প্রতি বছর ঈদ এলেই রেলের টিকিটের জন্য হাহাকার শুরু হয়। প্রযুক্তির উৎকর্ষে এখন টিকিট কাটার জন্য স্টেশনে রাত জাগতে হয় না ঠিকই, কিন্তু ভোগান্তি তাতে কমেনি। সকাল ৮টায় অনলাইন টিকিট বিক্রয় শুরু হওয়ার পাঁচ মিনিটের মাথায় দেখা যায় সিট নেই। প্রশ্ন জাগে, তবে কি ডিজিটাল পদ্ধতিতেও কালোবাজারি ঢুকে পড়েছে? ব্যক্তিগত একটি অভিজ্ঞতা সন্দেহের জালকে আরও ঘনীভূত করে।
সম্প্রতি আমার এক নিকটজন আমার এনআইডি ও মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে কক্সবাজারের টিকিট কাটেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমার ‘রেলসেবা’ অ্যাপে সেই ভ্রমণের কোনো ইতিহাস সংরক্ষিত হয়নি, এমনকি আমার ফোনে কোনো কনফার্মেশন মেসেজও আসেনি। অর্থাৎ, কেউ চাইলে আমার অগোচরেই আমার এনআইডি ব্যবহার করে টিকিট কেটে অন্য কেউ অনায়াসে ভ্রমণ করে ফেলতে পারে। প্রযুক্তি যদি সঠিক মানুষকে শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই প্রযুক্তির ফাঁকফোকর গলিয়েই কালোবাজারিরা তাদের সাম্রাজ্য বিস্তার করে।
২০২৩ সালে চীন ভ্রমণের সময় আমি তাদের রেল ব্যবস্থার একটি চমৎকার দিক প্রত্যক্ষ করি। উহান থেকে ট্রেনে করে সুজু যাওয়ার সুযোগ হয়েছিলো। আমার কোনো হার্ড কপি বা প্রিন্টেড টিকিট ছিল না। সেখানে রেলের টিকিট চেকার আমার টিকিট নয়, বরং আমার পাসপোর্ট দেখতে চাইলেন। স্টেশনে প্রবেশ থেকে শুরু করে প্রতিটি ধাপে পাসপোর্ট স্ক্যান করেই আমাকে এগোতে হয়েছে। চীন দেশের মানুষ স্ক্যান করেছেন তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র। সেখানে একজন নাগরিকের এনআইডি কার্ডের বিপরীতে একটির বেশি টিকিট ইস্যু করা হয় না। কেউ যদি নির্দিষ্ট সময়ে একটি শহরের টিকিট কাটে, তবে সিস্টেম তাকে ওই সময়ে অন্য কোনো ট্রেনের টিকিট কাটতে দেবে না। এভাবে কেবল এনআইডি কার্ডের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমেই চীন টিকিট কালোবাজারি চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছে।
আমাদের দেশেও বর্তমানে সবার হাতে স্মার্ট এনআইডি কার্ড রয়েছে। কিন্তু এর বহুমুখী ব্যবহার নিয়ে আমরা এখনো উদাসীন। একজন নাগরিককে এখন মানিব্যাগে এনআইডি, ড্রাইভিং লাইসেন্স, মোটর সাইকেলের রেজিস্ট্রেশন কার্ডসহ অসংখ্য স্মার্টকার্ড বহন করতে হয়। অথচ একটি মাত্র স্মার্ট এনআইডি কার্ডেই যদি একজন নাগরিকের ড্রাইভিং লাইসেন্স, পেশা, শিক্ষা এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষিত থাকতো, তবে কার্ডের বোঝা যেমন কমতো, তেমনি দুর্নীতি ও জালিয়াতি রোধ করা সহজ হতো।
বর্তমান সরকার কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড বা ক্যাপ্টেন কার্ডের মতো আলাদা আলাদা উদ্যোগ নিচ্ছে। প্রশ্ন হলো, আমাদের স্মার্ট এনআইডি কার্ডটিই কি সব সেবার মূলকেন্দ্র হতে পারে না? ট্রেনের টিকিটের ক্ষেত্রে যদি এনআইডি তথ্যের শতভাগ ঠিক-ঠাক ইন্টিগ্রেশন করা যায় এবং ভ্রমনের সময় এনআইডি বা পাসপোর্ট স্ক্যান বাধ্যতামূলক করা হয়, তবে কালোবাজারির কোনো সুযোগ থাকবে না।
সামনে ঈদুল আজহা। প্রতিবার ঈদের সময়ে টিকিট নিয়ে যে অস্থিরতা তৈরি হয়, তা দূর করতে সরকারের ‘সদিচ্ছা’ই যথেষ্ট। চীনের মতো কঠোর এনআইডি-নির্ভর টিকিট ব্যবস্থা চালু করলে কোনো অসাধু চক্র টিকিট মজুদ করতে পারবে না। একজন নাগরিকের পরিচয়পত্রটিই হতে পারে তার সকল নাগরিক সুযোগ-সুবিধার চাবিকাঠি।








