বিজেপির ‘দেশবিরোধী’ তকমার নিশানায় দিয়া, আরও যারা আছেন

বলিউড অভিনেত্রী দিয়া মির্জাকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতাদের মন্তব্যে। পরিবেশবান্ধব দীপাবলি উদ্যাপনের আহ্বান জানিয়ে একটি প্রচারাভিযানে অংশ নিয়েছিলেন দিয়া। তবে বিজেপির আপত্তির মুখে সম্প্রতি সেই প্রচারণা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সরিয়ে নেয় বৃহন্মুম্বাই মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন (বিএমসি)।
এরপরই অভিনেত্রীকে হিন্দুত্ববিরোধী বলে আক্রমণ করেন মুম্বাইয়ের মেয়র ঋতু তাওড়ে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রচারণাটি নিয়ে আপত্তি জানান বিজেপির মুম্বাই শাখার প্রধান অমিত সাতাম। তার আপত্তির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিএমসির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে প্রচারণার পোস্টগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনার পর দিয়া মির্জাকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে।
তবে বিজেপি নেতাদের সমালোচনার মুখে পড়া বলিউড তারকাদের তালিকায় দিয়া মির্জাই প্রথম নন। বিভিন্ন সময়ে সরকারের নীতি, রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা সামাজিক ইস্যুতে প্রকাশ্যে মত দেওয়ায় একাধিক অভিনেতাকে বিজেপি নেতাদের আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আলোচনায় আসা এমন কয়েকজন তারকা হলেন:
নাসিরুদ্দিন শাহ
বিজেপি সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে বহুবার আলোচনায় এসেছেন অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ। ২০২৩ সালে তিনি অভিযোগ করেছিলেন, মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগাচ্ছে সরকার। চলতি বছরের জুলাইয়ে ককরোচ জনতা পার্টির ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচিতে পুলিশের পদক্ষেপেরও সমালোচনা করেন তিনি।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে নিজেকে ‘দিমাগি নকশাল’ বলে পরিচয় দেন এই অভিনেতা। তার এমন বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেন ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি নাসিরুদ্দিন শাহকে ‘বিপজ্জনক নগর দিমাগি নকশাল’ বলে মন্তব্য করেন। অভিনেতার বক্তব্যকে ভারতের গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর বলেও দাবি করেন তিনি।
প্রকাশ রাজ
দীর্ঘদিন ধরেই বিজেপির সমালোচক হিসেবে পরিচিত দক্ষিণী অভিনেতা প্রকাশ রাজ। ভারতের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধেও সরব হয়েছেন তিনি।
গত ৩১ অক্টোবর ম্যাঙ্গালুরুতে একটি প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে প্রকাশ রাজ বলেন, এসআইআরের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুধু ভোটাধিকার রক্ষার লড়াই নয়, বরং নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্বাধীন এবং আরএসএসের আদর্শে পরিচালিত বিজেপি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রচেষ্টাও।
এর আগে ৮ অক্টোবর বেঙ্গালুরুতে এসআইআরবিরোধী এক প্রতিবাদ কর্মসূচিতেও যোগ দেন তিনি। এ ছাড়া চারটি রাজ্যে ভোটার পরিচয়পত্র রাখার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া একটি মামলাও আলোচনায় আসে। ওই মামলায় আদালতের সমন এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগে জুনে বেঙ্গালুরুর একটি আদালত তার বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়ে বিজেপির তেলেঙ্গানা শাখার মুখপাত্র এনভি সুভাষ বলেন, প্রধানমন্ত্রী মোদির বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ ঠেকাতে পারে একমাত্র বিচারব্যবস্থা।
ইমরান খান
ভারতীয় অভিনেতা ইমরান খানও সম্প্রতি রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়েছেন। মার্কিন নাগরিক ইমরান ভারতের ওভারসিজ সিটিজেন অব ইন্ডিয়া (ওসিআই) কার্ডধারী। মুম্বাইয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ককরোচ জনতা পার্টির একটি প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পর তাকে ঘিরে আইনি জটিলতা তৈরি হয়।
