বিনোদন

দিদা মহানায়িকা, মা-ও তারকা: নিজের আলোয় রাইমা সেন

রাইমা সেনের জন্মদিন আজ

দিদা মহানায়িকা, মা-ও তারকা: নিজের আলোয় রাইমা সেন

বাংলা চলচ্চিত্রের এক কিংবদন্তির জন্ম বাংলাদেশের পাবনায়। তার অভিনয়, ব্যক্তিত্ব আর পর্দায় উপস্থিতি একসময় মুগ্ধ করেছিল দুই বাংলার দর্শককে। তিনি মহানায়িকা সুচিত্রা সেন। তার মেয়ে মুনমুন সেনও বেছে নিয়েছিলেন অভিনয়ের জগৎ। আর সেই পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের প্রতিনিধি রাইমা সেন নিজের অভিনয় দিয়ে তৈরি করেছেন স্বতন্ত্র পরিচয়।

তিন প্রজন্ম, তিনটি ভিন্ন সময়, তিন ধরনের চলচ্চিত্রযাত্রা। কিন্তু পারিবারিক সূত্রে তাদের যোগ এক জায়গায়: সিনেমা।

৭ নভেম্বর, অভিনেত্রী রাইমা সেনের ৪৭তম জন্মদিন। ১৯৭৯ সালের এই দিনে জন্ম নেওয়া রাইমা বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রে কাজ করতে করতে পার করেছেন প্রায় তিন দশক। বিখ্যাত পরিবারের উত্তরাধিকার নিয়ে চলচ্চিত্রে এলেও কেবল সুচিত্রা সেনের নাতনি কিংবা মুনমুন সেনের মেয়ে পরিচয়ে আটকে থাকেননি তিনি। ঋতুপর্ণ ঘোষের চলচ্চিত্র থেকে সমকালীন থ্রিলার, স্বাধীনধারার সিনেমা থেকে ওয়েব সিরিজ; বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে গড়ে তুলেছেন নিজের জায়গা।

রাইমার জন্মদিন তাই শুধু একজন অভিনেত্রীর ব্যক্তিগত উদযাপন নয়, বাংলা চলচ্চিত্রের এক অভিনয়-পরিবারের তিন প্রজন্মকে ফিরে দেখারও উপলক্ষ।

পাবনার মেয়ে সুচিত্রা, বাংলা সিনেমার মহানায়িকা

১৯৩১ সালের ৬ এপ্রিল তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পাবনা অঞ্চলে জন্ম সুচিত্রা সেনের। তার প্রকৃত নাম রমা দাশগুপ্ত। শৈশব ও বেড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটেছে পাবনায়। পরে তার জীবন ও অভিনয়জগৎ গড়ে ওঠে কলকাতায়।

পঞ্চাশের দশকে বাংলা চলচ্চিত্রে যখন নতুন ধরনের রোমান্টিক গল্প জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, তখন পর্দায় আবির্ভাব ঘটে সুচিত্রা সেনের।

১৯৫৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘সাত নম্বর কয়েদী’ তার প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র। একই বছর ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবিতে উত্তম কুমারের সঙ্গে অভিনয় করেন তিনি। এরপর শুরু হয় বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম স্মরণীয় জুটির পথচলা।

‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘হারানো সুর’, ‘সাগরিকা’, ‘সপ্তপদী’, ‘বিপাশা’; একের পর এক চলচ্চিত্রে উত্তম-সুচিত্রা জুটি দর্শকদের কাছে হয়ে ওঠে প্রেম ও রোমান্টিক অভিনয়ের এক বিশেষ প্রতীক।

তবে সুচিত্রার সাফল্য শুধু উত্তম কুমারের সঙ্গে জুটি বাঁধার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ‘দীপ জ্বেলে যাই’, ‘উত্তর ফাল্গুনী’ এবং ‘সাত পাকে বাঁধা’ চলচ্চিত্রে তার অভিনয় একজন শিল্পী হিসেবে স্বতন্ত্র সক্ষমতার পরিচয় দেয়।

