জনপদ

ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে মাত্র ১০০০ টাকার পুঁজিতেই ঘুরে দাড়িয়েছেন আল আমিন

ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে মাত্র ১০০০ টাকার পুঁজিতেই ঘুরে দাড়িয়েছেন আল আমিন

ছবি: ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে ঘুরে দাড়িয়েছেন ঠাকুরগাঁওয়ের আল আমিন।

জীবন যেখানে কণ্টকাকীর্ণ, ঠিক সেখানেই নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে আশার প্রদীপ জ্বেলেছেন এক শারীরিক প্রতিবন্ধী যুবক। জন্ম থেকেই শরীরের নানা প্রতিবন্ধকতা, মাথার ওপর থেকে ছোটবেলাতেই বাবার স্নেহচ্ছায়া মুছে যাওয়া এবং প্রবাসে গিয়েও মায়ের নিঃস্ব হয়ে ফিরে আসার নির্মম বাস্তবতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জীবিকার নতুন পথ বেছে নিয়েছেন ঠাকুরগাঁওয়ের আল আমিন।

মাত্র ১০০০ টাকার পুঁজিতেই ভিক্ষার ঝুলি ফেলে দিয়ে এখন তিনি আত্মসম্মানের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছেন এক প্যাকেট বাদামের ফেরিওয়ালা হিসেবে।

​ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার নারগুন ইউনিয়নের ছোট খোচাবাড়ি গ্রাম। এই গ্রামেই নানাবাড়িতে কেটেছে আল আমিনের শৈশব ও কৈশোর। তার আসল বাড়ি পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলায় হলেও বাবা আব্দুস সাত্তারের মৃত্যুর পর মা মফিজা বেগম কোলের এই প্রতিবন্ধী শিশুকে নিয়ে আশ্রয় নেন বাবার ভিটায়।

​সংসারের চাকা ঘোরাতে বড় ভাই মামুন ও বোন রুমাকে বিয়ে দেওয়ার পর শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি জমিয়েছিলেন মা মফিজা। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, শূন্যহাতে তাকে ফিরে আসতে হয় দেশে। এরপর থেকেই অভাব নিত্যসঙ্গী। পেটের দায়ে জন্মগত প্রতিবন্ধী আল আমিনকে নামতে হয় শহরের রাস্তায়, ধরতে হয় ভিক্ষার থলে।

​তবে মানুষের করুণার ওপর নির্ভর করে জীবন চালাতে রাজি ছিলেন না আল আমিন। ভাগ্য বদলের মোড় ঘুরিয়ে দেয় একদিন। বীরগঞ্জ উপজেলার ২৮ মাইল এলাকার আকরাম আলী ও পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জের দীনেশ চন্দ্র—এই দুই দয়ালু মানুষের কাছ থেকে পাওয়া মোট ১ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু হয় তার নতুন লড়াই। এই টাকা দিয়ে বাদাম কিনে শুরু করেন ফেরি করে বিক্রি।

গত বৃহস্পতিবার ঠাকুরগাঁও শহরের বাস টার্মিনাল এলাকায় কথা হয় ১৮-১৯ বছরের এই তরুণের সঙ্গে। উজ্জ্বল মুখে আল আমিন শোনান তার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প—

​”আগে মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পাততাম, ভিক্ষা করতাম। এখন নিজের পরিশ্রমে বাদাম বিক্রি করি। প্রতিদিন ১০০ গ্রাম ওজনের প্রায় ১২০ প্যাকেট বাদাম বিক্রি হয়। সব মিলিয়ে ১২০০ টাকার বাদাম বিক্রি করে পুঁজির বাদ দিয়ে প্রতিদিন ৫০০ টাকা লাভ থাকে। আমি এখন অনেক খুশি। ভিক্ষা করার চেয়ে নিজের হালাল উপার্জনে চলা অনেক সম্মানের।”

​শুধু বাদাম বিক্রিই নয়, ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে ভিন্ন কৌশলও নিয়েছেন তিনি। স্থানীয় সার ও বীজ ব্যবসায়ী এনামুল হক সরকার রসিকতা করে বলেন, “আমাদের এলাকার এই আল আমিন যেন ঠিক কাঁচা বাদামের ভাইরাল গায়ক ভুবন বাদ্যকার! অ সুরেলা গলায় গান গেয়ে সে বাদাম বিক্রি করে, যা দেখে অনেকেই মজা পান এবং তার কাছ থেকে বাদাম কেনেন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাকে দমাতে পারেনি।”

​বাস টার্মিনালের বাইসাইকেল বিক্রেতা আহাদ আলী বলেন, “আগে ছেলেটাকে নিয়মিত ভিক্ষা করতে দেখতাম। এখন সে নিজেই পরিশ্রম করে খায়। সে ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার চেষ্টা করছে দেখেই আমাদের তার প্রতি শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি আরও বেড়ে গেছে।”

​নারগুন ইউনিয়নের ওয়ার্ড সদস্য নুর ইসলামও আল আমিনের এই সাহসিকতার প্রশংসা করে সমাজের বিত্তবান ও সাধারণ মানুষকে তার পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

​ভিক্ষার গ্লানি মুছে আল আমিনের এই ঘুরে দাঁড়ানো বার্তা দেয়—অভাব মানুষের শরীরকে আটকাতে পারে, কিন্তু মনের জোর আর কাজের নেশাকে দমাতে পারে না। হাজারও যুবকের কাছে আজ এক জীবন্ত অনুপ্রেরণার নাম—আল আমিন

বিষয়:১০০০ টাকা আল-আমিন ভিক্ষাবৃত্তি

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…