সংবিধান: রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন, জনগনের অধিকার রক্ষার দলিল

বাংলাদেশের সংবিধান দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হওয়ার কথা। কিন্তু ৪ নভেম্বর অনেকটা নীরবেই কেটে গেল। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে উল্লেখযোগ্য কোনো আয়োজন ছিল না। অথচ একটি জাতিরাষ্ট্রের জন্ম, রাষ্ট্রের পরিচালনার দর্শন এবং নাগরিকের অধিকার ও স্বাধীনতার অঙ্গীকার যে সংবিধানে লিপিবদ্ধ, সেই সংবিধান দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্বের সঙ্গে উদ্যাপিত হতে পারত। হতে পারত আলোচনা, পর্যালোচনা ও জনসচেতনতামূলক নানা আয়োজন।
গত দুই-তিন বছরে সংবিধান দিবসের গুরুত্ব যেন আরও কমেছে। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। তবে ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সভাপতি ড. কামাল হোসেন জীবিত থাকায় তার প্রতিষ্ঠিত দল গণফোরামের উদ্যোগে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। ৫ নভেম্বর রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত ওই সভায় লিখিত বক্তব্য দেন প্রবীণ এই আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ।
সংবিধান নিয়ে ড. কামালের উদ্বেগ
১৯৭২ সালের সংবিধানের পক্ষে নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে ড. কামাল হোসেন বলেন, জনগণের প্রয়োজন ও সময়ের দাবি অনুযায়ী সংবিধান পরিবর্তন বা সংশোধন করা যেতে পারে। তবে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে প্রণীত ১৯৭২ সালের সংবিধানকে অবমূল্যায়ন করার কোনো সুযোগ নেই।
সংবিধান নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করে জাতিকে বিভক্ত করার অপচেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তার এই বক্তব্য নতুন নয়। গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সাবেক সভাপতি।
প্রশ্ন হচ্ছে, একজন সংবিধান প্রণেতাকে কেন বারবার একই উদ্বেগ প্রকাশ করতে হচ্ছে? কেন তিনি মনে করছেন, রাষ্ট্রের মৌলিক দলিলকে ঘিরে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা জাতীয় ঐক্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ৫ আগস্ট ২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বাস্তবতা পর্যালোচনা করা জরুরি। রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রম, জুলাই জাতীয় সনদ এবং সংবিধানের মৌলিক দর্শন পরিবর্তনের বিতর্ক—সবকিছুর মধ্যেই ড. কামালের বক্তব্যের প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে পাওয়া যায়।
সংবিধান রাষ্ট্রের আত্মপরিচয়ের দলিল
সংবিধান কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়মকানুনের সংকলন নয়। এটি একটি রাষ্ট্রের আত্মপরিচয়, রাজনৈতিক দর্শন এবং জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কের লিখিত অঙ্গীকার। একটি রাষ্ট্র তার ভূখণ্ড, মানচিত্র ও জাতীয় পতাকার মাধ্যমে পরিচিতি পেলেও সংবিধান ছাড়া তার রাষ্ট্রীয় কাঠামো পূর্ণতা পায় না।
সংবিধান রাষ্ট্রের ক্ষমতার উৎস নির্ধারণ করে, একই সঙ্গে সেই ক্ষমতার সীমারেখাও ঠিক করে দেয়। সরকার, সংসদ কিংবা রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানই সংবিধানের ঊর্ধ্বে নয়। বরং রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে সংবিধানের নির্ধারিত কাঠামোর মধ্যে থেকেই দায়িত্ব পালন করতে হয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা জর্জ ওয়াশিংটন সংবিধানকে রাষ্ট্র পরিচালনার অপরিহার্য নির্দেশিকা হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। একইভাবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর সংবিধান প্রণয়নের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শনকে একটি লিখিত ভিত্তি দেওয়া হয়।
১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হয়। ওই ঐতিহাসিক দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, এই সংবিধান শহীদদের রক্তে লিখিত এবং এটি সমগ্র জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে।
পরবর্তী সময়ে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে সংবিধান কার্যকর হয়।