১৯৬৩ সালে ‘সাত পাকে বাঁধা’ চলচ্চিত্রের জন্য মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেত্রীর সম্মান অর্জন করেন তিনি। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অভিনয়ের জন্য পুরস্কার পাওয়া প্রথম ভারতীয় অভিনেত্রী হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেন সুচিত্রা।

হিন্দি চলচ্চিত্রেও ছিল তার উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি। ‘দেবদাস’, ‘মমতা’ এবং গুলজারের ‘আঁধি’ তাঁর অভিনয়জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

সত্তরের দশকের শেষ দিকে চলচ্চিত্র থেকে সরে যান সুচিত্রা। এরপর দীর্ঘদিন লোকচক্ষুর আড়ালে জীবন কাটান। ২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি কলকাতায় তার মৃত্যু হয়। কিন্তু পর্দা থেকে বিদায় নিলেও বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সুচিত্রার উপস্থিতি আজও অমলিন।

মা সুচিত্রা সেনের সাথে মুনমুন সেন

মুনমুন সেন: মহানায়িকার মেয়ে, নিজের মতো এক তারকা

সুচিত্রা সেনের একমাত্র কন্যা মুনমুন সেন। মায়ের পরিচিতি ও খ্যাতির কারণে চলচ্চিত্রজগতে তার আগমন স্বাভাবিকভাবেই দর্শক ও গণমাধ্যমের আগ্রহ তৈরি করেছিল।

তবে মুনমুনের অভিনয়জীবন গড়ে ওঠে অন্য এক সময়ে। বাংলা ও ভারতীয় বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে তখন গল্প, নির্মাণশৈলী, তারকাদের উপস্থাপনা এবং দর্শকের রুচিতে পরিবর্তন আসছে।

আশির দশকের গোড়ায় বাংলা চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেন মুনমুন। ‘রাজবধূ’, ‘রাজেশ্বরী’, ‘বৈদূর্য রহস্য’সহ বিভিন্ন ছবিতে অভিনয় করেন তিনি।

১৯৮৪ সালে ‘আন্দর বাহার’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে হিন্দি সিনেমাতেও পরিচিতি পান। শুধু বাংলা কিংবা হিন্দি নয়, ভারতের আরও কয়েকটি ভাষার চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন মুনমুন।

সুচিত্রার অভিনয়কে যেখানে প্রধানত রোমান্টিক ও আবেগনির্ভর বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, সেখানে মুনমুনের চলচ্চিত্রজীবনে ছিল বাণিজ্যিক সিনেমার বৈচিত্র্য ও ভিন্ন ধরনের পর্দা-উপস্থাপনা।

মায়ের মতো অত বড় প্রতীকে পরিণত না হলেও নিজের সময়ের চলচ্চিত্র ও জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে একটি পরিচিত নাম হয়ে ওঠেন তিনি।

পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতেও সক্রিয় হন মুনমুন সেন। ২০১৪ সালে পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া আসন থেকে লোকসভা সদস্য নির্বাচিত হন।

সুচিত্রার পরিবারে অভিনয়ের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে মুনমুনের দুই মেয়ে রাইমা ও রিয়া সেনের মধ্য দিয়ে।

দুই মেয়ে রাইমা ও রায়নার সাথে মুনমুন সেন

রাইমা সেন: বিখ্যাত পরিবারের বাইরে নিজের পরিচয়

১৯৭৯ সালের ৭ নভেম্বর মুম্বাইয়ে জন্ম রাইমা সেনের। তার পূর্ণ নাম রাইমা দেববর্মা। বাবা ভরত দেববর্মা ত্রিপুরার রাজপরিবারের বংশধর।

ছোটবেলা থেকেই চলচ্চিত্রের পরিবেশের সঙ্গে পরিচয় ছিল রাইমার। একদিকে মহানায়িকা দিদা, অন্যদিকে অভিনয়শিল্পী মা; ফলে শিল্পীজীবনের নানা গল্প ও অভিজ্ঞতা ছিল তার বেড়ে ওঠার অংশ।

তবে এই পরিচয়ের সঙ্গে ছিল প্রত্যাশার চাপও। সুচিত্রা সেনের নাতনি হিসেবে অভিনয়ে আসার অর্থ ছিল, তার কাজের সঙ্গে কিংবদন্তি দিদার তুলনা অনিবার্য হয়ে ওঠা।

