আন্তর্জাতিক

পরিত্যক্ত কূপে প্রাণ যাচ্ছে শিশুদের, ৫ বছরের জয়নুল্লাহ যেভাবে জীবিত উদ্ধার

পরিত্যক্ত কূপে প্রাণ যাচ্ছে শিশুদের, ৫ বছরের জয়নুল্লাহ যেভাবে জীবিত উদ্ধার

ছবি: সংগৃহীত

আফগানিস্তানে পরিত্যক্ত গভীর কূপ ও নলকূপে পড়ে একের পর এক শিশুর মৃত্যু হচ্ছিল। পানি খুঁজতে দেশজুড়ে খনন করা এসব গভীর ও সরু কূপের অনেকগুলো পানি শুকিয়ে যাওয়ার পর আর নিরাপদভাবে বন্ধ করা হয়নি। ফলে কৃষিজমি পরিণত হয়েছে প্রাণঘাতী ফাঁদে।

সংবাদমাধ্যম বিবিসি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।

সম্প্রতি এমনই একটি কূপে পড়ে ৩৭ ঘণ্টা আটকে থাকার পর পাঁচ বছরের জয়নুল্লাহকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। দক্ষিণ আফগানিস্তানের কান্দাহার প্রদেশের মাইওয়ান্দে ঘটে এ ঘটনা।

জয়নুল্লাহ বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে একটি সরু, শুকিয়ে যাওয়া কূপে পড়ে যায়। কূপটির গভীরতা ছিল প্রায় ৭০ মিটার বা ২৩০ ফুট। নিচে আটকে থাকা শিশুটির পায়ে পানি ছিল এবং মাথার ওপর দিয়ে পানি পড়ছিল। ভয় ও ঠান্ডায় কাঁপছিল সে।

উদ্ধারকারীরা কূপের ভেতরে ক্যামেরা নামিয়ে ওপর থেকে জয়নুল্লাহকে দেখতে পান। কিন্তু কূপটির ব্যাস ছিল মাত্র ৩০ সেন্টিমিটার। ফলে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পক্ষে সেখানে নেমে শিশুটিকে উদ্ধার করা সম্ভব ছিল না।

প্রথমে তিনজন শিশুকে নিচে নামানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু কূপটি এতটাই সরু ছিল যে শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়ায় তারা ফিরে আসতে বাধ্য হয়।

এরপর উদ্ধারকারীরা ১১ বছরের হাজরত ওমরের সাহায্য নেন। এর আগে অন্য একটি উদ্ধার অভিযানে কূপের ভেতরে নেমেছিল সে।

চাচার অনুমতি নিয়ে হাজরত ঝুঁকি নিয়েই কূপে নামতে রাজি হয়। প্রথমবার নামার সময় তার কাঁধ ও উরু আটকে যায়। ব্যথা পাওয়ার কথা জানালে তাকে ওপরে তুলে আনা হয়।

দ্বিতীয়বার সে কূপের তলায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়। সেখানে গিয়ে প্রথমবারের মতো জয়নুল্লাহকে দেখতে পায় হাজরত। পরে সে জয়নুল্লাহর হাত আরেকটি দড়ির সঙ্গে বেঁধে দেয়।

ওপরে থাকা লোকজন ধীরে ধীরে দড়ি টানতে শুরু করেন। মাইকে সবাইকে নীরব থাকতে বলা হয়। একপর্যায়ে কাদা মাখা অবস্থায় হাজরতকে কূপ থেকে বের করে আনা হয়। এরপর উদ্ধার করা হয় জয়নুল্লাহকে।

জয়নুল্লাহকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরদিনই তাকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

জয়নুল্লাহর বাবা বলেন, হাজরত যেন তার ছেলেকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছে। তিনি জানান, উদ্ধারকারী দল সময়মতো পৌঁছাতে না পারলে গ্রামবাসী হয়তো হুক ব্যবহার করে শিশুটিকে টেনে তুলত। এতে সে গুরুতর আহত হতে পারত বা মারা যেতে পারত।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে আফগানিস্তানে পরিত্যক্ত নলকূপে পড়ে যাওয়ার শতাধিক ঘটনার তথ্য তারা নিশ্চিত করেছে। বেশিরভাগ ঘটনাই দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে ঘটেছে। এসব ঘটনায় অধিকাংশ ভুক্তভোগী ১০ বছরের কম বয়সী শিশু এবং প্রায় অর্ধেকের মৃত্যু হয়েছে।

পানি সংকট ও দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে আফগানিস্তানে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর কৃষকদের নির্ভরতা বেড়েছে। সস্তা সৌর প্যানেলের সহজলভ্যতায় গভীর নলকূপ থেকে দীর্ঘ সময় ধরে পানি তোলার সুযোগও তৈরি হয়েছে।

