আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসিকে নানা আঙ্গিক থেকেই বিশ্বসেরা বলা হচ্ছে। এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা, তর্ক-বিতর্ক হয় কমই। ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি পেলে, আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনা, পর্তুগাল কিংবদন্তি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর নাম সেরার আলোচনায় অবধারিতভাবেই আসে। নিজ নিজ সময়ে সাফল্যের ধারাবাহিকতা, পারফরম্যান্সের উজ্জ্বলতায় তারা প্রত্যেকে মহিমান্বিত, ‘সর্বকালের সেরা’র তর্ক-আলোচনার তাই শেষ নেই!
ক্লাব পর্যায়ে মেসির সাফল্য একটা সময় জাতীয় দলের তুলনায় অনেকবেশি ছিল। বিভিন্ন সময়ে মেসি ভিন্ন ভিন্ন কোচের অধীনে খেলেছেন। তাকে ক্লাব পর্যায়ে সবার চেয়ে এগিয়ে দিয়েছেন যে কোচ, তিনি পেপ গার্দিওলা। এরপর মেসি জাতীয় দলের হয়েও সাফল্যের ভাণ্ডার পূর্ণ করে তুলেছেন। তাতে আর কেউ নন, আর্জেন্টিনা দলের কোচ লিওনেল সেবাস্তিয়ান স্কালোনি রেখেছেন বড় ভূমিকা।
আর্জেন্টিনার কোচ হওয়ার আগে জাতীয় দলে মেসির সাফল্য ছিল খুবই কম। মেসি-ডি মারিয়ারা কয়েকবার বড় কয়েকটি শিরোপার কাছাকাছি গিয়ে খালি হাতে ফিরেছেন। স্কালোনি কোচ হয়ে আসার পর মেসির সাফল্যের পাল্লা শুধু ভারিই হয়নি, আর্জেন্টিনা দলকে ধরা দিয়েছে টানা চারটি শিরোপা। মেসিকে ঘিরে যেমন সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়ের আলোচনা তুঙ্গে, এবার তাহলে কোচ লিওনেল স্কালোনিকেও সর্বকালের সেরা কোচদের একজন বলা যাবে কিনা সেই আলোচনা শুরু হয়েছে।
প্রথমে শুরু করা যাক স্কালোনির ব্যক্তিগত পরিচয় দিয়ে। আর্জেন্টিনার সান্টা ফে প্রদেশের পুজাতো শহরে ১৯৭৮ সালে জন্ম এ হাইপ্রোফাইল কোচের। অবশ্য তার ইতালির মতো দেশের দ্বৈত নাগরিকত্বও আছে। কারণ স্কালোনির পূর্বপুরুষরা ইতালির আসকেলি পিচেনো অঞ্চলের বাসিন্দা ছিলেন। ৩১ বছর বয়সে স্কালোনি স্প্যানিশ নাগরিক এলিসা মন্টেরোকে বিয়ে করেন। তাদের দুই সন্তান আছে। স্কালোনি ও বড় ভাই মুরিও দেপোর্তিভোয় খেলতেন। ২০২৪ সালে তার জন্মস্থান পুজিতোতে এক সড়কের নামকরণ করা হয় ‘স্কালোনি সড়ক’ হিসেবে।
খেলোয়াড়ি জীবনে আর্জেন্টিনা দলে রাইটব্যাক পজিশনে খেলেছেন, প্রয়োজনে মিডফিল্ডারের দায়িত্বও পালন করেছেন। ১৯৯৫-৯৬ মৌসুমে আর্জেন্টাইন প্রিমেরা ডিভিশনে অর্থাৎ স্বদেশি ক্লাব নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজের হয়ে ক্লাব ফুটবলে যাত্রা শুরু করেন। পরের মৌসুমে খেলেছেন আরেক ক্লাব এস্তাদিয়ান্তেসের হয়ে। ১৯৯৮-২০০৬ সাল পর্যন্ত স্প্যানিশ ক্লাব দেপোর্তিভো লা করুনার হয়ে সাড়ে আট বছর খেলেছেন। এসময় লা লিগার কোপা ডেল রে শিরোপা জেতেন। ২০০৬ মৌসুমে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের দল ওয়েস্টহ্যামে ধারে খেলেছেন। ওই মৌসুমে দলকে এফএ কাপের ফাইনালে তুলতে সাহায্য করেছিলেন। তার দল পেনাল্টি শুটআউটে লিভারপুলের কাছে শিরোপা হারিয়েছিল। লা লিগার রেসিং সান্তাদার, মায়োর্কা ছাড়াও ২০০৭-১৩ পর্যন্ত ইতালিয়ান লিগ সিরি আর দল লাৎসিও এবং ২০১৩-১৫ মৌসুম পর্যন্ত আটালান্টার হয়ে খেলে ক্লাব ক্যারিয়ার শেষ করেন স্কালোনি।