১৯৯৯ সালে হিন্দি চলচ্চিত্র ‘গডমাদার’-এর মাধ্যমে অভিনয় শুরু করেন রাইমা। ছবিতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে ছিলেন শাবানা আজমি। এরপর ‘দমন’সহ কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করলেও তার ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসে বাংলা সিনেমায়।

ঋতুপর্ণ ঘোষ পরিচালিত ‘চোখের বালি’ চলচ্চিত্রে আশালতা চরিত্রে অভিনয় করে নতুন করে আলোচনায় আসেন রাইমা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চনের বিনোদিনীর বিপরীতে রাইমার আশালতা ছিল সংযত, আবেগপ্রবণ এবং জটিল সম্পর্কের মধ্যে অবস্থান করা এক নারী।

এই চরিত্রে তার অভিনয় সমালোচকদের প্রশংসা পায়। পরবর্তী সময়ে বাংলা চলচ্চিত্রে তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকে।

রাইমার অভিনয়ের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য সংযত অভিব্যক্তি। অনেক চরিত্রেই সংলাপের চেয়ে চোখের ভাষা, নীরবতা কিংবা ছোট ছোট প্রতিক্রিয়ায় আবেগ প্রকাশের চেষ্টা দেখা যায়। এই অভিনয়ধারা তাকে সমকালীন বাংলা চলচ্চিত্রের একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করতে সাহায্য করেছে।

পথপ্রদর্শকের ভূমিকায় ঋতুপর্ণ ঘোষ

রাইমা সেনের অভিনয়জীবনের সঙ্গে পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষের নাম বিশেষভাবে জড়িয়ে আছে। ‘চোখের বালি’, ‘অন্তরমহল’, ‘খেলা’, ‘নৌকাডুবি’সহ বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে একসঙ্গে কাজ করেছেন তারা।

ঋতুপর্ণের চলচ্চিত্রে সম্পর্কের জটিলতা, ব্যক্তিমানুষের আবেগ এবং নারীর অভিজ্ঞতা বিশেষ গুরুত্ব পায়। রাইমার অভিনয়ের সংযত ধরন এই ধরনের গল্পে বিশেষভাবে মানিয়ে যায়।

২০১৩ সালে ঋতুপর্ণ ঘোষের মৃত্যুর পর এক সাক্ষাৎকারে রাইমা তাকে নিজের অভিনয়জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পথপ্রদর্শক হিসেবে স্মরণ করেছিলেন।

ঋতুপর্ণের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা শুধু তার ক্যারিয়ারে উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র যোগ করেনি, চরিত্র নির্বাচন ও অভিনয়শিল্পী হিসেবে বিকাশেও প্রভাব রেখেছে।

বাণিজ্যিক সাফল্যের চেয়ে চরিত্রের বৈচিত্র্য

রাইমার অভিনয়জীবনে বাংলা ও হিন্দি দুই ভাষার চলচ্চিত্রই গুরুত্বপূর্ণ। ‘পরিণীতা’, ‘দ্য বং কানেকশন’, ‘অনুরণন’, ‘দ্য জাপানিজ ওয়াইফ’, ‘নৌকাডুবি’, ‘বাইশে শ্রাবণ’ এবং ‘হৃদ মাঝারে’ তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে।

বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে রাইমা জানিয়েছেন, চলচ্চিত্র বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে চিত্রনাট্য ও পরিচালকের গুরুত্ব তার কাছে বেশি। ফলে বড় বাজেটের বাণিজ্যিক সিনেমার পাশাপাশি স্বল্প বাজেটের গল্পনির্ভর চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন তিনি।