পানি বিশেষজ্ঞ নাজিবুল্লাহ সাদিদের মতে, ২০২০ সালের পর দেশটিতে কূপের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণে বর্তমানে প্রায় পাঁচ লাখ কূপ থাকার ধারণা পাওয়া যায়। এসবের বেশিরভাগই হেলমান্দ নদীর অববাহিকায়, বিশেষ করে হেলমান্দ, কান্দাহার, ফারাহ ও গজনি প্রদেশে।

তবে দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকাজ চালানোর মতো প্রশিক্ষিত মানুষের সংখ্যা খুবই কম। বর্তমানে মাত্র পাঁচজনের মতো প্রশিক্ষিত ব্যক্তি স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে এ ধরনের উদ্ধারকাজে যুক্ত রয়েছেন।

দক্ষিণাঞ্চলীয় হেলমান্দ প্রদেশের ২৮ বছর বয়সী মোবাইল ফোন বিক্রেতা মিরাজান আবদুল্লাহ এমন দুর্ঘটনার পর নিজেই উদ্ধারযন্ত্র তৈরির উদ্যোগ নেন।

২০২১ সালে তার গ্রামে পাঁচ বছরের একটি শিশু কূপে পড়ে মারা যাওয়ার পর বিষয়টি তাকে ভাবিয়ে তোলে। এরপর আরেক শিশুর কূপে পড়ে যাওয়ার ঘটনা শুনে তিনি এমন একটি যন্ত্র তৈরি করেন, যার সঙ্গে ক্যামেরা যুক্ত থাকে। এতে ওপরে থাকা উদ্ধারকারীরা কূপের ভেতরের ব্যক্তিকে দেখতে পারেন এবং নির্দিষ্ট জায়গায় দড়ি নামিয়ে দিতে পারেন।

যন্ত্রটি পরীক্ষা করতে নিজের পাঁচ বছরের ছেলেকেও ২৫ মিটার গভীর একটি কূপে নামিয়েছিলেন মিরাজান। পরীক্ষাটি সফল হয়।

গত চার বছরে তিনি ১১৩টি উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছেন এবং প্রায় ৭০ জনকে জীবিত উদ্ধার করেছেন।

তবে তার অভিজ্ঞতায় সব অভিযান সফল হয়নি। কূপের পানিতে ডুবে অনেকের মৃত্যু হয়েছে। আবার প্রশিক্ষণ ছাড়া স্থানীয়রা উদ্ধার করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়েছেন। মিরাজানের ভাষায়, একটি ছোট ভুলও কূপে আটকে থাকা ব্যক্তির জীবনকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে কৃষকরা ক্রমেই আরও গভীর কূপ খনন করছেন। আগে যেখানে প্রায় ৮০ মিটার গভীর কূপ ছিল, এখন কোথাও কোথাও তা ২০০ মিটার পর্যন্ত গভীর।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আফগানিস্তানের কৃষি ভূগর্ভস্থ পানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু ভূগর্ভস্থ পানির মজুত সীমিত। অতিরিক্ত পানি উত্তোলন চলতে থাকলে ভবিষ্যতে কিছু এলাকা জনশূন্য হয়ে পড়তে পারে এবং মানুষকে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হতে পারে।

পানি শুকিয়ে গেলে পুরোনো কূপগুলো অনেক সময় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। নতুন কূপ খনন করা হলেও পুরোনোগুলো নিরাপদভাবে বন্ধ করার সামর্থ্য অনেক কৃষকের নেই।

তালেবান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কূপ থেকে উদ্ধারকাজ জোরদার করতে বিশেষ সরঞ্জাম সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। পান করার প্রয়োজন ছাড়া সরকারি অনুমতি ছাড়া ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে দেশটির পানি ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়।

এর আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কূপের মালিকদের সেগুলো যথাযথভাবে ঢেকে রাখার নির্দেশ দিয়েছিল। নির্দেশ না মানলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়।

জয়নুল্লাহকে উদ্ধারের কয়েক মাস পর হাজরতের সঙ্গে আবার দেখা হয়। তখন জয়নুল্লাহর পরিবার তাকে ধন্যবাদ জানায় এবং উপহার দেয়। স্থানীয়দের কাছে হাজরত এখন একজন নায়ক।

হাজরত বলেন, গ্রামের শিশুরা তাকে দেখলে তার সাহসী কাজের কথা বলে।

বিষয়:৫ বছরের জয়নুল্লাহ আফগানিস্তান জীবিত উদ্ধার পরিত্যক্ত কূপ

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…