আন্তর্জাতিক

ইজরায়েলের নির্বাচনে নেতানিয়াহু’র পরাজয় মানেই কি ফিলিস্তিনের জয়?

ইজরায়েলের নির্বাচনে নেতানিয়াহু’র পরাজয় মানেই কি ফিলিস্তিনের জয়?

ছবি: এআই।

ভোট শেষ হয়েছে ঠিকই, কিন্তুে এরপরই ক্ষমতা ধরে রাখার মূল নাটক শুরু। ইজরায়েলের নির্বাচনের ফলাফল ঘোষনার পর এক সপ্তাহ কেটে গেলেও, নতুন সরকার গঠন করা সম্ভব হয়নি। নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েও সরকার গঠনের দৌড়ে পিছিয়ে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু‘র জোট। অপরদিকে আরব জোটের সমর্থন পেয়ে এগিয়ে আছেন বিরোধী জোটের নেতা গদি আইজেনকট। তবে নেতানিয়াহু কিংবা আইজেনকট যিনিই সরকার গঠন করুক না কেনো, তা বিধ্বস্ত ফিলিস্তিনে কি ইতিবাচক প্রভাব বয়ে আনবে ‍সেটির দিকেই তাকিয়ে বিশ্ব।

সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, রবিবারই (০৮ অক্টোবর) সরকার গঠনের প্রার্থী চূড়ান্ত করবে প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হার্জগ।

ইজরায়েলের নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১ আসন। সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছিল প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টি(৫৩)। তবে নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের মিত্র ‘ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম পার্টি’ জোট ছাড়ার ফলে লিকুদ পার্টির বর্তমান আসন সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৬ এর ঘরে। অপরদিকে, এ নির্বাচনে আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ৪৮ আসন পেয়েছে।

তবে, এবারের নির্বাচনে ট্রাম্পকার্ড ছিলো আরব নেতৃত্বাধীন জোট। যাদের ঝুলিতে রয়েছে রেকর্ড ১৯ টি আসন। অর্থাৎ আরব দলগুলো যে জোটেই যাক না কেনো রয়েছে চ্যালেঞ্জিং ফিগার ৬১ অতিক্রম করে সরকার গঠনের সুযোগ। আর এখানে খেলার মোড় ঘুরে গেছে। নেতানিয়াহুকে হঠাতে বিরোধী জোটকে বেছে নিয়েছে আরব দলগুলো।

ইসরায়েলের রাজনীতিতে আরব জোট বলতে মূলত ইসরায়েলের আরব-ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী জোটকে বোঝায়। তাদের মূল রাজনৈতিক অবস্থান হলো—ইসরায়েলের আরব সংখ্যালঘুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, বৈষম্য দূর করা এবং ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার সমর্থন করা।

বৃহস্পতিবার (০৫ অক্টোবর) ইজরাইলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হার্জগের সাথে একে একে বৈঠকে বসেন রাজনৈতিক দলগুলো। এসময় গাদি আইজেনকটের জোটকে সমর্থন দেয় আরবদের জোট জয়েন্ট লিস্ট (১১আসন)। আলাদাভাবে সমর্থন দিয়েছেন আরবদের আরেকদল রা’আম (৮ আসন)।

প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হার্জগের কাছে দেওয়া সুপারিশে আইজেনকট ৬৭ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন পেয়েছেন। ফলে প্রেসিডেন্ট নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছে।

এখন নেতানিয়াহুর দল ‘লিকুদ পার্টি’ যদি ইসরায়েলের ক্ষমতায় না আসে, তাহলে ফিলিস্তিনের ভবিষ্যতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে কিংবা ইসরায়েলের দখলদারত্বের অবসান ঘটবে।

বিষয়টি বুঝতে হলে ইসরায়েলের রাজনীতি, ফিলিস্তিন নীতি ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিকে আলাদা করে দেখতে হবে।

২০২৬ সালের ২৭ অক্টোবরের ইসরায়েলি নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহু বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটের অবস্থান বিষয়টি স্পষ্ট করে। ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে তিনি নেতানিয়াহুর অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিকে তিনি সমর্থন করেন না। তার বক্তব্য, জর্ডান নদী থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত এলাকায় ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকতে হবে। কিন্তু ২০২৬ এর নির্বাচনের সরকার গঠন করতে হলে আইজেনকটের আরব জোটের সমর্থন প্রয়োজন।

