আন্তর্জাতিক

ট্রাম্পের পরীক্ষা, নেতানিয়াহুর অনিশ্চয়তা: মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন কী বদলে দিতে পারে?

ট্রাম্পের পরীক্ষা, নেতানিয়াহুর অনিশ্চয়তা: মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন কী বদলে দিতে পারে?

ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নয়, অথচ এর ফলের দিকে তাকিয়ে গোটা বিশ্ব। মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর দেশটিতে মধ্যবর্তী নির্বাচন।

ব্যালটে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম না থাকলেও তার দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি দুই বছর কতটা সহজ কিংবা কঠিন হবে, তার অনেকটাই ঠিক করবে এই ভোট। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের হাতেই থাকবে, নাকি ডেমোক্র্যাটরা অন্তত একটি কক্ষ নিজেদের দখলে নেবে; সেই প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, বাণিজ্যনীতি, অভিবাসন, ইরান যুদ্ধ এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মার্কিন ভূমিকা।

এবারের নির্বাচন আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে। যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলে গত ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। নতুন সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন পায়নি বিরোধীরাও। ফলে একদিকে ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ক্ষমতার পরীক্ষা, অন্যদিকে তেল আবিবে নেতানিয়াহুর সরকার গঠনের অনিশ্চয়তা; দুই মিত্র দেশের রাজনীতিই এখন গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে। এর প্রভাব গাজা, ইরান এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতেও পড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন আসলে কী? প্রতি চার বছর পর দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়। আর সেই মেয়াদের মাঝামাঝি, অর্থাৎ দুই বছর পর অনুষ্ঠিত হয় মধ্যবর্তী নির্বাচন বা মিডটার্ম ইলেকশন। এবার প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সবগুলোতে এবং সিনেটের ১০০ আসনের মধ্যে নিয়মিত মেয়াদের ৩৩টিতে ভোট হচ্ছে। পাশাপাশি দুটি সিনেট আসনে বিশেষ নির্বাচন রয়েছে। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গভর্নর, আইনসভা এবং স্থানীয় পর্যায়ের বহু পদেও নির্বাচন হচ্ছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, কংগ্রেসের দুটি কক্ষ কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থায় প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্র ও নির্বাহী বিভাগের প্রধান হলেও আইন প্রণয়ন, বাজেট, সরকারি ব্যয়ের অনুমোদন এবং প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দুই বছরে তুলনামূলক অনুকূল আইনসভা পেয়েছেন। কিন্তু মঙ্গলবারের ভোটে সেই সমীকরণ বদলে যেতে পারে।

ট্রাম্পের জন্য এই নির্বাচন কেন গুরুত্বপূর্ণ? প্রথমত, তার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রশ্ন। কর, সরকারি ব্যয়, অভিবাসন এবং বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ নীতিতে নতুন আইন প্রয়োজন হলে কংগ্রেসের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ। ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিলে প্রশাসনের বড় ধরনের আইন প্রণয়নের উদ্যোগ আটকে যেতে পারে। বাজেট নিয়ে দ্বন্দ্ব বাড়তে পারে, সরকারি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অর্থ বরাদ্দ নিয়েও কঠিন দরকষাকষি হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, প্রশাসনের জবাবদিহি। প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ বদলালে বিভিন্ন কমিটির নেতৃত্বও বদলাবে। ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি, সরকারি ব্যয়, স্বার্থের সংঘাত এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন তদন্ত ও শুনানির উদ্যোগ নিতে পারবেন। জবাবদিহির মুখোমুখিও করতে পারবেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। তবে কেবল প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলেই প্রেসিডেন্টকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। অভিশংসনের জন্য প্রতিনিধি পরিষদের সিদ্ধান্তের পর সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে দোষী সাব্যস্ত করা প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, সিনেটের নিয়ন্ত্রণ। সিনেট শুধু আইন প্রণয়নই করে না; গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে নিয়োগ, ফেডারেল বিচারক ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগ অনুমোদনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ডেমোক্র্যাটরা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিলে ট্রাম্পের বিভিন্ন মনোনয়ন অনুমোদন কঠিন হতে পারে।

