চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ
Partex Group

বঙ্গবন্ধু জানতেই পারছেন না-কেমন আছে তার বাংলাদেশ!

Nagod
Bkash July

শোকাবহ ১৫ আগস্ট এসে গেল। ৪৭ তম ১৫ আগষ্ট। অর্থাৎ ৪৭ বছর আগে আমরা বঙ্গবন্ধুকে হারিয়েছি-বঙ্গবন্ধু হারিয়েছেন তার প্রিয় বাংলাদেশ ও দেশের জনগণকে। সেই থেকে আতজত সম্ভবত: বঙ্গবন্ধু জানতেই পারছেন না-হালের বাংলাদেশ কেমন চলছে-কেমন আছে তার প্রিয় জনগণ।

অপরপক্ষে বছর কয়েক হলো আমরা আগস্ট মাস জুড়ে এবং তার আগে কিছুকাল সপ্তাহব্যাপি এবং তারও আগে ১৫ আগস্ট এক দিনের জন্য আমরা জাতীয় শোক দিবস পালন করে আসছি-ধারণ করছি কালো ব্যাজ, ঊর্ধে তুলে ধরছি কালো পতাকা, আয়োজন করছি আলোচনা বা স্মরণ সভার। এছাড়াও বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের রেকর্ড সারা দেশ জুড়ে বাজানো হচ্ছে। এভাবেই পালন করে আসছি জাতীয় শোক দিবস বা শোক সপ্তাহ এবং অতঃপর প্রায় এক যুগ ব্যাপী শোকের মাস।

কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করতে গিয়ে তাঁর অবদান বাঙালির জন্য একটি স্বাধীন দেশ-এটাই যেন প্রাধান্য পাচ্ছে কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক অবদানকে (যা হলো তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠতম অবদান) সে আলোচনায় আমরা আদৌ স্থান দিতে দেখি না। তাই যে প্রত্যয় ১৫ আগস্ট বা আগস্ট মাস জুড়ে ঘোষিত হবার কথা তা আজ প্রায় বিস্মৃত। সে স্থলে উন্নয়নের খতিয়ান নিয়ে আমরা তার নাম উচ্চারণ করি। বঙ্গন্ধু কি তাতে আর আমরা যারা সেদিন বা সেই মাসব্যাপী উন্নয়নের ঝাঁপি খুলে দিয়ে জনগণকেও আত্মতৃপ্তি পেতে আহবান জানাই-তারা কি এক মুহূর্তের জন্যেও ভাবি, বঙ্গবন্ধুর কি তা যথার্থভাবে পালন করে চলেছি বা নতুন প্রজন্মকে অবদান স্মরণ ও তাকে ঊর্দ্ধে তুলে ধরতে অনুপ্রাণিত করছি?

প্রশ্নগুলির যথাযথ উত্তর পেতে হলে হালের বাংলাদেশের টুকরো টুকরো ছবিই তুলে ধরা, স্মরণে আনা, এবং নতুন করে তা থেকে শিক্ষা নেয়া প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর বিদেহী পবিত্র আত্মার সামনে আজকের বাংলাদেশের খণ্ড চিত্র তুলে ধরছি। বঙ্গবন্ধু, তুমি যেখানেই থাকো, যেভাবেই থাকো তোমার বাংলাদেশ, তোমার রেখে যাওয়া কোটি কোটি মানুষ বস্তুত কেমন আছে তার খণ্ড চিত্র পাঠালা-দেখো বঙ্গবন্ধু দেখো আমাদের প্রিয় মুজিব ভাই। পাকিস্তানকে কেন তোমার নেতৃত্বে বাঙালি জাতি প্রত্যাখ্যান করেছিলো-সে ইতিহাস আজ বিস্মৃত।

১৯৪৮ ও ১৯৫২ র ভাষা আন্দোলন দেশে অসাম্প্রদায়িক ভাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটায়-শিক্ষিত জাতি গড়তে বাংলা ভাষার সর্বাত্মক ব্যবহারের গুরুত্ব ঊর্দ্ধে তুলে ধরে। দেশ সে পথে চলছিলও।

