কুয়াকাটার বন রক্ষায় বাঁশের বেষ্টনী, ভাঙন ঠেকাতে নতুন উদ্যোগ

ছবি : সংগৃহীত
পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটা সৈকতে সাগরের অব্যাহত ভাঙনে হুমকির মুখে পড়েছে সংরক্ষিত বনাঞ্চল, ম্যানগ্রোভ বন ও জীববৈচিত্র্য। গত ১৬ বছরে কুয়াকাটা জাতীয় উদ্যানসহ সংরক্ষিত বনাঞ্চলের এক হাজার হেক্টরের বেশি বনভূমি সাগরে বিলীন হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবার বাঁশ, কাঠের খুঁটি ও গাছের ডালপালা দিয়ে পরিবেশবান্ধব প্রতিরোধক বেষ্টনী নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জাপান সরকারের আর্থিক সহায়তায় পরীক্ষামূলকভাবে কুয়াকাটার গঙ্গামতি ও বরগুনার টেংরাগিরী সৈকতে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য ঢেউ ও জোয়ারের পানির গতিবেগ কমিয়ে বেষ্টনীর ভেতরে পলি জমার পরিবেশ তৈরি করা। পরে সেখানে ম্যানগ্রোভসহ স্থানীয় উপযোগী গাছ লাগিয়ে উপকূলের মাটি ধরে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

উপকূলীয় বন বিভাগের পটুয়াখালী কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে কুয়াকাটার সৈকতসংলগ্ন এলাকায় প্রায় এক হাজার একর জমিতে ঝাউবাগান গড়ে তোলা হয়। ২০১০ সালে কুয়াকাটাকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়। তবে ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর থেকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সামুদ্রিক ঢেউয়ের আঘাতে বনাঞ্চলে ভাঙন বাড়তে থাকে। একসময় ঐতিহ্যবাহী ফয়েজ কোকোনাট ফার্মের বিশাল নারকেল বাগানসহ সৈকতের কয়েক কিলোমিটার এলাকার অসংখ্য গাছ ও বালুচর সাগরে বিলীন হয়ে যায়। বর্তমানে কুয়াকাটায় প্রায় ৬০০ হেক্টর বনভূমি রয়েছে।
১৯৯৮ সালে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে ঘোষণার পর কুয়াকাটা দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে পরিচিতি পেতে শুরু করে। পর্যটনের বিকাশে হোটেল-মোটেলসহ বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠলেও সাগরের ভাঙনে ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে সৈকত ও সংলগ্ন বনাঞ্চল। ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়া হলেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।
নতুন উদ্যোগের অংশ হিসেবে গঙ্গামতি সৈকতের ভাঙনকবলিত এলাকায় সারি সারি বাঁশের খুঁটি পুঁতে আড়াআড়িভাবে বাঁশ দিয়ে ফাঁকযুক্ত বেষ্টনী তৈরি করা হয়েছে। একইভাবে বরগুনার টেংরাগিরীতেও প্রতিরোধক নির্মাণ করা হচ্ছে। এসব বেষ্টনী জোয়ারের পানির প্রবাহ ও ঢেউয়ের গতি কমিয়ে পলি জমতে সহায়তা করবে। পরবর্তী সময়ে গাছপালা জন্মালে সেগুলোর শিকড় মাটি আঁকড়ে ধরে উপকূলকে স্থিতিশীল রাখতে ভূমিকা রাখবে।

‘প্রকৃতিনির্ভর বন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উপকূলীয় অঞ্চলের সহনশীলতা বৃদ্ধিকরণ’ শীর্ষক পাইলট প্রকল্পের আওতায় এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকার (জাইকা) সংশ্লিষ্ট এ প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৯ সালের মার্চ পর্যন্ত। গঙ্গামতি সৈকতে ৬০ মিটার এবং টেংরাগিরী সৈকতে ৮০ মিটার এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে প্রতিরোধক নির্মাণ করা হচ্ছে।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এ প্রযুক্তিতে ঢেউয়ের গতি কমানোর পাশাপাশি নতুন ভূমি গঠনের পরিবেশ তৈরি হতে পারে। সেখানে ম্যানগ্রোভসহ স্থানীয় গাছপালা বেড়ে উঠলে মাটি ধরে রাখার পাশাপাশি মাছ, কাঁকড়া ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর আবাসস্থল তৈরি হবে। এতে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের সুযোগ বাড়বে। অন্যদিকে কংক্রিটের স্থায়ী প্রতিরোধক কাঠামোর তুলনায় স্থানীয় উপকরণ ব্যবহারে নির্মাণব্যয়ও কম হতে পারে।
পাউবোর কলাপাড়া কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহ আলম বলেন, কুয়াকাটা সৈকতের ভাঙন প্রতিরোধে তারা কাজ করছেন। তবে জাইকার সহায়তায় বাঁশ, কাঠের খুঁটি ও গাছের ডালপালা দিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে নির্মিত প্রতিরোধকের কার্যকারিতা সম্পর্কে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়।
উপকূলীয় বন বিভাগের পটুয়াখালীর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. মো. জাহিদুর রহমান বলেন, স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করে স্বল্প ব্যয়ে পরিবেশবান্ধব এ প্রতিরোধক নির্মাণ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে এর সুফল দেখা যাচ্ছে। প্রযুক্তিটি সফল হলে উপকূলীয় বনভূমি রক্ষার পাশাপাশি ভাঙন কমানো, নতুন জেগে ওঠা চর উঁচু করা এবং মানুষের জানমাল সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এতে উপকূল রক্ষার কর্মসূচিতে সরকারের বিপুল অর্থ সাশ্রয় হতে পারে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।



