রবিবার (৭ জুন) ছিলো বাংলাদেশের অন্যতম সেরা সুরকার, সংগীত পরিচালক ও গায়ক লাকী আখান্দের জন্মদিন। সফট-মেলোডি, মেলো-রক, হার্ড-রক যে ধরনের গানেই হাত দিয়েছেন সেটাই হয়ে উঠেছে অতুলনীয়।
তার সৃষ্টি মূর্ত হয়ে আছে লাকী আখান্দ (১৯৮৪) পরিচয় কবে হবে (১৯৯৮), বিতৃষ্ণা জীবনে আমার (১৯৯৮), আনন্দ চোখ (১৯৯৯), আমায় ডেকোনা (১৯৯৯), দেখা হবে বন্ধু (১৯৯৯)-এ। নিজের কণ্ঠে গাওয়ার পাশাপাশি তার সুরে হৃদয় চেরা গান করেছেন কুমার বিশ্বজিৎ, সামিনা চৌধুরী, জেমস, হাসান প্রমুখ।
কিংবদন্তী এই শিল্পীর জন্মদিনে রবিবার একটি দীর্ঘ পোস্ট দিয়ে স্মরণ করেন প্রখ্যাত গীতিকার আসিফ ইকবাল। লাকী আখান্দকে নিয়ে শুরুতেই তিনি বলেন,“আগাগোড়া নিখাঁদ শিল্পী। কালজয়ী। কথা বলতেন খুব কম। তাঁর সবকিছুর মধ্যেই ছিলো দারুণ স্মার্টনেস। অকুতোভয় এ মুক্তিযোদ্ধা দেশকে ভীষণ ভালোবাসতেন।”
বহু জনপ্রিয় গানের এই গীতিকার আরো বলেন,“অসাধারণ সৃষ্টিশীল ছিলো তাঁর গানের সুর। গলাটা ছিলো অন্যরকম ভরাট। খেয়ালী তো ছিলেনই। বিত্ত তাঁকে কখনো টেনেছে বলে মনে হয়নি। গানই করেছেন পুরো জীবনে- আর কিছু নয়। এমন মেধা, এমন প্রতিভা বিরল। অন্য দেশ হলে তাঁকে হয়তো মাথায় তুলে রাখতো। হয়ে যেতো তাঁর জীবন আর কাজ নিয়ে বড় বড় গবেষণা। হয়তো একদিন আমাদের দেশেও হবে এমন।”
এস এম হেদায়েতের লেখা ‘এই নীল মণিহার’, কাওসার আহমেদ চৌধুরীর লেখা ‘আমায় ডেকো না’, নুরুল হুদার লেখা ‘আগে যদি জানতাম’ এ রকম অসংখ্য জনপ্রিয় গানের শিল্পী লাকী আখান্দ- বলেও জানান আসিফ ইকবাল।
লাকী আখান্দের ক্যারিয়ার নিয়ে এই গীতিকার বলেন,“আশির দশকের তুমুল জনপ্রিয় লাকী ভাই ছিলেন একাধারে সঙ্গীত পরিচালক, সুরকার ও গীতিকার। ১৯৮৪ সালে সারগামের ব্যানারে প্রথমবারের মতো একক অ্যালবাম বের করেন তিনি। ওই অ্যালবামের ‘এই নীল মণিহার’, ‘আমায় ডেকো না’, ‘রীতিনীতি জানি না’, ‘মা মনিয়া (গীতিকবি নুরুল হুদা)’, ‘আগে যদি জানতাম’ গানগুলো শ্রোতাদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলে। তাঁর সুর করা কাওসার আহমেদ চৌধুরীর লেখা কুমার বিশ্বজিতের যেখানে সীমান্ত তোমার, ও সামিনা চৌধুরীর কণ্ঠে ‘কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে রাতের নির্জনে’, নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর কন্ঠে ‘আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে’, গোলাম মুর্শেদের লেখা জেমসের কণ্ঠে ‘লিখতে পারি না কোনো গান আজ তুমি ছাড়া’, আইয়ুব বাচ্চুর ‘কী করে বললে তুমি’, এস এম হেদায়েতের লেখা ছোটভাই হ্যাপীর কণ্ঠি ‘আবার এলো যে সন্ধ্যা’, ‘তুমি কি দেখেছ পাহাড়ি ঝর্ণা’,‘ ফেরদৌস ওয়াহিদের কণ্ঠে ‘মা মনিয়া’, ‘ও বিড়ালের ছানা’ গানগুলো তিনি বেঁচে থাকতেই কালোত্তীর্ণ গানের মর্যাদা পেয়েছে।”
১৯৮৭ সালে ছোট ভাই হ্যাপী আখান্দের মৃত্যুর পর সংগীতাঙ্গন থেকে অনেকটাই স্বেচ্ছা নির্বাসন নিয়েছিলেন গুণী লাকী আখান্দ- এমনটা জানিয়ে আসিফ ইকবাল বলেন,“মাঝখানে প্রায় এক দশক নীরব থেকে ১৯৯৮-এ ‘পরিচয় কবে হবে’ ও ‘বিতৃষ্ণা জীবনে আমার’ অ্যালবাম দুটি নিয়ে আবারও শ্রোতাদের মাঝে ফিরে আসেন লাকী আখান্দ।”
লাকী আখান্দের ব্যক্তিগত জীবনের কথা উল্লেখ করে এসময় আসিফ ইকবাল বলেন,“এরপর আবার স্বেচ্ছা নির্বাসন। ব্যক্তিগত জীবনের নানা টানাপোড়েন তো ছিলোই। ছিলো তুমুল অভিমান। তবু সব ছাপিয়ে তাঁর গানে রেখে গেছেন অবাক করা আভিজাত্য।”
কিংবদন্তী এই শিল্পীর সাথে নিজের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে আসিফ ইকবাল বলেন,“আমার পরম সৌভাগ্য আমি ছিলাম তাঁর অতি স্নেহধন্য। তাঁর সাথে আমার মাত্র দু’টো গান – কুমার বিশ্বজিতের কণ্ঠে ‘তারা ভরা রাত’ আর ‘বলনা তুমি ছাড়া কে আছে আমার’ কিন্তু কেন জানি আমার, আমার স্ত্রী ও বাচ্চাদের তিনি অনেক অনেক পছন্দ করতেন। তাঁর এ ভালোবাসা বুকে ধরেই কেটে যাবে বাকী জীবন আমাদের।”

