বিশেষ

রুশ বিপ্লবের ১০৯ বছর: যেভাবে বদলে গিয়েছিল বিশ্বরাজনীতি, যেভাবে পতন সোভিয়েতের

রুশ বিপ্লবের ১০৯ বছর: যেভাবে বদলে গিয়েছিল বিশ্বরাজনীতি, যেভাবে পতন সোভিয়েতের

একটি বিপ্লব বদলে দিয়েছিল একটি দেশের শাসনব্যবস্থা। সেই পরিবর্তনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো পৃথিবীতে। জন্ম হয়েছিল নতুন এক রাষ্ট্রব্যবস্থার, নতুন রাজনৈতিক আদর্শের। পুঁজিবাদের বিপরীতে সমাজতন্ত্র হয়ে উঠেছিল বিশ্বরাজনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি। পৃথিবী বিভক্ত হয়েছিল দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরে। শুরু হয়েছিল স্নায়ুযুদ্ধ, অস্ত্র প্রতিযোগিতা, মহাকাশ জয়ের লড়াই। আর সেই প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন।

কিন্তু যে বিপ্লব একটি পরাশক্তির জন্ম দিয়েছিল, সেই বিপ্লবের আদর্শে গড়ে ওঠা রাষ্ট্রই একসময় ভেঙে পড়ে। ১৯১৭ সালের বিপ্লব থেকে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি; ইতিহাসের এই ৭৪ বছরের যাত্রা বিশ্বরাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

আজ ৭ নভেম্বর। রুশ বিপ্লবের ১০৯ বছর পূর্ণ হলো। একই সঙ্গে ফিরে দেখার সময়, কীভাবে একটি বিপ্লব পৃথিবীর ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিয়েছিল এবং কেন সেই বিপ্লবের উত্তরাধিকার বহনকারী সোভিয়েত রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেনি।

বিপ্লবের পেছনে ক্ষুধা, যুদ্ধ ও বৈষম্য

১৯১৭ সালের আগে রাশিয়া ছিল জার শাসিত একটি বিশাল সাম্রাজ্য। দেশের অধিকাংশ মানুষ ছিলেন কৃষক ও শ্রমজীবী। জমির মালিকানা, সম্পদের বণ্টন এবং রাজনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রে ছিল গভীর বৈষম্য। রাজতন্ত্রের কর্তৃত্বের বিপরীতে সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ছিল সীমিত।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ রাশিয়ার সংকট আরও তীব্র করে। যুদ্ধক্ষেত্রে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি, খাদ্যসংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয় সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বাড়িয়ে দেয়।

১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয় গণবিক্ষোভ। শ্রমিকদের ধর্মঘট ও সেনাবাহিনীর একাংশের বিদ্রোহের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন জার দ্বিতীয় নিকোলাস। অবসান ঘটে রোমানভ রাজবংশের দীর্ঘ শাসনের।

কিন্তু রাজতন্ত্রের পতনেও সংকট কাটেনি। নতুন অস্থায়ী সরকার যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। মানুষের প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় বাড়তে থাকে অসন্তোষ।

এই পরিস্থিতিতে সামনে আসেন ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন। তার নেতৃত্বাধীন বলশেভিক পার্টি শান্তি, জমি ও খাদ্যের দাবিকে রাজনৈতিক আন্দোলনের কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

৭ নভেম্বর: যেদিন বদলে গেল ইতিহাস

তৎকালীন রাশিয়ায় প্রচলিত জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী,১৯১৭ সালের ২৫ অক্টোবর বলশেভিকদের নেতৃত্বে শুরু হয় ক্ষমতা দখলের অভিযান। বর্তমান গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে দিনটি ৭ নভেম্বর।

পেত্রোগ্রাদে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা ও যোগাযোগব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নেয় বিপ্লবী বাহিনী। অস্থায়ী সরকারের কেন্দ্র উইন্টার প্যালেস দখলের মধ্য দিয়ে পতন ঘটে আলেকজান্ডার কেরেনস্কির সরকারের।

ক্ষমতায় আসে লেনিনের নেতৃত্বাধীন বলশেভিক সরকার। এই ঘটনা ইতিহাসে পরিচিত অক্টোবর বিপ্লব নামে।

ক্ষমতায় এসে নতুন সরকার ভূমি সংস্কার, শিল্পের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে রাশিয়ার বেরিয়ে আসার উদ্যোগ নেয়।

তবে নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথ ছিল সংঘাতপূর্ণ। শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। বলশেভিকদের লাল বাহিনী ও তাদের বিরোধী বিভিন্ন শক্তির মধ্যে কয়েক বছর ধরে চলে লড়াই। রাজনৈতিক দমনপীড়ন, খাদ্যসংকট ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন।

সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্ম: নতুন এক পরাশক্তির ভিত্তি

১৯২২ সালের ৩০ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় ইউনিয়ন অব সোভিয়েত সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকস বা ইউএসএসআর, যা সোভিয়েত ইউনিয়ন নামে পরিচিত।

রাশিয়াকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই রাষ্ট্র পরবর্তী সময়ে ১৫টি প্রজাতন্ত্র নিয়ে বিশাল এক রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক শক্তিতে পরিণত হয়।

সোভিয়েত রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি ছিল কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও উৎপাদনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।

শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নারীর কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সোভিয়েত ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে।

তবে রাষ্ট্রীয় সমতার আদর্শের পাশাপাশি রাজনৈতিক ক্ষমতা ক্রমেই কেন্দ্রীভূত হতে থাকে কমিউনিস্ট পার্টির হাতে। বিরোধী মত ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সুযোগ সংকুচিত হয়।

লেনিনের মৃত্যুর পর জোসেফ স্ট্যালিনের নেতৃত্বে দ্রুত শিল্পায়নের কর্মসূচি শুরু হয়। কৃষিতে জোরপূর্বক সমবায়ীকরণ, রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযান, গণগ্রেপ্তার এবং ব্যাপক রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন সোভিয়েত ইতিহাসের অন্ধকার অধ্যায় হয়ে থাকে।

একদিকে শিল্প ও সামরিক শক্তির বিস্তার, অন্যদিকে নাগরিক স্বাধীনতার সংকোচন; এই দুই বাস্তবতা সোভিয়েত ব্যবস্থার ইতিহাসে পাশাপাশি অবস্থান করেছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সোভিয়েত ইউনিয়নের অবস্থান আমূল বদলে দেয়। ১৯৪১ সালে নাৎসি জার্মানি সোভিয়েত ভূখণ্ডে আক্রমণ চালায়। দীর্ঘ ও ভয়াবহ যুদ্ধের পর সোভিয়েত বাহিনী নাৎসি জার্মানির পরাজয়ে নির্ণায়ক ভূমিকা রাখে।

১৯৪৫ সালে যুদ্ধ শেষ হলে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বের অন্যতম প্রধান সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

কিন্তু যুদ্ধকালীন মিত্রতা দ্রুত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক শিবির এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক শিবিরের মধ্যে শুরু হয় আদর্শিক, রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা।

এই প্রতিযোগিতাই ইতিহাসে পরিচিত স্নায়ুযুদ্ধ নামে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পূর্ব ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে সোভিয়েত-সমর্থিত কমিউনিস্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে পশ্চিম ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বৃদ্ধি পায়।

জার্মানি বিভক্ত হয়। সামরিক জোট গড়ে ওঠে। পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতা পৃথিবীকে বিপজ্জনক উত্তেজনার মধ্যে নিয়ে যায়।

কোরিয়া, ভিয়েতনাম, আফগানিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে দুই পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্থানীয় সংঘাতকে আন্তর্জাতিক মাত্রা দেয়।

একই সঙ্গে শুরু হয় মহাকাশ প্রতিযোগিতা। ১৯৫৭ সালে প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ স্পুটনিক উৎক্ষেপণ এবং ১৯৬১ সালে ইউরি গ্যাগারিনের প্রথম মানব মহাকাশযাত্রা সোভিয়েত প্রযুক্তিগত অগ্রগতির প্রতীক হয়ে ওঠে।

সমাজতন্ত্রের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে

রুশ বিপ্লবের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবগুলোর একটি ছিল সমাজতান্ত্রিক ও কমিউনিস্ট আন্দোলনের আন্তর্জাতিক বিস্তার।

চীন, কিউবা, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশে বিপ্লবী রাজনীতি ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিকাশে রুশ বিপ্লব অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। যদিও এসব দেশের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, বিপ্লবের পথ ও সমাজতন্ত্রের ব্যাখ্যা এক ছিল না।

এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনেও সমাজতান্ত্রিক চিন্তার উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়ে।

শ্রমিকের অধিকার, ভূমি সংস্কার, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ হয়।

অন্যদিকে পুঁজিবাদী দেশগুলোতেও কল্যাণরাষ্ট্র, শ্রম অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষার প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এসব পরিবর্তনের পেছনে নিজস্ব শ্রমিক আন্দোলন, গণতান্ত্রিক রাজনীতি ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি সমাজতান্ত্রিক বিকল্পের উপস্থিতিও ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও সোভিয়েত প্রভাব

সোভিয়েত ইউনিয়নের বিশ্বরাজনৈতিক ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ছিল স্নায়ুযুদ্ধের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিভক্ত।

যুক্তরাষ্ট্রের নিক্সন প্রশাসন পাকিস্তানের প্রতি কৌশলগত সমর্থন বজায় রাখে। অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করে।