চার মূলনীতিতে মুক্তিযুদ্ধের দর্শন
বাংলাদেশের মূল সংবিধানের চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ছিল জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। এই চার নীতির মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক চেতনা, সাম্যভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা এবং অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রভাবনার প্রতিফলন ঘটেছিল।
ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধিকার আন্দোলন এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ—দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশ ঘটেছিল, সংবিধানের মূলনীতিগুলো তারই প্রতিফলন।
তবে স্বাধীনতার পর পাঁচ দশকে বাংলাদেশের সংবিধানে একাধিকবার সংশোধনী এসেছে। কখনো রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রয়োজনে, কখনো আদর্শিক বিরোধে, আবার কখনো রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিবর্তনের অংশ হিসেবে সংবিধানের বিভিন্ন বিধানে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
এসব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সংবিধানের মূল চেতনা কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, সেই প্রশ্নও থেকে গেছে। নাগরিক অধিকার, গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অর্জন ও ব্যর্থতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
কখনো সংবিধানকে ক্ষমতায় টিকে থাকার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। কখনো রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের উপকরণ হিসেবেও এর প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

রাষ্ট্র সংস্কার ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশন
২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্র সংস্কারের বিভিন্ন উদ্যোগ সমন্বয়ের লক্ষ্যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠিত হয়। সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, পুলিশ ও প্রশাসনসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতের সংস্কার কমিশনগুলোর সুপারিশ পর্যালোচনা করে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ঐকমত্য তৈরি করাই ছিল এর অন্যতম দায়িত্ব।
কিন্তু কমিশনের কার্যক্রম পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সংবিধান সংস্কারের বিষয়টি আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। নির্বাচন ও বিচারব্যবস্থার কিছু বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে পুলিশ ও প্রশাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতের সংস্কার নিয়ে প্রত্যাশিত মাত্রায় অগ্রগতি হয়নি—এমন সমালোচনাও রয়েছে।
রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে আলোচনা অবশ্যই প্রয়োজন। সময়ের সঙ্গে রাষ্ট্রের কাঠামো, প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও সাংবিধানিক বিধানে পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। কিন্তু সংস্কারের নামে রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক দর্শনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা কিংবা মুছে ফেলার উদ্যোগ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এখানেই জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কিছু প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
চার মূলনীতি পরিবর্তনের বিতর্ক
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় ১৯৭২ সালের সংবিধানের চার মূলনীতি পরিবর্তনের বিষয়টি একাধিকবার সামনে আসে। জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতির মতো বিকল্প শব্দ ও ধারণা প্রস্তাব করা হয়।
প্রস্তাবগুলোর পক্ষে যুক্তি ছিল, রাষ্ট্রের বর্তমান বাস্তবতায় নতুনভাবে কিছু নীতি ও মূল্যবোধ সংজ্ঞায়িত করা প্রয়োজন। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, নতুন শব্দ যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত মূলনীতিগুলো বাদ দেওয়ার যৌক্তিকতা কোথায়?
বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো একটি ধর্মীয় বা রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর একক অর্জন নয়। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে।
সেই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে একটি অসাম্প্রদায়িক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল। সংবিধানের চার মূলনীতির সঙ্গে সেই ইতিহাসের সম্পর্ক অস্বীকার করা যায় না।
তাই মূলনীতির ভাষা ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা হতে পারে, কিন্তু সেগুলোর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট উপেক্ষা করে পরিবর্তনের উদ্যোগ জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে।
স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র বাদ দেওয়ার উদ্যোগ
সংবিধানের ১৫০ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সম্পর্কিত পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম তফসিল নিয়েও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় বিতর্ক তৈরি হয়।
এই তিনটি তফসিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল ধারণ করে।
পঞ্চম তফসিলে রয়েছে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ। এই ভাষণ বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রামকে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ষষ্ঠ তফসিলে রয়েছে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা। আর সপ্তম তফসিলে রয়েছে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার কর্তৃক জারি করা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র বা প্রোক্লেমেশন অব ইনডিপেনডেন্স।
বিশেষ করে সপ্তম তফসিলে থাকা ঘোষণাপত্র বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ভিত্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
জাতীয় জুলাই সনদে সংবিধানের ১৫০(২) অনুচ্ছেদ সংশোধন এবং সংশ্লিষ্ট তফসিলগুলো বাদ দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়।
গণফোরাম, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাসদ মার্কসবাদী ও বাংলাদেশ জাসদ এ বিষয়ে আপত্তি জানায়। দলগুলো জুলাই সনদে স্বাক্ষর না করার অবস্থানও ঘোষণা করে।
পরবর্তী সময়ে বাম দলগুলোর প্রতিবাদের মুখে সপ্তম তফসিলে থাকা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র বহাল রাখার সিদ্ধান্ত হয়। তবে পঞ্চম ও ষষ্ঠ তফসিল বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক থেকেই যায়।
প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগে স্বাধীনতার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিলগুলো বাদ দেওয়ার প্রস্তাব কেন সামনে আসবে? রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্মাণ করতে গিয়ে তার জন্মের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত দলিলগুলোর গুরুত্ব কীভাবে উপেক্ষিত হতে পারে?

জুলাই জাতীয় সনদে কী রয়েছে
২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আনুষ্ঠানিকভাবে জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করা হয়। এতে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত হয়। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক প্রস্তাব সংবিধান সংশোধনের সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যগুলো আইন, অধ্যাদেশ, বিধি ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নের বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
সনদে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠন, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের পদ্ধতিসহ বিভিন্ন সংস্কারের কথা বলা হয়।
এ ছাড়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের দায়িত্ব পালন করবে—এমন ব্যবস্থার কথাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান-সম্পর্কিত সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশের গেজেট প্রকাশিত হয়।
তবে সনদে স্বাক্ষর, গণভোট এবং এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য শেষ পর্যন্ত কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক বিভাজন
জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীসহ তাদের মিত্রদের পক্ষ থেকে সংসদ সদস্যের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির সংসদ সদস্যরা কেবল সংসদ সদস্য হিসেবেই শপথ নিয়েছেন।
সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে সংসদে সুপারিশ দেওয়ার জন্য সালাহউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে জামায়াতে ইসলামীর পাঁচজন সদস্যের নাম চাওয়া হলেও দলটি কমিটি গঠনের বিরোধিতা করে। বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে দলটির সদস্যরা ওয়াকআউট করেন।
অর্থাৎ রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে যে রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল, বাস্তবায়নের পর্যায়ে এসে সেই ঐকমত্যই নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
ঐকমত্যের নামে কতটুকু ঐকমত্য?
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রম ও জুলাই জাতীয় সনদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে।