কিন্তু কি দিয়ে কি হলো তা বুঝে ওঠার সময় পেতে না পেতেই খোন্দকার মোশতাক এবং অতঃপর জিয়া ও তারপর স্বৈরাচারী এরশাদ ক্ষমতায় এসে তাদের অবৈধ ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার লক্ষ্যে নানাভাবে ধর্মের জিগির তুলতে শুরু করলো। জিয়া বাহাত্তরের সংবিধানে অবৈধভাবে পঞ্চম সংশোধনী এনে “বিসমিল্লাহ্ সংযোজন করলো, জামায়াত ইসলামী, মুসলিম লীগসহ ধর্মাশ্রয়ী দলগুলিকে বৈধতা দিল। আজকের আওয়ামী লীগও এগুলিকে গুরুত্ব দিয়ে মেনে চলছে। যদিও বঙ্গবন্ধু, তুমি বাহাত্তরের সংবিধানে এগুলিকে স্বষ্টাক্ষরে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলে। জিয়া তা মানে নি। মোশতাক তোমাকে “ইসলাম বিরোধী” বলে আখ্যায়িত করেছিল। জিয়া ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র তুলে দিয়েছিল ৭২ এর সংবিধান থেকে।

অতঃপর এলো অপর সামরিক শাসক এরশাদ। গণতন্ত্রের দুশমন, ধর্মনিরপেক্ষতার দুশমন-সমাজতন্ত্রের দুশমন। তার বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৫ দল ও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ৭ দল এবং পরবর্তীতে বামদের ৫ দল প্রায় দশকব্যাপী আন্দোলন চালিয়ে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সক্ষম হয়। কিন্তু তার আগেই এরশাদ সংবিধানে অষ্টম সংশোধনী এনে ‘বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ কথা কটি বেআইনীভাবে সংযোজন করে। এগুলির বিরুদ্ধে ১৫ দল, সাত দল, পাঁচ দল আন্দোলন পরিচালন করে।

১৯৯১ তে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে জিতলো বিএনপি কিন্তু একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা ছিল না তাই তারা জামায়াতের তিন এম.পি’র সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় বসে আগের প্রতিশ্রুতি বেমালুম ভুলে গেলেন। তাই জিয়া-এরশাদের অবৈধ সংশোধনীগুলি দিব্যি থেকে গেল।

কিন্তু ওগুলি বাতিল ও বাহাত্তরের মূল সংবিধানের অবিকল পুরুজ্জীবনের দাবীতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৫ দলের আন্দোলন ১৯৯৬ পর্যন্ত অব্যাহত থাকলো। অতঃপর সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলো প্রথম বারের মত শেখ হাসিনার নেতৃত্বে কিন্তু সংসদে দুই তৃতীয়াংশ মেজারিটি না থাকায় সংবিধান সংশোধন সম্ভব হয় নি-তার জন্যে কোন চেষ্টাও করা হয় নি।

পুনরায় বিএনপি ক্ষমতায়। সংশোধনীর দাবি উপেক্ষার শিকার হয়েই থেকে গেল।

২০০৮ এ এসে তৎকালীন তত্তাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ভূমিধস বিজয় অর্জন করে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকারও গঠন করে কিন্তু দুই-তৃতীয়াংশের অনেক বেশী আসন সেবার এবং পরবর্তীতে দুইবার অর্জন করলেও উপেক্ষার শিকার হয়েই রইলো বাহাত্তরের সংবিধান অবিকল পুনরুজ্জীবনের দাবী এবং প্রতিশ্রুতি।