১৯৭১ সালের আগস্টে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি।

ডিসেম্বরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নিয়ে আলোচনায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেটো প্রয়োগ করে। এর ফলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনেও সহযোগিতা করে মস্কো। চট্টগ্রাম বন্দরের নৌপথ থেকে মাইন ও ডুবে থাকা জাহাজ অপসারণে সোভিয়েত সহায়তা ছিল উল্লেখযোগ্য।

এভাবে ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব থেকে জন্ম নেওয়া রাষ্ট্রব্যবস্থা কয়েক দশক পর বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সোভিয়েত ব্যবস্থায় সংকট: শক্তির আড়ালে দুর্বলতা

বিশ্বজুড়ে প্রভাব বিস্তার করলেও সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরে ধীরে ধীরে জমতে থাকে নানা সংকট।

কেন্দ্রীয় পরিকল্পিত অর্থনীতি প্রাথমিক শিল্পায়নে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখালেও পরবর্তী সময়ে উৎপাদনশীলতা, উদ্ভাবন, ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনায় সমস্যার মুখে পড়ে।

বৃহৎ সামরিক ব্যয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘ প্রতিযোগিতা অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

১৯৭৯ সালে আফগানিস্তানে সোভিয়েত সামরিক হস্তক্ষেপ নতুন সংকট তৈরি করে। দীর্ঘ যুদ্ধ আর্থিক চাপের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অবস্থানেও প্রভাব ফেলে।

অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন প্রজাতন্ত্রে জাতীয় পরিচয়, ভাষা, সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি ক্রমে জোরালো হয়ে ওঠে।

সোভিয়েত নেতৃত্বের সামনে তখন বড় প্রশ্ন: কঠোর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে কি এত বিশাল রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব?

গর্বাচেভ: সংস্কার করতে গিয়ে ভাঙনের মুখে

১৯৮৫ সালে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক হন মিখাইল গর্বাচেভ। তিনি বুঝতে পারেন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার ছাড়া বিদ্যমান ব্যবস্থাকে সচল রাখা কঠিন। শুরু করেন দুটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি: পেরেস্ত্রইকা ও গ্লাসনস্ত।

পেরেস্ত্রইকার অর্থ পুনর্গঠন। এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। গ্লাসনস্তের অর্থ উন্মুক্ততা। এই নীতির ফলে মতপ্রকাশ, গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক আলোচনায় তুলনামূলক স্বাধীনতা আসে।

কিন্তু সংস্কার প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারেনি। বরং দীর্ঘদিনের চাপা অসন্তোষ, রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা এবং বিভিন্ন প্রজাতন্ত্রের স্বাধীনতার দাবি প্রকাশ্যে আসতে থাকে।

পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক সরকারগুলোও একের পর এক ক্ষমতা হারাতে শুরু করে। ১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীরের পতন স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের প্রতীক হয়ে ওঠে। এরপর ঘটনাপ্রবাহ দ্রুত এগিয়ে যায় সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের দিকে।

১৯৯১: যে বছর লাল পতাকা নেমে গেল

১৯৯১ সালের আগস্টে গর্বাচেভের সংস্কারের বিরোধী কমিউনিস্ট পার্টি ও রাষ্ট্রযন্ত্রের একাংশ অভ্যুত্থানের চেষ্টা চালায়।

সেই চেষ্টা ব্যর্থ হলেও কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্ব আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। রাশিয়ার নেতা বরিস ইয়েলৎসিনের রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি পায়।

সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলো একে একে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যায়।

৮ ডিসেম্বর রাশিয়া, ইউক্রেন ও বেলারুশের নেতারা একটি চুক্তির মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়নের অবসান এবং স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর নতুন জোট গঠনের ঘোষণা দেন।

২৫ ডিসেম্বর সোভিয়েত প্রেসিডেন্টের পদ থেকে পদত্যাগ করেন মিখাইল গর্বাচেভ। সেদিনই ক্রেমলিন থেকে নামিয়ে ফেলা হয় সোভিয়েত ইউনিয়নের লাল পতাকা।

২৬ ডিসেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়নের আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তি সম্পন্ন হয়। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পরাশক্তি ভেঙে ১৫টি স্বাধীন রাষ্ট্রের আবির্ভাব ঘটে।

প্রায় সাত দশক ধরে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রে থাকা একটি রাষ্ট্রের অবসান ঘটে। কিন্তু তার সঙ্গে শেষ হয়ে যায়নি সেই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আদর্শিক প্রভাব।

কেন পতন হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের?