সাবেক বিজেপি সাংসদ কিরিট সোমাইয়া অভিযোগ করেন, ওই কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে ইমরান তার ওসিআই ও ভিসার শর্ত ভঙ্গ করেছেন। এ কারণে তার গ্রেপ্তার ও দেশ থেকে বহিষ্কারের দাবিও জানান তিনি।
এরপর ১৪ অক্টোবর ভারতের ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিস (এফআরআরও) ইমরানকে ২৮ অক্টোবরের মধ্যে ভারত ছাড়ার নির্দেশ দিয়ে নোটিশ দেয়। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বোম্বে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন অভিনেতা। তার দাবি ছিল, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তার ওসিআই পরিচয়ের বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি।
আদালত প্রাথমিকভাবে ওই নির্দেশের কার্যকারিতা স্থগিত করে ২ নভেম্বর পর্যন্ত তাকে ভারতে থাকার অনুমতি দেন। ২ নভেম্বরের শুনানিতে আদালত জানান, ওসিআই কার্ডধারী হিসেবে ইমরানের প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার অধিকার নেই। পরে আদালতে নিঃশর্ত ক্ষমা চান অভিনেতা।
রাখি সাওয়ান্ত
২০২৬ সালের জুলাইয়ে বিজেপি সাংসদ ও অভিনেত্রী কঙ্গনা রানাউতের মন্তব্যের সমালোচনা করে আলোচনায় আসেন রাখি সাওয়ান্ত। নিট পরীক্ষায় অনিয়মের প্রতিবাদে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘তেলাপোকা’ এবং ‘জেনারেশন গাটার’ বলে মন্তব্য করেছিলেন কঙ্গনা। এর প্রতিবাদ জানান রাখি।
শিক্ষার্থীদের নিয়ে এমন মন্তব্যের জন্য কঙ্গনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন তিনি। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জুনে চণ্ডীগড় বিমানবন্দরে এক নারী সিআইএসএফ সদস্যের হাতে কঙ্গনার চড় খাওয়ার ঘটনাও স্মরণ করিয়ে দেন রাখি। ভবিষ্যতে এমন মন্তব্য অব্যাহত রাখলে জনরোষের মুখে পড়তে পারেন বলেও সতর্ক করেন তিনি।
এ ছাড়া প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লির রামলীলা ময়দানে ইন্ডিয়া জোটের সমাবেশের প্রতি সমর্থন জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও প্রকাশ করেন রাখি।
দীপিকা পাড়ুকোন
বিজেপি নেতাদের সমালোচনার মুখে একাধিকবার পড়েছেন অভিনেত্রী দীপিকা পাড়ুকোন। ২০১৮ সালে সঞ্জয় লীলা বানসালির ‘পদ্মাবত’ মুক্তির আগে ছবিটি ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। সে সময় হরিয়ানার বিজেপি নেতা সূরজ পাল আমু ছবির পরিচালক ও প্রধান অভিনেত্রী দীপিকার শিরশ্ছেদের জন্য ১০ কোটি রুপি পুরস্কার ঘোষণা করেছিলেন।
২০২০ সালের জানুয়ারিতে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) শিক্ষার্থীদের ওপর মুখোশধারীদের হামলার প্রতিবাদে ক্যাম্পাসে গিয়ে সংহতি জানান দীপিকা। এরপর বিজেপির দিল্লি শাখার মুখপাত্র তাজিন্দর পাল সিং বাগ্গা ও দক্ষিণ দিল্লির সাংসদ রমেশ বিধুরী তার সমালোচনা করেন। দীপিকার তৎকালীন মুক্তির অপেক্ষায় থাকা ছবি ‘ছাপাক’ বয়কটেরও ডাক দেন তারা। বিজেপি সাংসদ সাক্ষী মহারাজসহ দলের আরও কয়েকজন নেতা অভিনেত্রীকে ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’-এর সমর্থক বলেও আখ্যা দেন।
২০২৩ সালে মুক্তি পাওয়া শাহরুখ খানের ‘পাঠান’ ছবির ‘বেশরম রং’ গানে দীপিকার গেরুয়া রঙের পোশাক নিয়েও আপত্তি তোলেন বিজেপি নেতারা। তাদের অভিযোগ ছিল, পোশাকটি সনাতন সংস্কৃতির প্রতি অসম্মানজনক। মধ্যপ্রদেশের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নরোত্তম মিশ্র গানটির দৃশ্য পরিবর্তনের দাবি জানান।
দিয়া মির্জা
এবার পরিবেশবান্ধব দীপাবলি উদ্যাপনের প্রচারণায় অংশ নিয়ে বিজেপি নেতাদের সমালোচনার মুখে পড়েছেন দিয়া মির্জা। পরিবেশের ক্ষতি কমিয়ে উৎসব পালনের বার্তা দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বিজেপির আপত্তির পর বিএমসি প্রচারণাটি সরিয়ে নেয়। এরপর মুম্বাইয়ের মেয়র ঋতু তাওড়ে অভিনেত্রীকে হিন্দুত্ববিরোধী বলে আক্রমণ করেন।
পরিবেশ ও সামাজিক নানা বিষয়ে সরব থাকা দিয়া মির্জাকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই বিতর্ক আবারও সামনে এনেছে বলিউড তারকাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন। টেলিগ্রাফইন্ডিয়া