এবারে দেশের ১৬ কোটি মানুষ আশাবাদী হলেন। এ সরকারের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু কন্যা স্বয়ং থাকায় এবং মুক্তিযুদ্ধের বৃহত্তম দলটির মুখ্য নেতৃত্বে তিনি থাকায় বাহাত্তরের সংবিধান যে পুনরুজ্জীবিত হবেই এবং বঙ্গবন্ধুর চার মৌলনীতি যা বাহাত্তরের সংবিধানে লিপিবদ্ধ হয়েছিল কিন্তু মোশতাক-জিয়া-এরশাদ মিলে বাংলাদেশকে যেভাবে পাকিস্তানী আদর্শে ফিরিয়ে নিতে বাহাত্তরের সংবিধানে পঞ্চম ও অষ্টম সংশোধনী পাশ করে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র বানিয়ে ফেললো তা থেকে বাংলাদেশকে বাঁচাতে মৌল চার নীতি সংবিধানে সংযোজন করে ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ আবার ফিরিয়ে আনা হবে। কিন্তু না, বঙ্গবন্ধু! পর পর তোমার দল তিনবার নির্বাচিত হয়ে দেশ শাসন করলেও তোমার চেতনা ও আদর্শকে সংবিধানে পুনঃস্থাপন করলেন না। উপরন্ত অষ্টম সংশোধনীর দ্বারা যিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ঘোষণা করলেন, গুলি করে ছাত্র-যুব-কৃষক-শ্রমিক নেতাদেরকে যার রাজত্বকালে হত্যা করা হলো, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক নেতাদেরকে যিনি একটি বৈঠক থেকে ধরে নিয়ে ক্যান্টনমেন্টে চোখ বেঁধে নিয়ে যেতে দ্বিধা করেন নি-তাঁর প্রবর্তিত রাষ্ট্রধর্ম বহাল রাখা হলো। তাই নয়, স্বৈরাচারী বলে পরিচিত এরশাদের বিরুদ্ধে বিচারাধীন দুর্নীতির মামলাগুলি প্রত্যাহার করে নিয়ে এরশাদকে আওয়ামী লীগের মিত্র বানিয়ে তাদেরকে এম.পি. মন্ত্রী ও বিরোধীদলের নেতৃত্বের পদও বিস্ময়করভাবে দেওয়া হয়। মানুষের মনে গভীর হতাশার সৃষ্টি হয়।

কিন্তু অকস্মাৎ একটি মস্ত সুযোগ আসে। একটি মামলার বিচার করতে গিয়ে হাইকোর্ট জিয়া ও এরশাদের ক্ষমতা গ্রহণ এবং তাদের আনীত পঞ্চম ও অষ্টম সংশোধনীকে বেআইনী ও সংবিধান বিরোধী বলে আখ্যায়িত করা হয়। হাই কোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করা হলে উভয়পক্ষের শুনানীর পর সুপ্রিম কোর্ট হাই কোটের রায় বহাল রাখেন।

সংবিধান বিশেষজ্ঞরা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতাশ্রয়ী সকল মহল উৎসাহিত। জামায়াতের নেতা-কর্মীরা সারা দেশেই অফিস ছেড়ে ভয়ে আত্মগোপনে চলে যায়। সংবিধান বিশেষজ্ঞরা সরকারকে উপদেশ দেন, “অবিলম্বে ঐ রায়ের মর্মানুযায়ী চতুর্থ ও অষ্টম সংশোধনী বাতিল করা হলো” মর্মে একটি গেজেট ও প্রজ্ঞাপন জারী করা হোক।

কিন্তু না, তা করা হলো না। উল্টো সংসদে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে পঞ্চদশ সংশোধনী এনে ওই দুটি বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শের পরিপন্থী সংশোধনীকে বৈধতা ও স্থায়ীত্ব প্রদান করা হয়। বলা হয় ধর্মনিরপেক্ষতাও থাকবে-রাষ্ট্রধর্ম ইসলামও থাকবে। এভাবেই বাহাত্তরেরে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিদানকে বদলে দিয়ে বাংলাদেশকে রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে কার্যত “ইসলামী রাষ্ট্র” বানানো হয়েছে।

পুলকিত হয়েছে জামায়াতে ইসলামীসহ সকল সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধ শক্তি-ক্ষুব্ধ ও হতাশ হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের আদর্শিক চেতান সমৃদ্ধ ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী কোটি কোটি অসাম্প্রদায়িক মানুষ। অথচ এই নেতৃত্ব প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন বাহাত্তরের মূল সংবিধান অবিকল পুনরুজ্জীবিত করতে।