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পেছনে একক কোনো কারণ ছিল না।

দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক স্থবিরতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, রাজনৈতিক স্বাধীনতার অভাব, কেন্দ্রীয় শাসনের প্রতি অসন্তোষ এবং বিভিন্ন প্রজাতন্ত্রের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন; সব মিলিয়ে রাষ্ট্রের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ায়।

গর্বাচেভের সংস্কার পুরোনো ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করে দিলেও কার্যকর নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলার আগেই রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়তে থাকে।

ইতিহাসবিদদের বিশ্লেষণে তাই সোভিয়েত পতন শুধু স্নায়ুযুদ্ধে পরাজয়ের ঘটনা নয়; বরং গভীর অভ্যন্তরীণ সংকট, রাজনৈতিক পরিবর্তন ও জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবির সম্মিলিত পরিণতি।

সোভিয়েত পতনের পর বদলে গেল পৃথিবী

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্বরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাধান্য অনেক বেড়ে যায়।

পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পথ বেছে নেয়। অনেক দেশ পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোতে যোগ দেয়।

অন্যদিকে সোভিয়েত-পরবর্তী রাষ্ট্রগুলোয় বাজার অর্থনীতিতে উত্তরণ, রাষ্ট্রীয় সম্পদের বেসরকারীকরণ এবং নতুন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়। কোথাও এই পরিবর্তন নতুন সুযোগ তৈরি করে, কোথাও দেখা দেয় গভীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট।

রাশিয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধান উত্তরসূরি রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখে।

পরবর্তী দশকগুলোতে রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্ক আবার সংঘাতপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ইউক্রেনকে কেন্দ্র করে বিরোধ দেখিয়ে দিয়েছে, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটলেও তার ভৌগোলিক ও নিরাপত্তাগত উত্তরাধিকার আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এখনও গুরুত্বপূর্ণ।

একই সময়ে চীন কমিউনিস্ট পার্টির শাসন বজায় রেখেই বাজারমুখী অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে উঠেছে। ফলে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক চিন্তা বা কমিউনিস্ট পার্টি-শাসিত রাষ্ট্রব্যবস্থার সর্বজনীন অবসান ঘটায়নি।

১০৯ বছর পর রুশ বিপ্লবের শিক্ষা কী?

১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব ছিল কেবল একটি সরকারের পতন নয়। এটি ছিল রাষ্ট্র, সম্পদ, শ্রম, শ্রেণি ও ক্ষমতার সম্পর্ককে নতুনভাবে সাজানোর এক ঐতিহাসিক প্রচেষ্টা।

এই বিপ্লব বিশ্বজুড়ে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনকে শক্তিশালী করেছে, উপনিবেশবিরোধী রাজনীতিতে প্রভাব ফেলেছে এবং পুঁজিবাদী বিশ্বের সঙ্গে দীর্ঘ আদর্শিক প্রতিযোগিতার জন্ম দিয়েছে।

কিন্তু সোভিয়েত অভিজ্ঞতা একই সঙ্গে দেখিয়েছে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষার লক্ষ্য অর্জনের পাশাপাশি রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, জবাবদিহি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কার্যকারিতাও গুরুত্বপূর্ণ।

রুশ বিপ্লবের অর্জন ও ব্যর্থতার মূল্যায়ন নিয়ে আজও ইতিহাসবিদ এবং রাজনৈতিক চিন্তাবিদদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে।

তবু একটি বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ কম: ১৯১৭ সালের সেই বিপ্লব না ঘটলে বিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতির ইতিহাস অনেকটাই ভিন্ন হতে পারত।

৭ নভেম্বর ১৯১৭-তে পেত্রোগ্রাদে শুরু হওয়া পরিবর্তনের পথ গিয়ে শেষ হয়েছিল ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে সোভিয়েত রাষ্ট্রের বিলুপ্তিতে। কিন্তু ইতিহাসের সেই অধ্যায় এখনও পুরোপুরি অতীত হয়ে যায়নি।

কারণ রাষ্ট্রটি নেই, তার লাল পতাকাও আর ক্রেমলিনে ওড়ে না। অথচ সোভিয়েত যুগের প্রভাব এখনও রয়ে গেছে পৃথিবীর সীমানায়, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনে, অর্থনৈতিক চিন্তায় এবং রাষ্ট্র ও সমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের বিতর্কে।

রুশ বিপ্লবের ১০৯ বছর পর তাই ইতিহাসের প্রশ্ন শুধু এই নয় যে, কেন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়েছিল। প্রশ্ন এটিও যে একটি বিপ্লব কীভাবে পৃথিবীকে বদলে দিতে পারে, আর সেই পরিবর্তনকে টিকিয়ে রাখতে একটি রাষ্ট্রের কী কী প্রয়োজন।

বিষয়:৭ নভেম্বর ইতিহাস রাশিয়া রুম বিপ্লব সোভিয়েতন ইউনিয়ন

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…