বিনোদন

‘যেকোনো সম্পর্ক স্বার্থের কারণে ছুটে যেতে পারে কিন্তু টিকে থাকে শুধু বন্ধুত্ব’

১ আগস্ট বড়পর্দায় ‘উড়াল’ মুক্তির মধ্য দিয়ে নির্মাতা হিসেবে অভিষিক্ত হচ্ছেন জোবায়দুর রহমান

বন্ধুত্বের সম্পর্কের গুরুত্ব বোঝানো ছবি. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ

ছবিতে এক তরুণের হাসিমুখের সঙ্গে বিভিন্ন বয়সের মানুষের বন্ধুত্বের ছবি দেখানো হয়েছে।. Channel i News – চ্যানেল আই নিউজ

অডিও সংবাদএই খবরটি পডকাস্টে শুনুন

নতুন প্রজন্মের নির্মাতা জোবায়দুর রহমান। অভিনয়ের প্রতি ঝোঁক থাকলেও থিয়েটার থেকে ধীরে ধীরে চলে আসেন ক্যামেরার পেছনে। সহকারী পরিচালক হিসেবে যাত্রা শুরু, এরপর দীর্ঘ সাত বছর রানআউট ফিল্মসে কাজ করে নির্মাণশিল্পের ভেতরের জগতটা আত্মস্থ করেন। এবার নিজস্ব ভাষায় নিজের গল্প বলতে এলেন— প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘উড়াল’ নিয়ে, যা আগামি বন্ধু দিবস (৩ আগস্ট) উপলক্ষ্যে শুক্রবার (১ আগস্ট )মুক্তি পেতে যাচ্ছে। তার আগে ‘উড়াল’ এর নির্মাণ যাত্রা নিয়ে চ্যানেল আই অনলাইনের সাথে কথা বললেন এই তরুণ-

নির্মাণের সাথে আপনি কীভাবে কবে থেকে যুক্ত হলেন?
আমার নির্মাতা হওয়ার ইচ্ছা, আকাংখা কিংবা সম্ভাবনা কোনটায় কখনো ছিলনা। বাবা গায়ক বানাতে চেয়েছিলেন, গানের তালিমও নিয়েছি কিছুদিন কিন্তু বাবার কারণেই ছেড়েছি সেটা। কারণ ওই বয়সে অভিভাবক যা করতে বলবে তার উল্টোটা করতে হবে। পরবর্তীতে স্কুলে আমার এক বন্ধু আবিষ্কার করলো আমি ভালো অভিনয় করি। যার ফলশ্রুতিতে স্কুল থেকে কলেজ পর্যন্ত গান, কবিতা, অভিনয় এসব নিয়েই বেশি সময় পার করা হয়ে গেল। ক্লাসের পড়াশোনা কম। কিন্তু যে বন্ধুর অনুপ্রেণায় এসব সাংস্কৃতিক কার্যক্রম করে যাচ্ছিলাম সে একদিন আমাদের ছেড়ে চলে গেল। ঐযে অভিনয়ের ঝোঁক তৈরি হলো সেই তাড়না থেকে ইন্টারমিডিয়েট শেষ করেই দিনাজপুর থেকে ঢাকা। ঢাকা এসে থিয়েটার করতে শুরু করলাম। কারণ অভিনেতা হবো। মঞ্চে অভিনয় করেও যাচ্ছি কিন্তু অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা দেয়ার পর মনে হতে শুরু করলো জীবন কীভাবে চলবে? মুশকিল হলো আমাদের দেশে থিয়েটার করে পেট চলেনা কিংবা ক্যামেরার সামনে মাঝেমধ্যে দুই একটা ছোট চরিত্রে অভিনয় করেও রুটি-রুজির ব্যবস্থা করা কঠিন। তারপর মনে হলো- ক্যামেরার পেছনে কাজ শুরু করা যেতে পারে। এর মধ্যে রানআউট ফিল্মসের ‘সহকারি পরিচালক’ নিয়োগের একটা বিজ্ঞপ্তি দেখে আবেদন করলাম। ইন্টারভিউ দেয়ার কিছুদিন পর তারা আমাকে জয়েন করতে বললেন। তারপর থেকেই নির্মাণ প্রক্রিয়ার যাত্রা শুরু। সহকারি পরিচালক হিসেবে শুরুর দিকে মানিয়ে নিতে খুব ঝামেলা হচ্ছিলো কারণ ভেতরের অভিনয় সত্ত্বা কাটছিলো না। মাঝখানে একবার ছেড়েও দিয়েছিলাম। পরেরবার জয়েন করার পর ক্যামেরার পেছনের কাজে কী এক ঘোর তৈরি হলো! রানআউট ফিল্মসে ৭ বছর কাটিয়ে দিলাম। তারপর মনে হলো নিজে শুরু করা দরকার। ‘উড়াল’ নির্মাণের মধ্য দিয়ে পরিচালনায় অভিষেক ঘটাতে আসলাম।

