ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মিনাবে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৬৫ জন শিশু শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। তবে এই ভয়াবহ প্রাণহানির পরও দেশটির সরকারবিরোধী শিবিরের একটি অংশ বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপকে সমর্থন জানিয়ে যাওয়ায় নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ বা ‘অপারেশন রোরিং লায়ন’ নামে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানজুড়ে ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে। অভিযানের লক্ষ্য ছিল ইরানের শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব। কিন্তু হামলার সবচেয়ে মর্মান্তিক প্রভাব পড়ে হরমুজগান প্রদেশের মিনাব শহরে। সেখানে শাজারাহ তাইয়্যেবাহ নামের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে আঘাত হানলে প্রায় ১৬৫ জন নিহত হয়, যাদের অধিকাংশই শিশু।
ঘটনার পর জাতিসংঘ, ইউনেস্কো এবং শান্তিতে নোবেলজয়ী মালালা ইউসুফজাইসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও ব্যক্তিত্ব তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। ইউনেস্কো একে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। শিশুদের ওপর হামলাকে অনেকেই যুদ্ধাপরাধের সামিল বলে উল্লেখ করছেন।
তবে এই বিপুল প্রাণহানির পরও ইরানের সরকারবিরোধী মহলে এক ধরনের বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদল বিক্ষোভকারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘যুদ্ধ নয়’ স্লোগান তুলে সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে শিশুদের মৃত্যুর প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। তাদের বক্তব্য, নিরীহ মানুষের প্রাণহানির বিনিময়ে কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন বা গণতন্ত্র টেকসই হতে পারে না।
অন্যদিকে, সরকারবিরোধী ও রাজতন্ত্রপন্থী গোষ্ঠীর একটি কট্টর অংশ এই হামলাকে প্রকাশ্যে বা পরোক্ষভাবে সমর্থন করছে। তাদের যুক্তি, চার দশকের বেশি সময় ধরে চলা বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাতে কঠোর সামরিক চাপ ছাড়া কার্যকর বিকল্প নেই। শিশু নিহতের ঘটনায় শোক প্রকাশ করলেও তারা মূল মনোযোগ দিচ্ছেন শাসকগোষ্ঠীর শীর্ষ নেতাদের লক্ষ্য করে চালানো হামলার দিকে। প্রবাসভিত্তিক এবং পশ্চিমা সমর্থিত কিছু বিরোধী নেতাও সামরিক অভিযানে সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ দেখছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, মিনাবের এই ট্র্যাজেডি শুধু মানবিক বিপর্যয় নয়, বরং ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথচলা নিয়ে বিরোধী শিবিরের গভীর আদর্শিক বিভাজনকেও সামনে এনেছে। একদিকে যুদ্ধবিরোধী মানবিক অবস্থান, অন্যদিকে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভরতার প্রশ্ন—এই দ্বন্দ্ব এখন আরও স্পষ্ট।
সব মিলিয়ে ব্যাপক প্রাণহানি, আন্তর্জাতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের মধ্যে ইরান এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে পড়েছে।