‘দ্য জাপানিজ ওয়াইফ’-এর মতো মানবিক সম্পর্কনির্ভর চলচ্চিত্র, ‘বাইশে শ্রাবণ’-এর মতো থ্রিলার কিংবা ‘নৌকাডুবি’-র মতো সাহিত্যনির্ভর গল্পে তার উপস্থিতি অভিনয়জীবনের বৈচিত্র্য তুলে ধরে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওয়েব সিরিজ ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মেও কাজ করছেন রাইমা। ‘হ্যালো’, ‘দ্য লাস্ট আওয়ার’, ‘মাই: আ মাদার্স রেজ’সহ বিভিন্ন প্রযোজনায় অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তিনি নতুন মাধ্যমেও নিজেকে যুক্ত করেছেন।

চলচ্চিত্র থেকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দর্শকের অভ্যাস বদলে যাওয়ার এই সময়েও অভিনয়ে সক্রিয় থাকার চেষ্টা তাঁর ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ দিক।

দিদার সঙ্গে তুলনা, কিন্তু অনুকরণ নয়

সুচিত্রা সেনের সঙ্গে রাইমার চেহারা, চোখ এবং অভিব্যক্তির মিল নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে ঐতিহ্যবাহী বাঙালি সাজে রাইমার ছবি প্রকাশ হলে দর্শকদের একাংশের কাছে ফিরে আসে সুচিত্রার স্মৃতি।

কিন্তু রাইমা নিজের শিল্পীপরিচয়কে কেবল পারিবারিক সাদৃশ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি। সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, দিদার চলচ্চিত্র তার কাছে অভিনয় শেখার গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

‘দীপ জ্বেলে যাই’, ‘সপ্তপদী’, ‘হারানো সুর’, ‘আঁধি’সহ সুচিত্রার বিভিন্ন চলচ্চিত্র থেকে অনুপ্রেরণা পাওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।

তবে দুই প্রজন্মের অভিনয়ের পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। সুচিত্রা যখন অভিনয় করতেন, তখন তারকাদের ব্যক্তিজীবন সাধারণ দর্শকের কাছে অনেকটাই আড়ালে থাকত। চলচ্চিত্রের বাইরেও রহস্যময় ব্যক্তিত্ব তাদের জনপ্রিয়তার অংশ হয়ে উঠতে পারত।

রাইমার সময়ের তারকাদের কাজ করতে হয়েছে টেলিভিশন, ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডিজিটাল বিনোদনের বিস্তৃত পরিসরে। ফলে দিদার অভিনয় থেকে শিক্ষা নিলেও রাইমাকে নিজের পথ তৈরি করতে হয়েছে ভিন্ন বাস্তবতায়।

তিন নারী, তিন সময়ের বাংলা সিনেমা

সুচিত্রা, মুনমুন ও রাইমার অভিনয়জীবনকে পাশাপাশি রাখলে বাংলা চলচ্চিত্রের দীর্ঘ পরিবর্তনের একটি চিত্র পাওয়া যায়।

সুচিত্রা প্রতিনিধিত্ব করেন সেই সময়ের, যখন চলচ্চিত্রের পর্দায় রোমান্টিক জুটি, আবেগঘন কাহিনি এবং তারকাদের ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল দর্শকপ্রিয়তার বিশেষ ধারা।

মুনমুনের সময় বাংলা চলচ্চিত্রের পাশাপাশি সর্বভারতীয় বাণিজ্যিক সিনেমার বাজারে কাজের সুযোগ বাড়ছিল। বিভিন্ন ভাষা ও ঘরানার চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তার ক্যারিয়ার গড়ে ওঠে।

আর রাইমার অভিনয়জীবন শুরু হয় এমন এক সময়ে, যখন বাংলা সিনেমায় গল্পনির্ভর নির্মাণ, সাহিত্যভিত্তিক চলচ্চিত্র, স্বাধীনধারার উদ্যোগ এবং পরবর্তী সময়ে ডিজিটাল বিনোদনের প্রসার ঘটছে।

তিনজনের ক্যারিয়ারের পরিসর ও সাফল্য এক নয়। কিন্তু তাদের কাজ তিনটি ভিন্ন সময়ের চলচ্চিত্র সংস্কৃতিকে বুঝতে সাহায্য করে।

এক পরিবারে তিন প্রজন্মের নারীর অভিনয়জীবন তাই শুধু পারিবারিক ইতিহাস নয়, বাংলা সিনেমায় পরিবর্তিত নারীচরিত্র, দর্শকের প্রত্যাশা এবং শিল্পীর কাজের সুযোগেরও প্রতিফলন।