বনজঙ্গলে বন্ধুত্বের দৃশ্য, যুবকরা আলোচনা করছে. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ তরুণ নির্মাতা হিসেবে আপনি যখন ‘উড়াল’ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন সবচেয়ে বেশি ভরসা রেখেছিলেন নিজের কোন গুণটার ওপর?
সততা এবং সাহস।

এই সিনেমার নির্মাণযাত্রায় এমন কোনো সময় কি এসেছিল যখন নিজেকেই প্রশ্ন করেছেন— ‘আমি পারব তো?’
প্রায়ই এসেছে। কিন্তু ‘পারব তো?’ – ধরনের শব্দ বা বাক্যকে পাত্তা দিতে চাইনি। কারণ, আমি যখন কোন কাজে যুক্ত হই তখন আমার সবটুকু দিয়েই সেই কাজে নিবিষ্ট থাকি। ওই কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমার অস্থির লাগে।

বৈঠক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীরা. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ নিজের প্রথম সিনেমার জন্য বন্ধুত্বের মতো বহুলপরিচিত একটি বিষয়কে বেছে নিলেন, কেন?
কারণ, বন্ধুত্ব অমলিন। মানুষের জীবনে কিংবা যেকোন প্রাণীর ক্ষেত্রে বন্ধুত্বের মতো সুখকর সম্পর্ক আর দ্বিতীয়টি নেই। যেকোনো সম্পর্ক স্বার্থের কারণে ছুটে যেতে পারে কিন্তু টিকে থাকে শুধু বন্ধুত্ব। আমরা আমাদের জীবনের সকল পর্যায়ে সকল ক্ষেত্রে কোন না কোনভাবে বন্ধুত্বকেই খুঁজে ফিরি। সেই তাড়নাবোধ থেকে বন্ধুত্বের গল্পকে বেছে নেওয়া।

বন্ধুত্ব কি আপনার নিজের জীবনে এমন গভীর কোনো ছাপ ফেলেছে, যা আপনাকে এটাকেই প্রথম ছবির বিষয় করতে বাধ্য করেছে?
বন্ধুত্ব আমার নিজের জীবনেও ভালোভাবে ছাপ ফেলেছে। সেটা গল্প বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বাধ্য করেছে কিনা জানিনা কিন্তু রাইটার গল্প শোনানোর পর যখন দেখলাম গল্পে বন্ধুত্ব আছে সাথে দারুণ একটা গল্প তখন আর কিছু চিন্তা না করে শুধু মাথায় ঢুকে গেলো কীভাবে এই চরিত্রগুলোকে প্রাণবন্ত এবং জীবনমুখী করা যায়।

আপনার মতে, বন্ধুত্ব কি আজকের তরুণদের জীবনে আগের মতোই গুরুত্ব রাখে?
আগে পরের হিসাব জানিনা। তবে তরুণদের জীবনে বন্ধুত্ব সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিছু ঘটমান অতীতের উদাহরণ থেকে দেখা যায় তরুণদের মধ্যে বন্ধুত্ব কতটা গুরুত্বপূর্ণ। যেমন – মাইলস্টোন ট্র্যাজিডিতে এক বন্ধু তার মৃত্যু পথযাত্রী বন্ধুর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলছে- “আমার বন্ধু আমাকে দেখে হাসল এবং তার শেষ কথাটা বললো: আমি জানতাম তুমি আসবে।”

আমার কাছে, বন্ধুত্ব সার্বজনীন। সকল বয়সে, সকল সময়ে, সকল পর্যায়ে বন্ধুত্ব মানসপটে প্রকটভাবে প্রভাব বিস্তার করে।

