নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্দোলন এবং অবশেষে জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার এই পরিবর্তন এসেছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের শপথ শুধু একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয় বরং এটি একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতীক। এই পরিবর্তনের পেছনে ছিল মানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, প্রত্যাশা এবং একটি নতুন শুরুর আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু ইতিহাস বলে, পরিবর্তন অর্জনের চেয়ে তা ধরে রাখা অনেক বেশি কঠিন।
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এই আন্দোলন শুধু একটি সরকারের পতনের কারণ নয়, এটি রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পর্কের একটি পুনঃসংজ্ঞায়ন। তরুণ প্রজন্ম, মধ্যবিত্ত এবং বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ এতে অংশ নিয়েছিল। তাদের মূল দাবি ছিল জবাবদিহি, সুশাসন এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। এখন সেই প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নতুন সরকার। ফলে এই সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু প্রশাসন চালানো নয় বরং সেই আন্দোলনের চেতনার প্রতি দায়বদ্ধ থাকা এবং অতীতের বিভিন্ন সরকারের ভুলত্রুটির পুনরাবৃত্তি না করা।
বড় বাস্তবতা অর্থনৈতিক চাপ
বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা অর্থনৈতিক চাপ। মূল্যস্ফীতি মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। কয়েক বছর আগেও একটি নির্দিষ্ট আয়ে যে পরিবার স্বচ্ছন্দে চলতে পারত, এখন তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে সতর্ক, কারণ তারা নীতিগত স্থিতিশীলতা নিয়ে নিশ্চিত নন। বৈদেশিক মুদ্রার চাপ আমদানি ব্যয় বাড়াচ্ছে, যা আবার বাজারে পণ্যের দামে প্রভাব ফেলছে।
এখানে সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনা। বাজার মনিটরিং শক্তিশালী করা, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নিলে অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরবে না। এছাড়া বিগত দেড়যুগ ধরে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতেও নেওয়া দরকার দৃশ্যমান পদক্ষেপ।
সরকার চাইলে খুব দ্রুত কিছু দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে পারে। বাজার মনিটরিং জোরদার করা, কৃষিপণ্য সরাসরি বাজারে আনার ব্যবস্থা করা এবং ডলারের বিনিময় হার বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য করা, এই পদক্ষেপগুলো মানুষের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা দেবে। অর্থনীতির একটি বড় অংশ মনস্তাত্ত্বিক। মানুষ যখন দেখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে, তখন আস্থা নিজে থেকেই তৈরি হয়।
বৈশ্বিক বিভিন্ন পরিস্থিতি থেকেও শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের সময় যুক্তরাষ্ট্র কঠোর ব্যাংকিং সংস্কার এবং নজরদারির মাধ্যমে তাদের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করেছিল। আইসল্যান্ড তার পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থা পুনর্গঠন করে নতুন করে শুরু করেছিল। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ১৯৯৭ সালের অর্থনৈতিক সংকটের পর তারা ব্যাংকিং খাত সংস্কার এবং শিল্প পুনর্গঠনের মাধ্যমে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায়। এই উদাহরণগুলো দেখায়, সংকট থেকে বের হতে হলে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
বড় পরীক্ষা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও নতুন সরকারের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় সাধারণত আইনশৃঙ্খলার একটি শূন্যতা তৈরি হয়। এই সময় অপরাধ বৃদ্ধি, রাজনৈতিক প্রতিশোধ এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। সরকার যদি দ্রুত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারে, তাহলে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পুলিশ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে পেশাদার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা এখন অত্যন্ত জরুরি।
পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীকে জনগণের নিরাপত্তায় সঠিকভাবে নিয়োজিত করা এবং জনমনে বিশ্বাস বাড়ানোর দিকে কাজ করতে হবে কার্যকরভাবে।
শক্তিশালী বিরোধী দল