দুই বাংলার সঙ্গে এক পরিবারের সম্পর্ক

এই পরিবারের ইতিহাসে বাংলাদেশের সঙ্গে রয়েছে বিশেষ আবেগের সম্পর্ক। সুচিত্রা সেনের জন্ম ও শৈশবের স্মৃতি জড়িয়ে আছে পাবনার সঙ্গে। তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়িকা হয়ে ওঠেন কলকাতায়, কিন্তু তার শিকড় বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডে। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির এই ঐতিহাসিক সংযোগ তাকে দুই বাংলার মানুষের কাছে আপন করে রেখেছে।

রাইমার অভিনয়জীবনের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি চলচ্চিত্র-সম্পৃক্ততা তুলনামূলক সীমিত হলেও তার দিদার পরিচয় এবং বাংলা চলচ্চিত্রে নিজের কাজের কারণে বাংলাদেশের দর্শকের কাছেও তিনি পরিচিত মুখ।

বিশেষ করে ‘চোখের বালি’, ‘নৌকাডুবি’ কিংবা ‘বাইশে শ্রাবণ’-এর মতো চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তার অভিনয় দুই বাংলার চলচ্চিত্রপ্রেমীদের আলোচনায় এসেছে। এই সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ভূগোলের সীমানা ছাড়িয়ে একটি ভাষাভিত্তিক চলচ্চিত্র-পরম্পরার কথা মনে করিয়ে দেয়।

৪৭ বছরে রাইমা: উত্তরাধিকারের সঙ্গে নিজের পথচলা

সুচিত্রা সেন অভিনয়জীবন থেকে বিদায় নিয়েছিলেন একসময়। মুনমুন সেনও চলচ্চিত্রে দীর্ঘ কর্মজীবন পার করেছেন। কিন্তু রাইমা এখনও অভিনয়ে সক্রিয়। নতুন পরিচালক, নতুন গল্প ও নতুন মাধ্যমের সঙ্গে কাজ করে চলেছেন তিনি।

তার চলচ্চিত্রজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো, পারিবারিক খ্যাতি নিয়ে যাত্রা শুরু করেও তিনি অভিনয়ের জন্য নিজের পরিচয় গড়ে তুলেছেন।

দিদার মতো তারকাখ্যাতি অর্জন করাই তার ক্যারিয়ারের একমাত্র লক্ষ্য ছিল না। বরং বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে কাজ করার মধ্য দিয়ে নিজের অভিনয়-অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করেছেন।

আজ তার ৪৭তম জন্মদিনে তাই সুচিত্রা সেনের স্মৃতির সঙ্গে যেমন ফিরে আসে মুনমুন সেনের অভিনয়জীবন, তেমনি সামনে আসে রাইমার নিজস্ব অর্জনের কথাও।

বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এই পরিবারের তিন নারী তিনটি ভিন্ন সময়ের প্রতিনিধি। একজন মহানায়িকা হয়ে দর্শকের স্মৃতিতে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন। একজন বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের বিভিন্ন ধারায় কাজ করেছেন। আর তৃতীয়জন গল্পনির্ভর সিনেমা থেকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম পর্যন্ত অভিনয়ের পরিসর বিস্তৃত করেছেন।

সুচিত্রা থেকে মুনমুন, মুনমুন থেকে রাইমা; এ যেন তিন প্রজন্ম ধরে পর্দায় এক পরিবারের গল্প। যেখানে উত্তরাধিকার আছে, তুলনা আছে, কিন্তু প্রত্যেকের পথচলার রয়েছে নিজস্ব পরিচয়।

রাইমার জন্মদিনে তাই ফিরে দেখা শুধু একজন অভিনেত্রীর জীবন নয়, বাংলা চলচ্চিত্রের তিন প্রজন্মের এক চলমান ইতিহাস।

বিষয়:নায়িকা বাংলাদেশ মুনমুন সেন রাইমা সেন সিনেমা সুচিত্রা সেন

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…