বাড়তি যা পাওয়া গেল তা হলো আল্লামা শফি হুজুরকে এবং তাঁর ঘোরতর সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী “হেফাজতে ইসলাম”। এরা প্রাকশ্যে সরকার উৎখাতের আহবান জানিয়ে এক বিশাল সমাবেশে ঢাকায় বলেছিল, হাসিনা সরকার ইসলাম বিরোধী সরকার-তাকে উৎখাত করা হবে। কিছুকাল ধরপাকড় চললো কিন্তু কিছুদিন পরেই সব ঠাণ্ডা। শফি হুজুর সরকারের বন্ধু। তার দাবীতে (এক) পাঠ্যপুস্তক থেকে হিন্দু লেখকদের লেখা গল্প প্রবন্ধ কবিতা বাদ দিয়ে সাম্প্রদায়িক মুসলিম লেখকদের লেখা পাঠ্যপুস্তকের অন্তর্ভূক্ত করা হলো; (দুই) মাদ্রাসা শিক্ষার সর্বোচ্চ ডিগ্রীকে সাধারণ শিক্ষার বিশ্ববিদ্যালয়য়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রীর সমতুল্য হবে বলে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করলেন এবং (তিন) হেফাজতের হুঁশিয়ারীতে বঙ্গবন্ধুর জন্ম শত বার্সিকী অনুষ্ঠাণ।

অনুষ্ঠানমালায় বঙ্গবন্ধুর একটি বিশাল ভাস্কর্য নির্মাণের পরিকল্পনা সরকার চুপিসারে বাতিল করে দেয় এবং (চার) অতঃপর সরকার এ যাবত আর কোন ভাস্কর্য নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে নি। শফি হুজুর বেআইনীভাবে নারী-পুরুষের সমমর্যাদার বিরুদ্ধে-নারী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ ও চাকুরি ব্যবসা-বানিজ্যে প্রবেশের বিরোধিতা করলেও তাকে এ ব্যাপারে সরকার কোন নিষেধাজ্ঞা দেয় নি। উল্টো হজম করা হচ্ছে জামায়াত-হেফাজত পরিকল্পনা এবং তাদের দ্বারা সংঘটিত অসংখ্য সাম্প্রদায়িক সহিংস ঘটনা ঘটা সত্বেও সরকার নির্বিকারই শুধু নয়, যারা তাদের সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা করেছে তাদেরকে সরকার গ্রেফতার করে জেলে পুরেছে। এসব সহিংস ঘটনায় ক্ষমতাসীন দলের একাংশেরও অংশগ্রহণ ছিল বলে সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরে জানা যায়। সে সব খবরের কোন প্রতিবাদ হেফাজত বা সরকারি দল করে নি।

সংবিধানের সাম্প্রদায়িকীকরণ এবং মাঠে ও রাজপথে জামায়াত-হেফাজতিদের তান্ডব দেশে সাম্প্রদায়িকতা।

হিন্দু নির্যাতন দীর্ঘকাল ধরেই দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বিঘ্নে হিন্দু নির্যাতন ঘটেই চলেছে। গ্রামকে গ্রাম আক্রমণ, বাড়ীঘর ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান লুটপাট, মন্দির-বিগ্রহ ভাঙচুরের অসংখ্য ঘটনার সংবাদপত্রের পৃষ্ঠায় ছাপাত হচ্ছে। হিন্দু ঘরের মেয়েদের উপরও নানা জাতীয় নির্যাতন চালানো নতুন কোন ঘটনা নয়। ইদানীং বেশ কয়েকজন প্রবীন ও জনপ্রিয় হিন্দু শিক্ষক-অধ্যাপক নির্যাতনের ফলে একজন প্রাণ হারিয়েছেন ও বাদ-বাকীরা অবমাননাকর ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন ছাত্র-শিক্ষক-পুলিশ ও প্রশাসনের সামনেই। কেউ এমন হামলা ঠেকাতে এগিয়ে আসেন নি। ফলে হামলাকারীরা আরও বেশী সাহস পেয়েছে-নতুন নতুন ঘটনা ঘটাতে উৎসাহিত হয়েছে।

