মনস্তাপে নেই বললেই চলে।
আবার মা/বাবার একাকী জীবনে কাছের-দূরের স্বজনদের ঘনিয়ে বসে কাছে বিষ দেওয়ার মতো আত্মীয়-স্বজনও থাকে না বলেই মনে করি। এরপরেও প্রবীণদের দেখভাল, থাকা-খাওয়ার জন্য ওল্ডহোম বা প্রবীণ নিবাস আছে। সমাজের দৃষ্টিভ্রমে
“ওল্ডহোমে বসত” খারাপ কিছু না। বরং একটা সময়ে গিয়ে প্রবীণদের সময় কাটানো, মনে-শরীরের নিবিড় পরিচর্যা, রোগের দাওয়াই দিতে অবশ্যই গ্রহণীয় এক পথ— ওল্ডহোম বা প্রবীণ নিবাস। যা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কাঠামোতে এখনো গ্রহণযোগ্যতা পায়নি৷ ফলে ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্য আলাদা যে নারীটি, যিনি ছেলে কিংবা ছেলের বউয়ের সাথে মানিয়ে চলতে না পারলে সামর্থ্য থাকলেও তিনি চাইলে প্রবীণ নিবাসে থাকবেন, সেই মানসিকতা গড়ে ওঠেনি। আবার এদেশে ওল্ডহোমে বা প্রবীণ নিবাসী হওয়া সন্তানকে শূলে চড়িয়ে দোষারোপের অপরাজনীতির দ্বারা স্বীকৃতির এক পথ। তবে সময়, পরিবেশ, ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যের সমস্যা, ইগোর সমস্যা কিংবা এসব কিছুই না— প্রিয়জন, স্বজন, সন্তান নেই তবে সামর্থ্য আছে, সেই নারীরাও চাইলেই ওল্ডহোমে গিয়ে থাকবেন, সেই দৃষ্টিভঙ্গিগত সমস্যা আজও প্রকট। যদিও এখন প্রবীণ নিবাসের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধির সময় এসেছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে নীতিনির্ধারকেরা নিশ্চিত এ বিষয়ে ভাববেন, সেই প্রত্যাশা করি।
কেননা আজও এদেশের মায়েরা মেয়ের কাছে থাকবেন বা নির্বিঘ্নে কোনো বাবা-মা মেয়ের কাছে থাকবেন, সেই দৃষ্টিকোণটি খুব ন্যারো। মা হয়তো বলবেন, “যাহ, মেয়ে-জামাইয়ের বাড়িতে থাকবো নাকি!” না থাকা যায়— এমন ভাবনাগ্রস্ত। একইভাবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ছেলের বউ মেয়ে হতে পারেন না। এটা উভয়মুখী সমস্যা শাশুড়ি ও ছেলের বউদের মনস্তাপে। সুতরাং বউ-শাশুড়ির সংঘাত খুব ছোট্ট ছোট্ট বিষয়ে, সামান্য ঘটনায় বড় হতে থাকে। তাতে বাড়ে দুঃখ, যন্ত্রণা, মায়েদের বয়সকালের অভিমান, বাস্তবতা না বোঝার ঝোঁক। আর চারপাশের প্রতিবেশী থেকে স্বজন-আত্মীয়েরা তো মনের গভীরে বিষ প্রবেশে মা কিংবা বাবাকে নিত্যদিন জ্বালানি দিয়ে উত্তপ্ত করে থাকেন, এটা হালের সমাজের আরেক বাস্তবতা। এমনকি ঘরে থাকা বাঁধা কাজের লোকও মা কিংবা বাবাকে তাদের শিশুতোষ মনে বিষ ঢোকান— “চাচা, ভাইয়া তো এটা করলো না! ভাবী এটা বলেছে”— ইত্যাদি! “আপনার মেয়ে তো একটা করতে পারতো, করা উচিত ছিল”— এমন নানান ঘটনার নানান বাস্তব নজির আমাদের চারপাশে। আর মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত পরিবারে এসব সমস্যা ক্রমশ জটিল হয়ে উঠেছে।
বস্তুত পরিবারের সন্তান, ছেলের বউ, শাশুড়িরা মুখে মুখে তর্কাতর্কি করতে পারে, প্রয়োজনে চুলোচুলি করেও মনের রাগ-ক্ষোভ মেটাতে পারে। বউ-শাশুড়ি আবার একসময় মিলে গিয়ে একে অন্যের চুলে বিলি কাটছেন, চুল আঁচড়ে দিচ্ছেন।
শিক্ষিত পরিবারে এই যে রাগ-ক্ষোভ বহিঃপ্রকাশের সুযোগ নেই। বরং একে অন্যের সম্মান রাখতে গিয়ে দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করেন আর এভাবে ক্রমশ দূরত্ব বাড়ে, মনের ভারে আরো জমে মেঘ আর মেঘ, নিঃসঙ্গতায় বলি হয় পরিবারের সদস্যরা। এই একে অন্যের সম্মান বাঁচাতে দূরত্ব রাখা, এটা আরেক মারাত্মক ভুল। দূরত্ব থেকে মনের দূরত্ব বাড়তে বাড়তে চোখের আড়াল তো মনের আড়াল!
এদেশের ঘরে ঘরে শিক্ষিত পরিবারে আজকাল বড্ড “ইগো”। সেই “ইগো” টপকে ছেলে যেমনঃ মাকে বলতে পারেন না— “মাগো তোমাকে বড্ড ভালোবাসি, তবে পরিস্থিতি, কাজের চাপ, কত কিছু আমার/আমাদের অনুকূলে না।”
একইভাবে ছেলে বললেই যে মা/বাবা ছেলে-মেয়ের কথা মানবেন, সহজে গ্রহণ করবেন, এমনটাও ঘটে না।
আসলে রাখঢাকের বাঙালি সমাজ-পরিবারের মনস্তাত্ত্বিক বোধে পরিবর্তন খুব জরুরি। এর জন্য আগে সহজাত মানুষ হিসেবে মানুষের যেসব গুণাবলি দরকার তার চর্চা জরুরি। যেমনঃ ছেলে মানে গাছের গোটা, মেয়ে তো পরের বাড়ি যাবে, ছেলের ঘরে মানানো যাবে না। মেয়ে-জামাই কি আপন ঘর হয়? বউ তো মেয়ে হতে পারে না ইত্যাদি। পরের মেয়েকে শাশুড়ি কেন মেয়ের মর্যাদায় দেবেন, এসব তো খুব বেশি ঘটে না। বরং রশি-টানাটানি আর মনস্তাত্ত্বিক বোধে হিংসা-বিদ্বেষের বিষবাষ্প ছড়িয়ে সফল, প্রতিষ্ঠিত পরিবারের প্রতি চারপাশের বিদ্বেষ যেন বাঙালির চিরায়ত লোকবিশ্বাস আর স্থূল আচরণের বহিঃপ্রকাশই আরো ঘন হয়ে চেপে বসেছে বাঙালির মনে-মননে।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








