২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে নতুন সরকারের জন্য অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নের প্রথম বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
শুক্রবার ১২ জুন রাজধানীর লেকশোর হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: সিপিডির পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এ মূল্যায়ন তুলে ধরেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। এ সময় সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহকারী তামিম আহমেদসহ সংস্থাটির অন্য কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, এটি বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেট, যা এমন এক সময়ে উপস্থাপিত হয়েছে যখন দেশের অর্থনীতি একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মন্থর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের সংকট, রাজস্ব ঘাটতি এবং দুর্বল ব্যাংকিং খাত অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি জ্বালানি খাতের সংকটও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে।
তার মতে, এই প্রেক্ষাপটে বাজেটকে একটি মানবিক, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গঠনের গুরুত্বপূর্ণ নীতিপত্র হিসেবে দেখা যেতে পারে।
সিপিডির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রস্তাবিত বাজেটের মূল দর্শন হলো মানবসম্পদ উন্নয়ন, বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করা। অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তা বিকাশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং জনকল্যাণমূলক খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
সংস্থাটি মনে করে, বাজেটের বিভিন্ন লক্ষ্য ও নীতিগত দিক বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে বেশ কিছু ক্ষেত্রে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশেষ করে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বেসরকারি বিনিয়োগে উৎসাহ, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ এবং সামাজিক খাতের উন্নয়নের বিষয়ে মিল রয়েছে।
তবে সিপিডির মতে, বাজেটের সাফল্য তার আকারের ওপর নয়, বরং বাস্তবায়নের দক্ষতার ওপর নির্ভর করবে। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলেও দুর্বল বাস্তবায়নের কারণে প্রত্যাশিত ফল অর্জন সম্ভব হয়নি।
প্রতিষ্ঠানটি বলছে, বাজেটের লক্ষ্য বাস্তবায়নে শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা জরুরি। এমন প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা প্রয়োজন, যা কার্যকরভাবে বাজেট বাস্তবায়ন করে জনগণের কাছে দৃশ্যমান সুফল পৌঁছে দিতে পারে।
সিপিডির ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই বাজেট সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা প্রদর্শনের এটিই সরকারের প্রথম বড় সুযোগ। কাঠামোগত সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ দিতে পারলে দেশের অর্থনীতি আরও টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অ্যাধাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এই সরকার বড় জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র নির্মাণের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, সেটার প্রেক্ষিতে আমরা যদি বাজেট পর্যালোচনা করি তাহলে দেখা যায় বিভিন্ন শিল্প খাতে শুল্ক কমিয়ে সরকার একটি প্রবৃদ্ধির পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন।
তিনি বলেন, এই বাজেট বাস্তবায়ে প্রথম ঝুঁকি হচ্ছে পদক্ষেপগুলোর ভিত্তি দুর্বল। যখন এই বাজেট বাস্তবায়ন করা হবে তখন দেখা যাবে চলতি বছরের চলমান বাজেটের চতুর্থ কোয়াটারের ওপর চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। আমাদের প্রবৃদ্ধির মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যাবে, প্রাইভেট সেক্টরের ক্রেডিট গ্রথ রেট বেড়ে যাবে, সম্পদ আহরণ বেড়ে যাবে। তাই আমি মনে করে এই পূর্ব গণনাগুলো আরও বাস্তবসমত করলে বাজেটে শৃঙ্খলা বজায় থাকতো।
উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।
এই ঘাটতি মেটাতে সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে দেশের জিডিপির আকার ৬৮ লাখ ৩০ হাজার ২৪ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।