তবে কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট পদে বহাল থাকবেন। তার নির্বাহী ক্ষমতা, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং সংবিধান ও আইনে নির্ধারিত অন্যান্য ক্ষমতা কিছুই শেষ হবে না। মধ্যবর্তী নির্বাচন প্রেসিডেন্ট পরিবর্তনের ভোট নয়; এটি তার প্রশাসনের ওপর আইনসভার নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক চাপের ভারসাম্য বদলে দেওয়ার নির্বাচন।

রিপাবলিকানদের জন্য এই ভোটের গুরুত্ব কিছুটা আলাদা। তারা এখন কংগ্রেসের উভয় কক্ষ নিয়ন্ত্রণ করছেন। প্রতিনিধি পরিষদে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুবই সীমিত, ফলে অল্প কয়েকটি আসনের পরিবর্তনেই নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হতে পারে। সিনেটে তাদের তুলনামূলক বড় সুবিধা থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের ফল সামগ্রিক সমীকরণ পাল্টাতে পারে।

রিপাবলিকানদের সামনে তাই দুটি চ্যালেঞ্জ। একদিকে প্রেসিডেন্টের নীতির পক্ষে ভোটারদের সমর্থন ধরে রাখা, অন্যদিকে জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, শুল্কনীতি এবং ইরান যুদ্ধ নিয়ে জনঅসন্তোষের মোকাবিলা করা। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে অর্থনৈতিক চাপ ও বিদেশে সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নির্বাচনী বিতর্কে গুরুত্ব পাচ্ছে।

ডেমোক্র্যাটদের জন্য এই নির্বাচন ক্ষমতায় ফেরার নয়, বরং ক্ষমতার ভারসাম্যে প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ। তারা প্রতিনিধি পরিষদ দখল করতে পারলে ট্রাম্প প্রশাসনের আইন প্রণয়নের উদ্যোগে কার্যকর বাধা দিতে পারবেন এবং প্রশাসনের বিভিন্ন কার্যক্রমের ওপর নজরদারি বাড়াতে পারবেন। সিনেটের নিয়ন্ত্রণও পেলে সেই ক্ষমতা আরও বিস্তৃত হবে।

কিন্তু ডেমোক্র্যাটদের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন রয়েছে। শুধু ট্রাম্পবিরোধী অবস্থানের ভিত্তিতে ভোট পাওয়া আর ভোটারদের কাছে অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা, অভিবাসন ও জাতীয় নিরাপত্তার বিকল্প পরিকল্পনা গ্রহণযোগ্য করে তোলা এক বিষয় নয়। মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভালো ফল করলেও সেটি ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করবে না। তবে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে দুই দলের নেতৃত্ব, নির্বাচনী কৌশল এবং সম্ভাব্য প্রার্থীদের অবস্থানের ওপর এর রাজনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে।

এই মার্কিন নির্বাচন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় নয়। বিশ্ব অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে ট্রাম্পের আমদানি শুল্কনীতি, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য বিরোধ, ইউক্রেনকে সহায়তা, ন্যাটোর সঙ্গে সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন অবস্থান নিয়ে নতুন করে বিতর্ক ও দরকষাকষির সুযোগ তৈরি হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে এমন দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে ট্রাম্পের শুল্কনীতির ভবিষ্যৎ। ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলে প্রশাসনের বাণিজ্যসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে শুনানি, বাজেটের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং নতুন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করতে পারবেন। তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলালেই প্রেসিডেন্টের আরোপ করা সব শুল্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে না। কারণ, বিদ্যমান আইনের অধীনে বাণিজ্যসংক্রান্ত বেশ কিছু ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হাতে রয়েছে।

ইউক্রেনের ক্ষেত্রেও মার্কিন সহায়তা, সামরিক ও অর্থনৈতিক বরাদ্দ এবং রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে কংগ্রেসের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে এ বিষয়ে রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট; কোনো দলকেই সম্পূর্ণ একক অবস্থানের অনুসারী ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। দুই দলের ভেতরেও বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি হয়েছে ইসরায়েলকে ঘিরে। গত ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট ১২০ আসনের নেসেটে পেয়েছে ৫৩টি আসন। তার বিরোধী ইহুদি দলগুলোর জোট পেয়েছে ৪৮টি এবং আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো ১৯টি। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১ আসনের সমর্থন। ফলে নেতানিয়াহু যেমন এককভাবে সরকার গঠন করতে পারছেন না, তেমনি বিরোধীরাও এখন পর্যন্ত বিকল্প সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেননি।