কৃষকদের সঙ্গে ক্যামেরা ও সাংবাদিকরা মাঠে সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ আপনি কি মনে করেন, নতুন নির্মাতাদের কাজের প্রতি আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে এখনো পর্যাপ্ত আস্থা তৈরি হয়নি?
কোন প্রফেশনাল প্রডিউসার-ইনভেস্টর কিংবা প্লাটফর্ম একজন নতুন নির্মাতার প্রতি শুরুতেই আস্থা রাখবেনা সেটাই স্বাভাবিক। চলচ্চিত্র নির্মাণ একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়াগত ব্যাপার। সেখানে নির্মাতাকে প্রত্যেক পদে পদেই প্রমাণ করে যেতে হয়। কারণ, চলচ্চিত্র শুধুমাত্র শিল্প মাধ্যম নয় সেখানে প্রচুর অর্থ লগ্নীর প্রয়োজন হয় এবং সেটা ফেরতের নিশ্চয়তাও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। তবে নতুন এবং তরুণ নির্মাতাদের ক্ষেত্রে অর্থ লগ্নীর প্রক্রিয়ায় ইন্ডাস্ট্রির আরো সহজ হওয়া প্রয়োজন। কারণ নতুন ও তরুণ নির্মাতা তৈরি না হলে, সেই সময়ের কনটেন্ট এবং রুচি’র বহিঃপ্রকাশ ঘটেনা। তাছাড়া পর্যায়ক্রমে নির্মাতা তৈরি না হতে থাকলে, ৯০ দশকের পর আমরা যে নির্মাতা সংকটে পড়েছিলাম তার পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা থেকে যায়। আমার ক্ষেত্রে আমার প্রতি আস্থা আমার নিজেকেই তৈরি করতে হয়েছে। যেহেতু জীবনের একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে যে, আমি শুধু সিনেমাই নির্মাণ করবো। কাজেই আমার আর পেছন ফিরে তাকানোর সুযোগ ছিলনা। ‘উড়াল’ চলচ্চিত্রের উদ্যোক্তাও আমাকে বলা যায়।

বাংলাদেশের একটি গ্রামে রাতের আড্ডায় মানুষের ভিড়. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ ‘উড়াল’-এর মতো একটি ফ্রেশ কাস্ট ও ক্রু নিয়ে সিনেমা বানাতে গিয়ে প্রথম চ্যালেঞ্জই হওয়ার কথা অর্থলগ্নি! আপনি কীভাবে প্রযোজককে বোঝালেন যে এই প্রজেক্টটা ভরসাযোগ্য?
স্ক্রিপ্টিং পর্যায় থেকেই আমাদের মাথায় ছিল গল্প এবং চরিত্রের মত যথাযথ মানানসই কাস্টিং করা। হয়েছেও তাই। আপনার প্রশ্নের সূত্র ধরেই বলতে হয়- অর্থের দীনতার কারণেই একটা নতুন, অনভিজ্ঞ, প্রায় অদক্ষ, আনকোরা টিম নিয়ে কাজে নামতে হয়েছে। সেটার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতও ছিলাম। প্রযোজক শরীফ সিরাজ, সহ-প্রযোজক সম্রাট প্রামানিক এবং জহিরুল ইসলাম পিন্টু- তাদের ভরসা তৈরি হয়েছে কনটেন্টের শক্তির কারণে। এরপর পরিচালক হিসেবে কি এক অকারণে আমার প্রতি ভরসা রেখে তারা এই কাজের সাথে যুক্ত হয়েছেন। নিশ্চয়ই আমার মধ্যে কোন সম্ভাবনা তারা দেখেছেন। তাছাড়া, ওনারাও যেহেতু যার যার জায়গা থেকে নতুন রোল প্লে করছেন কাজেই তারাও সানন্দে এই কাজের সাথে যুক্ত হয়েছেন। এছাড়াও, এই চলচ্চিত্রের প্রযোজকগণ শুধুমাত্র ‘টাকা ঢেলে টাকা আসবে’ – এই থিউরিতে লগ্নি করেননি। সেখানে একটা ভালো কাজের আকাঙ্ক্ষা এবং শিল্প-মনোভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সিনেমায় লগ্নি করাটা আমাদের জন্য সহজ ছিলনা কিন্তু কোন বাধাবিপত্তিকে আমরা আমলে নিতে চাইনি। কাজের মাঝে অর্থের সংকট হয়েছে, সময় নিয়েছি। অর্থ যোগাড়ের পর আবার কাজ শুরু হয়েছে।

বিষয়:উড়াল জোবায়দুর রহমান প্রযোজক বন্ধু বন্ধু দিবস বন্ধুত্ব

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…