এবার জন-গণনার ফল প্রকাশিত হওয়ায় জানা গেল হিন্দু জন সংখ্যার বিস্তর হ্রাসের খবর। এটা উপরে বর্ণিত হিন্দু নির্যাতনের পরিণতি।

খ্রিস্টানে নির্যাতন দু’চারটি ঘটনা তুলে ধরছি:

এক. ২০১৬ খৃস্টাব্দে ২২ মার্চ দুর্বৃত্তদের অস্ত্রের আঘাতে মর্মান্তিভাবে মৃত্যুবরণ করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ধর্মান্তরিত হোসেন আলী। সেদিন প্রাতঃভ্রমণে বের হওয়া হোসেন আলীকে দৃর্বুত্তরা মোটর সাইকেলযোগে এসে কুপিয়ে হত্যা করে এবং নিরাপদে ফিরেও যায়।
দুই. জুলাই এর ৮ তারিখে সন্ধ্যায় কথা হচ্ছিল প্যাষ্টর ডিমোথি বাড়ৈ এর সাথে। তিনি রুদ্ধ কণ্ঠস্বরে জানা, বিগত ৫ জুলাই গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়া বাগদা বাজারে তিনি বাজারে দোকানদার মোর্শেদের সঙ্গে প্রভু যীশুর বিষয়ে আলাপের লক্ষ্যে উপস্থিত হলে দোকানদার মোর্শেদ স্থানীয় দু’জন মসজিদের ইমাম সাহেবকে বিষয়টি অবহিত করেন। অবশ্য ইতিপূর্বে ১ জুলাই শুক্রবার তিনি দোকানদার মোর্শেদ ও স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্যের উপস্থিতিতে প্রভু যীশুর ভালবাসা ও তার কাছে যাবার পথ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করেছিলেন। সেদিন মোর্শেদের দোকানে উপস্থিত হওয়ার সঙ্গে লোকজন জড়ো হতে থাকে।  ইমাম সাহেব আসার পরই তাকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়েই প্যাস্টির তিমোথিকে স্যাণ্ডেল খুলে উত্তম মধ্যম দিতে শুরু করে। ইমাম সাহেবের দেখাদেখি উৎসুক জনতাও তাঁকে চরমভাবে মারধর, হেনস্তা ও অপদস্থ করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত ইমাম সাহেব  সবার সামনেই প্যাস্তরকে জুতার মালা পরিয়ে চরমভাবে অপমান করা হয় অপর একজন প্যাস্তর প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। তিনি দৌড়ে গিয়ে এলাকার প্রধানকে জানালে তিনি থানাকে অবহিত করেন। পুলিশ এসে তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়।

তিন. পল্লী চিকিৎসক ফজল সরকার, ফিলিপ ও তার পরিবার বিগত ৩ জুন, ২০২২ সকাল ৮টায় স্থানীয় মো. হাসেম আলী তার দলবল নিয়ে খৃস্ট ধর্মাবলম্বী ডা. ফজলু সরকার ফিলিপের বাড়ীতে হামলা চালায়। ঘটনাটি ঘটেছে কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলায়। ১৯৭৫ খৃস্টাব্দ থেকে খৃষ্টান ধর্মের অনুসারী ডা.ফজল সরকার ফিলিপ ও তার পরিবারের দেশীয় লাঠিসোটা এবং অন্যান্য অস্ত্রাদি নিয়ে হামলায় পরিবারের সদস্যগণ সেলিম সরকার, সুমি সরকার, লাবনী সরকার, শিল্পী সরকার, ইমাবান আলী, রফিকুল ইসলাম গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। জানা যায়, উক্ত হাসেম আলী দীর্ঘদিন ধরে খৃষ্ট ধমাবলম্বী ডা. ফিলিপের বাড়ী ও জমি দখলের পাঁয়তারা করে আসছিল।