প্রথমত, সংবিধানের মতো একটি সর্বজনীন রাষ্ট্রীয় দলিল পরিবর্তনের আলোচনায় অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব কতটা জনসমর্থনভিত্তিক ছিল, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। আলোচনায় অংশ নেওয়া ৩০টি রাজনৈতিক দলের প্রত্যেকটির জনভিত্তি ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা সমান নয়।
দ্বিতীয়ত, এমন অনেক দল আলোচনায় অংশ নিয়েছে, যাদের সাংগঠনিক কাঠামো ও জনসমর্থন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে যেসব দলকে অনেক সময় ‘ওয়ান ম্যান শো’ হিসেবে অভিহিত করা হয়, তাদের মতামতও এই প্রক্রিয়ায় বিবেচনায় এসেছে।
তৃতীয়ত, কয়েকটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে সমঝোতা হলেই সেটিকে সমগ্র জনগণের সাংবিধানিক সম্মতি হিসেবে বিবেচনা করা যায় কি না, সেই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক সমঝোতা এবং জনগণের সম্মতি এক বিষয় নয়।
চতুর্থত, সংবিধান সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার পাশাপাশি জনগণের অংশগ্রহণ, জনমত যাচাই এবং গণতান্ত্রিক বৈধতা নিশ্চিত করা জরুরি।
পঞ্চমত, সংস্কার বাস্তবায়নের সাংবিধানিক পদ্ধতি নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। প্রচলিত সংবিধানের বাইরে কোনো আদেশের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কারের নতুন কাঠামো তৈরি করা কতটা আইনসম্মত, সেই প্রশ্ন উপেক্ষা করা যায় না।
ষষ্ঠত, সংবিধান কোনো শাসকের ব্যক্তিগত ইচ্ছাপত্র নয়। এটি কোনো রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারও নয়। সরকার বা সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই সংবিধানের মৌলিক কাঠামো ইচ্ছামতো পরিবর্তন করার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় না। সংবিধান মূলত জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের একটি মৌলিক অঙ্গীকার।
সপ্তমত, রাষ্ট্রের বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রেখে সংস্কার বাস্তবায়নের বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এ প্রসঙ্গে বিএনপি নেতা ও বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, জাতীয় ঐকমত্যের প্রস্তাবগুলো রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল সংবিধানের ঊর্ধ্বে স্থান পেতে পারে না। এমন নজির তৈরি হলে ভবিষ্যতে তা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার জন্য সমস্যার কারণ হতে পারে।
তার এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সংস্কার বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে যে মৌলিক বিতর্ক রয়েছে, সেটি আরও স্পষ্ট হয়েছে।
নাগরিক অধিকারের সুরক্ষাকবচ সংবিধান
রাষ্ট্রের মালিক জনগণ। সরকার জনগণের পক্ষে রাষ্ট্র পরিচালনা করে। কিন্তু সরকার, সংসদ কিংবা রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানই জনগণের মৌলিক অধিকার ও সংবিধানের ঊর্ধ্বে নয়।
বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে নাগরিকের মৌলিক অধিকারগুলো স্বীকৃত হয়েছে। আইনের দৃষ্টিতে সমতা, জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, চলাফেরা, সংগঠন ও ধর্ম পালনের স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন অধিকার সেখানে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এসব অধিকার কেবল সংবিধানের পাতায় লিখে রাখার বিষয় নয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব হচ্ছে বাস্তবে এসব অধিকার নিশ্চিত করা।
সংবিধানের মূল দর্শন তখনই অর্থবহ হবে, যখন নাগরিকের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, কর্মসংস্থান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং বৈষম্যহীনতার নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠিত হবে।
৫ নভেম্বরের আলোচনায় ড. কামাল হোসেনও এসব বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অবসান, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, মাদকের বিস্তার রোধ এবং সন্ত্রাস দূর করে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।
একই সঙ্গে লাখ লাখ বেকার তরুণের কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন তিনি। তার সতর্কবার্তা, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা না গেলে দেশ মারাত্মক বিশৃঙ্খলার মুখে পড়তে পারে।
তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে সমতা, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্থিতিশীল শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান। রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গড়ার কাজেও এগিয়ে আসতে বলেন।
অতীতের ইতিহাস, ভবিষ্যতের রাষ্ট্র
ব্রিটিশ লেখক ও সাংবাদিক জর্জ অরওয়েলের একটি বিখ্যাত বক্তব্য রয়েছে—যারা বর্তমানকে নিয়ন্ত্রণ করে, তারা অতীতকেও নিয়ন্ত্রণ করে; আর যারা অতীতকে নিয়ন্ত্রণ করে, তারা ভবিষ্যৎকেও নিয়ন্ত্রণ করে।
বাংলাদেশের সংবিধান নিয়ে চলমান বিতর্কের প্রেক্ষাপটে এই বক্তব্যের তাৎপর্য রয়েছে।
রাষ্ট্র সংস্কার অবশ্যই প্রয়োজন। সংবিধানের দুর্বলতা, ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সীমাবদ্ধতা এবং নাগরিক অধিকার বাস্তবায়নের ঘাটতি দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। কিন্তু সেই সংস্কার হতে হবে জনগণের অংশগ্রহণ, জাতীয় ঐকমত্য এবং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার ভিত্তিতে।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)





