২০২০ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশে যখন করোনাভাইরাস প্রথম শনাক্ত হলো, দেশের মানুষ তখনো বুঝতে পারেনি এর ভয়াবহতা। সেই সময় বাংলাদেশ সরকার দ্রুত কিছু কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়, যা ভাইরাসটি দ্রুত ছড়ানো প্রতিহত করে।
করোনাভাইরাস ২০১৯ সালে চীনে যখন প্রথম শনাক্ত হয়, তখন তারা জানতোই না এটা কত বড় প্যানডেমিকে পরিণত হচ্ছে, ২০২০ সালের শুরুতে এই ভাইরাস বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ায় ডব্লিউএইচও অ্যালার্ট জারি করে, কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে যায়। সারা বিশ্বে ভাইরাসটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
কম সম্পদ নিয়েও আমরা কোয়ারেন্টাইন আর আইসোলেশন সেন্টার চালু করে আগত প্রবাসীদের সংক্রমণ থেকে দেশবাসীর আক্রান্ত হওয়া কমিয়েছি। আক্রান্ত রোগীদের জন্য প্রথমেই বাংলাদেশ সরকার কিছু হাসপাতাল নির্দিষ্ট করে দেয়। সরকারের এই বিচক্ষণ সিদ্ধান্তের কারণে করোনা রোগীর পরিচর্যা ও ব্যবস্থাপনা ভালোভাবেই এগিয়ে যায়, যেখানে পশ্চিমা দেশগুলোকেও অধিক রোগী নিয়ে হিমশিম খেতে হয়েছিল।
হাসপাতালে ভর্তি হতে না পেরে বিশ্বের অনেক দেশে করোনা রোগী বাসায় মারা যায়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশে এই রকম ভয়াবহ বিপর্যয় তৈরি হয়নি, তাছাড়া বাংলাদেশ সরকার ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের টেলিমেডিসিন ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে মোবাইল ফোনের ম্যাধ্যমে ডাক্তারের পরামর্শ পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেছিল।
একই সাথে বাংলাদেশ সরকার দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় মেডিকেল যন্ত্রপাতি কেনা শুরু করেছিল যাতে অনেক রোগীকে সাপোর্ট দেওয়া যায়। এছাড়া করোনা শনাক্ত করার জন্য ঢাকাসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোয় ল্যাব স্থাপন করেছিল। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ তখন সন্দেহ পোষণ করেছিল যে, এটা দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোয় মোটেও কার্যকর করা যাবে না, কিন্তু বাংলাদেশ সরকার অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে সব জেলায় ল্যাব স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিল।
হাসপাতাল ও শনাক্তকারী ল্যাব পরিচালনার জন্য আলাদা টিম তৈরি করা হলো, ট্রেনিং দিয়ে দক্ষ জনবল তৈরি করা হলো। প্রতিটি প্রান্তিক ল্যাবে মলিকুলার এক্সপার্ট নিযুক্ত করে আবার তাদের কাজগুলো মনিটর করা হলো। এছাড়াও ডব্লিউ.এইচ.ও.-র মাধ্যমে আবার টেস্টের গুণগত মান নিশ্চিত করা হয়েছিল। আমাদের দেশে যে এত মলিকুলার এক্সপার্ট আছে তা এই প্রথম সবাই জানলো এবং তাদের কর্মদক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ মিললো। ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি হলো যে, আমাদের দেশেও সরকারিভাবে মলিকুলার পদ্ধতিতে রোগ শনাক্তকরণ সম্ভব।
সরকারি প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে, যা পরে আইসিডিডিআরবি এর সহযোগিতা পায়। এছাড়া পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা দলগুলো বিশেষ করে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে আসে তাদের সহযোগিতার জন্য।