চার. কুষ্টিয়ার দৌলতপুর শেরপুরের জেবান আলী একজন খৃষ্ট ধর্মাবলম্বী। স্থানীয় চার্চ দ্বারা প্রভু যিশু মুক্তিদাতা ও উদ্ধারকর্তা হিসেবে গ্রহণ করেন। বিগত ৬ জুন, ২০২২ ভারতের বিতর্কিত বিজেপি নেত্রী নূপুর শর্মার বিষয়ে ফেসবুকে লাইক দিলে ওই দিনই স্থানীয় মুসুল্লিরা সদলবলে জেবান আলীর পরিবার, ঘরবাড়ি ভাংচুর করে।

এ জাতীয় অসংখ্য ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই বাংলাদেশের কোথাও না কোথাও ঘটেই চলেছে বঙ্গবন্ধু-তোমার রেখে যাওয়া বাংলাদেশে। এমন অসহনশীলতা ধর্মের নামে অতীতে কদ্যপি ছিলো না বাংলাদেশে। তুমি স্বয়ং তার সাক্ষী। কারণ হেফাজত ছিলো না-জামায়াতও ছিল অত্যন্ত দুর্বল। তখনও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা অনেক ঘটেছে কিন্তু তখনকার আওয়ামী লীগ মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ও বামপন্থী ছাত্র ইউনিয়ন, যুবলীগ প্রভৃতি সংগঠনের নেতা-কর্মীরা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে হাজারো মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে মিছিল বের করতেন। মিছিল দেখে দাঙ্গাকারীরা ভয়ে পালিয়ে যেত-রক্ষা পেত হিন্দুদের জীবন, বাড়ীঘর ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান।

কিন্তু আজকের আওয়ামী লীগ? তখন তো বঙ্গবন্ধু তোমার আওয়ামী লীগ ছিল বিরোধী দল এবং অপরাপর সমমনা বিরোধী দলের কর্মী ও নেতারা মিছিল করে দাঙ্গা থামাতে পারতেন কিন্তু আজকের আওয়ামী লীগ একটানা বহুদিন ক্ষমতায় এবং তোমার নাম ব্যবহার করেই দলটি চলছে। এখন তাদের হাতে বিশাল ছাত্রলীগ, যুবলীগ, যুব মহিলা লীগ, কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগ, পুলিশ, র‌্যাব, মিলিটারী অঢেল টাকা প্রভৃতি। কিন্তু দলটি দাঙ্গার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থাগ্রহণ করে না-দাঙ্গাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে তাদেরকে শাস্তি দেয় না-বরং ভূক্তভোগী কাউকে কাউকে ডিজিটাল আইনে জেলে আটক করে রেখে দেয়। ফলে সন্ত্রাসীরা উৎসাহিত হয় ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা হতাশায় মুষড়ে পড়ে।

আজ প্রতিদিন প্রায় ৪০ জন সড়ক, রেল ও অপরাপর দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন। নারী জীবন চরম অনিশ্চিত। বিশেষ করে বিবাহিত-অবিবাহিত যুবতীদের পথ চলা আজ আর সামান্যতম নিরাপদ নয়-নিরাপদ নয় তাদের পক্ষে বাসে, ট্রেনে বা স্কীমারে চলাফেরা-তা রাতেই হোক বা দিনেই হোক।

বঙ্গবন্ধু আজ পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে-সমাজতন্ত্র পরিত্যক্ত যদিও মুক্তিযুদ্ধের প্রতিশ্রুতি ছিল সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার তোমার, মওলানা ভাসানীর, কমরেড মনি সিংহের ও অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের সম্মিলিত অঙ্গীকার ছিল সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা।
কিন্তু যা উন্নয়ন ঘটছে তা চোখ ঝলসানো হলেও তা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কল্যাণে কাজে লাগছেনা। বরং ওই সব মেগা উন্নয়ন প্রকল্প হাজার হাজার কোটিপতি ও কালো টাকার মালিকের জন্ম দিচ্ছে।

তোমার স্বপ্নের বাংলাদেশে আজ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য আকাশচুম্বি। দু’বেলা পেট পুরে খাওয়া দরিদ্র জনগোষ্ঠির জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

এমন একটি বাংলাদেশ তো তোমার বা সংগ্রামী বাঙালি জাতির কাম্য ছিল না।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

BSH
Bellow Post-Green View