বয়সভিত্তিক জাতীয় দল দিয়ে আর্জেন্টিনার হয়ে অভিষেক স্কালোনির। ১৯৯৭ সালে আর্জেন্টিনা অনূর্ধ্ব-২০ দলে অভিষেকের পর ওই বছরই মালয়েশিয়ায় হওয়া অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জেতেন। প্রথম থেকে বিশ্বজয়ের অভ্যাস শুরু হলেও জাতীয় দলে খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি ৪৮ বর্ষী স্কালোনি। ২০০৩ সালের ৩০ এপ্রিল লিবিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচের মাধ্যমে অভিষেক হয় জাতীয় দলে, ২০০৬ সাল পর্যন্ত খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন। ২০০৬ সালে জার্মানিতে হওয়া বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা দলের চমক ছিলেন স্কালোনি। কারণ তিনি জায়গা পেয়েছিলেন অভিজ্ঞ হাভিয়ের জানেত্তির বদলে। জাতীয় দলের হয়ে স্কালোনির খেলা মোট ৭ ম্যাচে কোন গোলের দেখা নেই। অনূর্ধ্ব-২০ দলেও ৭ ম্যাচ খেলেছেন, করেছেন দুটি গোল। ক্লাব পর্যায়ে মোট ৩৮৭ ম্যাচ খেলে গোল করেছেন ২৩টি। স্কালোনির খেলোয়াড়ি জীবন তেমন উজ্জ্বল হয়নি, সেই উজ্জ্বলতা প্রকাশ পেয়েছে কোচিং ক্যারিয়ারে। একে একে সাফল্য যুক্ত হয়েছে পালক; যার ধারাবাহিকতা এখনও চলছে। যা দেখা যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা বিশ্বকাপে।
স্কালোনি ২০১৫ সালে বুটজোড়া তুলে রাখেন লকারে, ২০১৬ সালেই তাকে দেখা যায় ডাগআউটে। অবশ্য হেড কোচ নয়, স্প্যানিশ ক্লাব সেভিয়ার হেড কোচ আর্জেন্টাইন হোর্হে সাম্পাওলির সহকারী হিসেবে। ওই বছরের জুনে সাম্পাওলি আর্জেন্টিনা দলের বস হন, সহকারি হিসেবে ডাক পড়ে স্কালোনির। ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে শেষ ষোলোয় ফ্রান্সের কাছে হেরে আসর থেকে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা, বিদায় নেন সাম্পাওলি। বছর শেষ করা পর্যন্ত স্কালোনি ও পাবলো আইমারকে অন্তর্বর্তীকালীন কোচের দায়িত্ব দেয় আর্জেন্টাইন ফুটবল ফেডারেশন (এএফএ)। নভেম্বরে স্কালোনিকে ২০১৯ সালের জুনে হতে চলা কোপা আমেরিকার আসর পর্যন্ত হেড কোচ হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়। তার নিয়োগ নিয়ে প্রচুর সমালোচনা হয়েছিল। ‘ট্রাফিকও’ সামলাতে পারবেন না এমন মন্তব্য করেছিলেন কিংবদন্তি ম্যারাডোনা। পরের গল্প সবারই জানা।
আর্জেন্টিনার হেড কোচ হয়ে স্কালোনি প্রথম অ্যাসাইনমেন্টে যান ব্রাজিলে হওয়া কোপা আমেরিকায়। তার দল ওই আসরে তৃতীয় হয়, শুরু হয় আবারও সমালোচনার ঝড়। তবে এএফএ তার পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট হয়ে ২০২২ পর্যন্ত চুক্তির মেয়দা বাড়ায়। এবারের গল্পটা ভিন্ন, স্কালোনি ও আর্জেন্টিনার জন্য মধুর, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা আর্জেন্টাইন সমর্থকদের জন্য সোনার হরিণ পাওয়া। ২০২১ সালে আবারও ব্রাজিলে হওয়া কোপা আমেরিকায় ১৯৯৩ সালের পর শিরোপা জেতে আর্জেন্টিনা। ২৮ বছর পার করে লা আলবিসেলেস্তেদের শিরোপা জেতার মাধ্যমে স্কালোনির সাফল্য যাত্রা শুরু হয়, শুরু হয় ‘স্ক্যালোনেটা’ যুগ। ওই বছরের নভেম্বরে ‘দ্য বেস্ট ফিফা ফুটবল কোচ’র তালিকায় নাম উঠলেও সেরা তিনে আসতে পারেননি। ২০২২ সালের জুনে ‘লা ফিনালিস্সিমা’র শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে হারান ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে। ক্যারিয়ারের সাফল্যে যুক্ত হয় দ্বিতীয় পালক।
