মানুষ বহু শতাব্দী ধরেই বিশ্বাস করে আসছে, প্রাণীরা নাকি ভূমিকম্প আগে থেকে বুঝতে পারে। ইতিহাসের পাতা খুললেই দেখা যায়, খ্রিস্টপূর্ব ৩৭৩ সালে গ্রিসের হেলিক শহর ভূমিকম্পে ধ্বংস হওয়ার কয়েক দিন আগে ইঁদুর, সাপ, খেঁকশেয়ালসহ অনেক প্রাণী শহর ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল।
এরপর শত শত বছর ধরে পৃথিবীর নানা প্রান্তে একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। এই পর্যবেক্ষণ থেকেই জন্ম হয়েছে একটি বিশেষ গবেষণাক্ষেত্র ‘জুওসিসমোলজি’, অর্থাৎ ভূমিকম্পের পূর্বাভাসে প্রাণীর আচরণ অধ্যয়ন।
তবে উপাখ্যান বা গল্পগাথা আর বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এক জিনিস নয়। তাই প্রশ্ন ওঠে, প্রাণীরা কি সত্যিই ভূমিকম্প আগে বুঝতে পারে? যদি পারে, তাহলে কীভাবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীরা প্রাণীর প্রতিক্রিয়াকে দু’ভাগে ভাগ করেন।
১. স্বল্পমেয়াদী প্রতিক্রিয়া: কয়েক সেকেন্ড আগে সতর্কতা
ভূমিকম্প আসলে প্রথমে তৈরি হয় খুব সূক্ষ্ম পি-তরঙ্গ, যা মানুষ টের পায় না, কিন্তু অনেক প্রাণী পেতে পারে। এরপর আসে ধ্বংসাত্মক এস-তরঙ্গ, যা আমাদের ঘর-বাড়ি কাঁপিয়ে দেয়।
অনেক প্রাণী, বিশেষ করে কুকুর, বিড়াল, ইঁদুর, সাপ পি-তরঙ্গের কম্পন বা শব্দ আগে থেকে টের পায়। তাই ভূমিকম্পের কয়েক সেকেন্ড বা এক মিনিট আগে তাদের আচরণ হঠাৎ বদলে যায়, যেমন- ঘেউ ঘেউ করা, দৌড়ে পালানো, লুকিয়ে যাওয়া ইত্যাদি।
এগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে বেশ গ্রহণযোগ্য। কারণ এটি মূলত প্রাণীর স্বাভাবিক ইন্দ্রিয়ের অতিরিক্ত তীক্ষ্ণতার ফল।
২. দীর্ঘমেয়াদী অস্বাভাবিক আচরণ: কয়েক দিন বা সপ্তাহ আগে
সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ এটি। অনেক সময় দেখা যায় ভূমিকম্পের দিন বা সপ্তাহ আগে প্রাণীদের আচরণ বদলে যায়। এরা অদ্ভুত অস্থির হয়, অকারণ জায়গা ছেড়ে পালায়, খাবার খাওয়া বন্ধ করে, এমনকি জলজ প্রাণীরাও অস্বাভাবিক আচরণ করে।
কেন এমন হয়?