আবার আরব জোটের সমর্থনে সরকার গঠন করা আর আরব জোটের আদর্শ অনুযায়ী সরকার পরিচালনা করা এক বিষয় নয়। আইজেনকটের সাথে জোট কিংবা সরকার গঠনে সমর্থন দিয়ে ফিলিস্তিন ইস্যুতে কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলেও হতে পারে। এর মধ্যে—

০১. অবৈধ ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ সীমিত হতে পারে: ফিলিস্তিনিদের জমি দখল ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ আসতে পারে। পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি জনবসতিগুলোর ভৌগোলিক সংযোগ রক্ষার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আইজেনকট নিজেও পশ্চিম তীরের ‘ই ওয়ান’ এলাকায় বসতি সম্প্রসারণের বিরোধিতা করেছেন। তবে তিনি ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের সম্পূর্ণ বিরোধী নন।

০২. আইজেনকটের সরকার গঠিত হলে গাজা নিয়ে কয়েকটি পরিবর্তন আসতে পারে: হামাসের শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটানোর চেষ্টা চলবে। আন্তর্জাতিক উদ্যোগে গাজার প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠনের আলোচনা হতে পারে। যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ বা আরব দেশগুলোর অংশগ্রহণে নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে।

তবে আইজেনকট বলেছেন, হামাসের সামরিক ও শাসনক্ষমতা বিলুপ্ত না হলে ইসরায়েল গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে না। ফলে দ্রুত সেনা প্রত্যাহারের নিশ্চয়তা নেই।

০৩. ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ বাড়তে পারে: আরব জোটের অন্যতম দাবি হলো ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং স্বাধীন রাষ্ট্রের লক্ষ্যে আলোচনা পুনরায় শুরু করা।

তারা সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন দিলে এ বিষয়ে চাপ প্রয়োগ করতে পারে।

৪. নেতানিয়াহুর ডানপন্থী মিত্রদের প্রভাব কমতে পারে: এটি ফিলিস্তিনিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন হতে পারে। নেতানিয়াহুর সরকারের কট্টর ডানপন্থী রাজনীতিকদের মধ্যে রয়েছেন ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোট্রিচ। তাদের রাজনৈতিক অবস্থান,পশ্চিম তীরের ওপর ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা।

কিন্তু ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের গাজা যুদ্ধে আইজেনকটের সন্তান ও দুই ভাতিজা নিহত হন। সেই ক্ষোভ তার মধ্যে থাকা অবান্তর কিছু নয়। আইজেনকট তার নির্বাচনী প্রচারণায় আরব দলগুলোকে নিয়ে সরকার গঠনের বিরোধিতা করেছিল। তার জোটের কয়েকটি দলও আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনে আপত্তি জানিয়েছে।

৬ নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গাদি আইজনকট আরব দলগুলোর সমর্থন গ্রহণ করছেন। কিন্তু তাদের নিয়ে সরাসরি সরকার গঠনে এখনো সম্মত নন। এখানেই ইসরায়েলের নতুন সরকার গঠনের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় জটিলতা তৈরি হয়েছে।

অর্থাৎ, আরব দলগুলোর ভোটে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথ তৈরি হলেও তাদের সরকারে অন্তর্ভুক্ত করতে তিনি আগ্রহী নন। এখন আরব দলগুলোর সমর্থন গ্রহণ করলেও তাদের সরকারে অন্তর্ভুক্ত করা হবে কি না, সেটি এখনো বড় প্রশ্ন।

তাই আইজেনকটের সরকার স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে এগোবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। তবে আইজেনকটের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হলে নেতানিয়াহুর মতো কট্টরপন্থীদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকার সম্ভাবনা কিছুটা কমবে। ফলে ফিলিস্তিনিদের ওপর চাপ সৃষ্টিকারী কিছু নীতির পরিবর্তন হলেও হতে পারে।

বিষয়:আইজেনকট আরব নেতৃত্বাধীন জোট ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম পার্টি ইজরায়েল নেতানিয়াহু প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হার্জগ

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…