চমকের বাকি তখনও, মাত্র দুই ম্যাচের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন কোচ দায়িত্ব পাওয়া স্কালোনির হাত ধরে বিশ্বকাপ শিরোপা আসবে হয়তো আর্জেন্টাইনরাও চিন্তা করেনি! সেই অসাধ্য সাধন করেছেন এ কোচ, রূপকথায় হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার পেছনে লাইন ধরা ইঁদুরের মতো শিরোপাও যেন লাইন ধরেছে স্কালোনির পেছনে। কিছুতেই পিছু ছাড়বে না! কাতার বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে হার দিয়ে শুরু। আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি আলবিসেলেস্তেদের। ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই টানটান উত্তেজনা, আবেগ আর দুশ্চিন্তার মুক্তি দিয়ে, ম্যারাডোনার পর বিশ্বকাপের শিরোপা ওঠে মেসির হাতে। ৩৬ বছর পর বিশ্বজয়ের পথ দেখান স্কালোনি। ১৯৭৮ সালের পর সবচেয়ে কম বয়সী এবং বিশ্বের মধ্যে চতুর্থ কমবসয়ী কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ড গড়েন তিনি। ওই বছর ‘ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব ফুটবল হিস্ট্রি অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিকস’র বিশ্বের সেরা পুরুষ জাতীয় কোচ হিসেবে স্বীকৃতি পান। পাশাপাশি ‘দ্য বেস্ট ফিফা মেনস কোচ’ হিসেবেও সম্মানিত হন। তার চুক্তির মেয়াদ বাড়ে ২০২৬ সাল পর্যন্ত।

২০২৪ সালে স্কালোনি কোপা আমেরিকার টানা দ্বিতীয় এবং রেকর্ড ১৬টি শিরোপা জয়ের কীর্তি গড়েন। ২০১৯-২০২২ সালের মধ্যে টানা ৩৬টি ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ড গড়ে তার দল, যা বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে দ্বিতীয় দীর্ঘতম অপরাজিত থাকার রেকর্ড। স্কালোনির অধীন এপর্যন্ত আলবিসেলেস্তেরা ১০৩ ম্যাচ খেলে ৮০টিতে জয় পেয়েছে, ড্র করেছে ১৪টিতে, হেরেছে মাত্র ৯ ম্যাচে। তার জয়ের হার ৭৭.৬৭ শতাংশ। এ পর্যন্ত স্কালোনি বিশ্বমঞ্চে আর্জেন্টিনাকে ৬টি প্রতিযোগিতায় খেলিয়েছেন, জিতেছেন ৪টিতে, তৃতীয় হয়েছেন একটিতে, আরেকটি বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলবেন আজ রাতে।

আর্জেন্টিনার ইতিহাসে স্কালোনির চেয়ে গুইলের্মো স্তাবিল কোচ হিসেবে বেশি ৬টি শিরোপা জিতেছেন, যা রেকর্ড, ছয়টিই কোপা আমেরিকার শিরোপা। ১৯৩৯-১৯৫৮ পর্যন্ত, তবে বিশ্বকাপ শিরোপা ছিল না তার। কোচ হিসেবে স্কালোনির চেয়ে কিছুটা এগিয়ে আছেন ইতালির ভিত্তোরিও পোজ্জো, ১৯৩৪-৩৮ টানা দুটি বিশ্বকাপ পকেটে ঢুকিয়েছিলেন তিনি। ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশম বিশ্বকাপ, উয়েফা নেশনস লিগ, উয়েফা ইউরো জিতলেও কিছুটা পিছিয়ে থাকবেন। ভিসেন্তে দেল বস্ক, কার্লোস আলবার্তো পেরেইরা এবং মারিও জাগালোর নাম আসলেও স্কালোনির নাম সবার আগে আসবে সেরার কাতারে। এবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা বিশ্বকাপে স্পেনকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জিততে পারলে বলা যেতেই পারে সর্বকালের সেরা কোচের নামটি আর্জেন্টিনার স্কালোনি।