বাংলাদেশ সরকার করোনা শনাক্তকারী কিটের আমদানি অনেক সহজ করে দেয়। সারা বিশ্বের লকডাউনের সময় এমনও হয়েছে যে চ্যাটার্ড প্লেনে ভাড়া করে কিট আনা হয়েছে। যার ফলে সারা বিশ্বে যেখানে করোনা শনাক্তকারী কিট-এর সংকট ছিল, সেই জায়গায় বাংলাদেশের টেস্ট করা একদিনও থেমে থাকেনি, ক্রমাগত সরবরাহ করা হয়েছিল করোনা শনাক্তকারী কিট।
তবে বাংলাদেশ সরকার সবচেয়ে বেশি বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে ভ্যাকসিন ক্রয়ের ক্ষেত্রে। সারাবিশ্ব অল্পকিছু ভ্যাকসিন আর প্রচুর রোগী নিয়ে যখন হিমশিম খাচ্ছিল, উন্নত দেশগুলো তখন ভ্যাকসিন নিয়ে মেতে ছিল রাজনীতিতে, আমাদের দেশে সেই সময়ে ভ্যাকসিন চলে এসেছে। জনগণের মাঝে বিনামূল্যে ভ্যাকসিন সরবরাহ পরিচালিত হয়েছে সুচারু ও নিরপেক্ষভাবে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে। ভ্যাকসিন না পাওয়া নিয়ে বাংলাদেশে মনে হয় একটি অভিযোগও নেই। বরং বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভ্যাকসিন নিশ্চিত করা হয়। সেই ভ্যাকসিন করোনারোগের সংক্রমণ ও ভয়াবহতা কমিয়ে এনেছে, মৃত্যু কমিয়েছে অনেকাংশে।
সারা বিশ্বে যেখানে প্রতি লাখে ৮৭ জন মানুষ মারা গিয়েছে, বাংলাদেশে সেই জায়গায় মারা গিয়েছে মাত্র ১৭ জন। অথচ যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি লাখে মানুষ মারা যায় ৩৩৩ জন, ইউরোপে মারা যায় ২৭৬ জন, জাপানে ৬০ জন। মৃত্যুহারের দিক দিয়ে বাংলাদেশ ১৭৪তম দেশ!
আমাদের প্রতিটি ল্যাবের করোনা টেস্টের গুণগত মান যেভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে ডব্লিউএইচও দ্বারা, সেই জায়গায় ভুল শনাক্তকরণ হওয়ার সম্ভাবনাও ছিল না বললেই চলে। ‘উন্নত বিশ্বের তুলনায় আমাদের কপাল ভালো এজন্যই আমাদের দেশে কম মানুষ মারা গিয়েছে’, এইরকম ভাবার কোনো কারণ নেই। এটা শেখ হাসিনার দূরদর্শীতা আর আমাদের সবার সম্মিলিত চেষ্টার ফলাফল, ডাক্তার ও নার্সদের প্রচেষ্টা ও আত্মত্যাগ এখানে উল্লেখ্য।
বাংলাদেশে তুলনামূলক মৃত্যুহার কম হওয়ার কারণ হলো, আমাদের দেশে মানুষের শরীরে রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা বেশি এবং শক্তিশালী। এইটাই যে মৃত্যুহার কম হওয়ার একমাত্র কারণ নয় তার স্বপক্ষে যুক্তি হলো পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের মৃত্যুহার ছিল লাখে কমপক্ষে ৩৭ জন।
অন্যান্য কারণের মধ্যে বাংলাদেশের মানুষের সহযোগিতা ও বাংলাদেশ সরকারের সময় উপযোগী সিদ্ধান্ত, জনগণের প্রতি সরকারের অঙ্গীকার, সঠিক জায়গায় সঠিক মানুষের প্রয়োগ, সিদ্ধান্তের পূর্বে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের সাথে আলোচনা, অব্যাবস্থাপনার বিরুদ্ধে কঠিন শাস্তি, সুযোগ সন্ধানীদের তাৎক্ষণিক অপসারণ, সময়মতো জনগণের জন্য সতর্কবার্তা প্রচার, ভুল তথ্য প্রচারকারীদের সতর্কীকরণ, ডব্লিউএইচও এর সহযোগিতা, বাংলাদেশ সরকারের গবেষণালব্ধ ফলাফলের ব্যবহার, করোনা সংক্রমণের সময় যাতায়াতের সীমাবদ্ধতা ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সহযোগিতা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
সর্বোপরি বাংলাদেশ সরকারের এইসব পদক্ষেপের কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনাকালীন সময়ে সারাবিশ্বে বহুল প্রশংসিত হয়েছেন। সার্বিক বিবেচনায় স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে মহামারি থামানোর জন্য শেখ হাসিনার ওপর আস্থা রাখা প্রয়োজন।
ডঃ হাসান মোঃ আল-ইমরান
মলিকুলার রোগতত্ত্ব বিষয়ে জার্মানি থেকে পিএইচডি ডিগ্রিপ্রাপ্ত
সহযোগী অধ্যাপক, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়







