চীনের জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক লিউ জিয়ানচাওকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। লিউকে চীনের ভবিষ্যত পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। বিদেশি রাজনৈতিক দল ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক তত্ত্বাবধানকারী চীনা কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি।
সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রীট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, লিউ জুলাইয়ের শেষ দিকে বিদেশ সফর শেষে বেইজিং ফেরার পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। তার আটকের সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও শীর্ষ দুর্নীতি দমন কমিশন এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
চীনের পররাষ্ট্রনীতি সংস্থার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মতে, তার অনুপস্থিতি বেইজিংয়ে কূটনৈতিক দক্ষতা হ্রাস করতে পারে।
লিউ তার কর্মজীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন কূটনৈতিক পরিষেবায় এবং দুর্নীতি বিরোধী অভিযান পরিচালনাকারী দলীয় ও সরকারি সংস্থায়। ২০২৪ সালের শুরুতে ওয়াশিংটন ও নিউইয়র্ক সফরে গিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক নিয়ে ইতিবাচক বার্তা দেন এবং মার্কিন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ও সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রে তিনি প্রশংসিত হলেও, বেইজিংয়ে তার এই ভূমিকা রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর হিসেবে দেখা হয়েছিল।
ঘনিষ্ঠরা জানায়, লিউ একসময় গলফ খেলতে পছন্দ করতেন, তবে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আমলে কর্মকর্তাদের বিলাসী কর্মকাণ্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ার পর তা বন্ধ করেন। তার ছেলে একসময় যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক খাতে কর্মরত ছিলেন এবং বর্তমানে চীনে অবস্থান করছেন।
কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি, লিউ চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি কেন্দ্রীয় শৃঙ্খলা পরিদর্শন কমিশনে কাজ করেছেন এবং দলের অভ্যন্তরীণ তদারকির আওতায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রচেষ্টার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
লিউ তার বর্তমান পদে নিয়োগের পর থেকে ব্যাপক পরিমাণে বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। তিনি ২০টিরও বেশি দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছেন এবং ১৬০ টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করেছেন, যা তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনাকে আরও জোরদার করেছে।
তার প্রচারণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ২০২৪ সালের গোড়ার দিকে ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের সাথে অনুষ্ঠিত বৈঠক, যেখানে তার ভারসাম্যপূর্ণ এবং কূটনৈতিক শৈলির জন্য বিশেষ প্রশংসা অর্জন করেন।
এছাড়াও সেই ভ্রমণের সময়, মিঃ লিউ আমেরিকান থিঙ্ক ট্যাঙ্ক এশিয়া সোসাইটির পাশাপাশি ব্ল্যাকস্টোনের প্রধান নির্বাহী স্টিফেন শোয়ার্জম্যান এবং ব্রিজওয়াটার অ্যাসোসিয়েটসের প্রতিষ্ঠাতা রে ডালিওর মতো বিশিষ্ট বিনিয়োগকারীদের সাথে মতবিনিময় করেন।
২০২২ সালে দল তাকে আন্তর্জাতিক বিভাগের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করে এবং পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় কমিটির পূর্ণ সদস্যপদ প্রদান করে। তিনি তার পূর্বসূরীর চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে ভ্রমণ করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা গণতন্ত্রের দেশগুলো, যেখানে সাধারণত পূর্ববর্তী আন্তর্জাতিক বিভাগের প্রধানরা ভ্রমণ করতে পারেননি।
লিউ জিয়ানচাও ১৯৬৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে জিলিন প্রদেশের দেহুইতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বেইজিং ফরেন স্টাডিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিভাগে অধ্যয়ন সম্পন্ন করেন এবং পরে ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
লিউ কূটনৈতিক জীবনের শুরু করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুবাদ অফিসে। এরপর তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন, যার মধ্যে রয়েছে যুক্তরাজ্যের মিশনে প্রথম সচিব (১৯৯৫-১৯৯৮), পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিভাগে পরামর্শদাতা (১৯৯৮-২০০০) এবং একই বিভাগের উপ-মহাপরিচালক (২০০১-২০০৬)।
লিউ পরবর্তীতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং তার তীক্ষ্ণ যোগাযোগ শৈলির জন্য ব্যাপক স্বীকৃতি অর্জন করেন। এরপর তিনি ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়ায় রাষ্ট্রদূতের পদে অধিষ্ঠিত হন। ২০১৩ সালে তিনি সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন এবং ২০২২ সালে কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।