রাজনৈতিক দিক থেকেও নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তি এখন একটি শক্তিশালী বিরোধী অবস্থানে রয়েছে। জুলাই আন্দোলনের পর রাজনৈতিক বাস্তবতা অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। বিরোধী দলগুলো এখন শুধু নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, তারা সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। সংসদের ভেতরে এবং বাইরে একটি শক্তিশালী বিরোধী রাজনীতি সরকারের জন্য যেমন চাপ তৈরি করবে, তেমনি এটি গণতন্ত্রের জন্য একটি পরীক্ষাও হবে।
বিএনপি সরকার যদি বিরোধী মতকে দমন করার পথ বেছে নেয়, তাহলে রাজনৈতিক অস্থিরতা আবার ফিরে আসতে পারে। এছাড়া সামাজিক মাধ্যমে নানা চাপ-ন্যারেটিভ সামাল দেওয়ার নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ হবে। নির্বাচনের আগে দল হিসেবে বিএনপি যেভাবে সামাজিক মাধ্যম ও বাস্তবের প্রতিকূলতা সামাল দিয়েছে, সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে পদক্ষেপ নিতে পারে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভারসাম্য
নতুন সরকারের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ভারত ও চীনের মধ্যে একটি কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে। ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী এবং নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একটি বড় অংশীদার, যদিও ৫ আগস্টের পরে এবং শেখ হাসিনা পালিয়ে দিল্লীতে অবস্থান নেওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ-ভারত সর্ম্পক ইতিহাসের সবচেয়ে তলানিতে অবস্থান করছে। অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নের অন্যতম প্রধান অংশীদার।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং বাণিজ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বাংলাদেশের ওপর প্রভাব ফেলে। নতুন সরকারকে এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে হবে, যেখানে কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরি না হয়। ভিয়েতনাম এই ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তারা যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের সঙ্গে একসঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ নিশ্চিত করেছে।
শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাও বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা। অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা এবং অতিরিক্ত বৈদেশিক ঋণের কারণে তাদের সরকার পতন হয়েছিল। জনগণের ক্ষোভ শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণ হয়েছিল। বাংলাদেশকে সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
দরকার কর্মমুখী পদক্ষেপ
বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কর্মসংস্থান। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করছে। তাদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে সামাজিক অস্থিরতা বাড়তে পারে। কারিগরী শিক্ষা, আইটি ক্ষেত্রে সুযোগ, গ্রামীণকৃষিসহ নানাখাতে তরুণ-যুবাদের সম্পৃক্ত করে এগিয়ে যেতে পারে নতুন সরকার। দক্ষিণ কোরিয়া এবং মালয়েশিয়া শিল্পায়ন এবং রপ্তানিমুখী নীতির মাধ্যমে তারা কীভাবে সমস্যার সমাধান করেছিল, সেগুলো অনুসরণ করা যেতে পারে।
সবশেষে, নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানুষের আস্থা অর্জন করা। জুলাই অভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে, মানুষ যখন মনে করে তাদের প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না, তখন তারা পরিবর্তন আনতে সক্ষম। ফলে এই সরকার যদি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সুশাসনসহ সার্বিক আইনের শাসন নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে তারা শুধু একটি সফল সরকার নয়, বরং একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করতে পারবে। ক্ষমতায় আসার আগে বিএনপি চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তৃতা থেকে আইনের শাসনের যে আশ্বাস এসেছে, এখন তা বাস্তবায়নের সময়। হয়তো রাতারাতি কোনো কিছু পাল্টে যাবে না, তারপরেও বাস্তবায়নযোগ্য মাইলফলক স্থাপন খুবই জরুরি।
যদি নতুন সরকার ব্যর্থ হয়, তাহলে জনগণের হতাশা আরও গভীর হবে।
বাংলাদেশ এখন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই মুহূর্তে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো শুধু একটি সরকারের ভবিষ্যৎ নয়, পুরো দেশের আগামী পথ নির্ধারণ করবে। জনগণ এখন প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চায়। নতুন সরকারের সাফল্য নির্ভর করবে তারা কত দ্রুত এবং কত আন্তরিকভাবে সেই পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে তার ওপর।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