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, ভূত্বকের গভীরে চাপ জমতে থাকলে কিছু অদৃশ্য শারীরিক ও রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে:
১) ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক (ইএম) পরিবর্তন
ফল্ট লাইনে চাপ বাড়লে শিলা থেকে বিশেষ চার্জ বাহক বেরিয়ে আসে। এগুলো অতিনিম্ন ফ্রিকোয়েন্সির (ইউএলেফ/ইএলএফ) বৈদ্যুতিক-চৌম্বকীয় সিগনাল তৈরি করে।
যেসব প্রাণী চৌম্বক ক্ষেত্র বা কম্পনের প্রতি বেশি সংবেদনশীল, যেমন মাছ, পাখি, বাদুড়, তারা এসব পরিবর্তন টের পেতে পারে।
২) বাতাসে ধনাত্মক আয়ন বৃদ্ধি
এসব চার্জ পৃষ্ঠে উঠে বাতাসকে আয়নাইজ করে, ফলে বায়ুতে ধনাত্মক আয়নের পরিমাণ বেড়ে যায়। গবেষণা বলছে, এতে প্রাণীর রক্তে সেরোটোনিন হঠাৎ বেড়ে যায়, যা অস্থিরতা, নার্ভাসনেস, উত্তেজনা এ ধরনের আচরণ তৈরি করে।
৩) পানির রাসায়নিক পরিবর্তন
চার্জ পানিতে গিয়ে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড (এইচ২ও২) তৈরি করে। ফলে পানির মান বদলে যায়, যা মাছ, ব্যাঙ, কেঁচোসহ জলজ প্রাণীর আচরণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
২০০৯ সালের ইতালির এল’আকুইলা ভূমিকম্পের আগে ৭০ কিমি দূরের পুকুর থেকে ব্যাঙের দল উধাও হয়ে যাওয়া এই প্রক্রিয়ার বড় উদাহরণ।
৩. বাস্তব প্রমাণ: হাইচেং ভূমিকম্প (চীন, ১৯৭৫)
১৯৭৫ সালে চীনে ভূমিকম্পের আগে হাজারো প্রাণীর অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ্য করে শহর আংশিকভাবে খালি করা হয়। পরে ৭ দশমিক ৩ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়, এবং বহু মানুষের প্রাণ বাঁচে।
এটি প্রাণীর আচরণের ওপর ভিত্তি করে পূর্বাভাসের সবচেয়ে বিখ্যাত সাফল্য।
৪. আধুনিক পর্যবেক্ষণ: ক্যামেরা-ভিত্তিক গবেষণা (পেরু, ২০১১)
গল্প, উপাখ্যান কিংবা লোকস্মৃতিনির্ভর তথ্যের বাইরে, ২০১১ সালে পেরুর অ্যামাজন অঞ্চলে বিজ্ঞানীরা স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরায় প্রাণীর চলাচল রেকর্ড করেন।
ভূমিকম্পের কয়েক সপ্তাহ আগে প্রাণীর সংখ্যা হঠাৎ নাটকীয়ভাবে কমে যায়, এবং দুর্যোগের ঠিক আগে প্রায় শূন্যে নেমে আসে।
এটি ছিল প্রাণীর দীর্ঘমেয়াদী আচরণের সবচেয়ে শক্তিশালী পদ্ধতিগত প্রমাণগুলোর একটি।
তাহলে কি প্রাণীরা সত্যিই ভূমিকম্প বুঝতে পারে?
বিজ্ঞান এখন পর্যন্ত যে চিত্র দিয়েছে তা সংক্ষেপে এমন,
১) স্বল্পমেয়াদী সতর্কতা (কয়েক সেকেন্ড):
হ্যাঁ, এ বিষয়ে বিজ্ঞান প্রায় নিশ্চিত। প্রাণীরা পি-তরঙ্গ আগে টের পায়।
২) দীর্ঘমেয়াদী পূর্বাভাস (দিন/সপ্তাহ):
এর সম্ভাবনা আছে, কিন্তু পুরোপুরি প্রমাণিত নয়। কখনো কখনো ভূমিকম্পের আগে প্রাণীর প্রতিক্রিয়ায় বিস্ময়কর মিল পাওয়া যায়। কিন্তু এগুলো এখনো নিশ্চিত প্রমাণ হিসেবে নেওয়ার মতো তথ্য উপাত্ত গবেষণায় পাওয়া যায়নি। যাতে করে শুধু প্রাণী দেখে ভূমিকম্পের দিন-তারিখ বলা যাবে।
বিজ্ঞান ধীরে ধীরে এগোচ্ছে, মাটির নিচের অদৃশ্য ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক পরিবর্তন, বাতাসের আয়ন, পানির রাসায়নিক পরিবর্তন সব মিলিয়ে বড় একটা ধাঁধাঁর জট খুলছে।
প্রাণীরা হয়তো সত্যিই পৃথিবীর গোপন সংকেত আগে শুনতে পায়। মানুষের কাজ হলো ওই সংকেতগুলোকে বৈজ্ঞানিকভাবে ধরার উপায় বের করা।