ইসরায়েলের নির্বাচনের এই ফলকে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে তার ক্ষমতাচ্যুতি নিশ্চিত হয়ে গেছে, এমন নয়। নতুন জোট গঠনের আলোচনায় তিনি সফল হতে পারেন। আবার বিরোধীরা সমঝোতায় পৌঁছাতে পারলে বিকল্প সরকারও গঠিত হতে পারে। কোনো পক্ষই সফল না হলে দেশটিকে নতুন নির্বাচনের দিকে যেতে হতে পারে। আপাতত নেতানিয়াহু অন্তর্বর্তী দায়িত্বে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বহাল রয়েছেন।

এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন হওয়ায় দুই দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প প্রকাশ্যে নেতানিয়াহুকে সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু ইসরায়েলের ভোটাররা তার জোটকে সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেননি। ওয়াশিংটনের সমর্থন থাকলেও ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনী সমীকরণ আলাদাভাবে কাজ করছে; এটি স্পষ্ট হয়েছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ইরান প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের পর মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই দেশের নেতৃত্বের মধ্যে মতপার্থক্যের খবর প্রকাশিত হয়েছে। ১ নভেম্বর মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, নেতানিয়াহু মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের বিরুদ্ধে দ্রুত নতুন সামরিক পদক্ষেপ চান। অন্যদিকে ট্রাম্প আপাতত কূটনৈতিক আলোচনাকে আরও সময় দিতে আগ্রহী। বিষয়টি নিয়ে দুই নেতার মধ্যে টেলিফোনে খোলামেলা আলোচনা হয়েছে বলে মার্কিন ও ইসরায়েলি সূত্রের বরাতে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি। তবে হোয়াইট হাউস ও নেতানিয়াহুর দপ্তর এ বিষয়ে মন্তব্য করেনি।

এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল ইরান নিয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে। কংগ্রেসে বিরোধীপক্ষের ক্ষমতা বাড়লে সামরিক অভিযানের ব্যয়, প্রশাসনের সিদ্ধান্ত এবং যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে আরও কঠোর প্রশ্ন উঠতে পারে। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখলে ট্রাম্প তার বিদ্যমান নীতির পক্ষে আইনসভায় সমর্থন বজায় রাখবেন। কিন্তু কোনো ফলই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধ কিংবা শান্তিচুক্তি নিশ্চিত করে না।

ইসরায়েলকে মার্কিন সামরিক সহায়তার প্রশ্নেও প্রভাব পড়তে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের একটি বড় অংশ ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহ, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিনিদের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আরও কঠোর অবস্থানের পক্ষে কথা বলছেন। বিশেষ করে গাজায় দীর্ঘ সংঘাতের পর ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ইসরায়েল নীতি নিয়ে অবস্থানের পরিবর্তন দৃশ্যমান।

ব্রিটিশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের ২২ অক্টোবরের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলেও ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন বিষয়ে মার্কিন নীতি তাৎক্ষণিকভাবে বদলে যাবে না। কারণ, পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনায় প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। তবে কংগ্রেসের মাধ্যমে সামরিক সহায়তা পর্যালোচনা, তদন্ত, জবাবদিহি এবং ভবিষ্যতের নীতি নির্ধারণে নতুন চাপ তৈরি করা সম্ভব।

এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। নেতানিয়াহু সরকার গঠন করতে ব্যর্থ হলেও ইসরায়েলের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতিতে সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান আসবে; এমন নিশ্চয়তা নেই। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকট নিজেও দেশটির সাবেক সামরিক প্রধান। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ইসরায়েলের নিরাপত্তা এবং হামাসের সামরিক সক্ষমতার প্রশ্নে ইসরায়েলের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানে কিছু মিল রয়েছে। ফলে নেতৃত্ব বদলালেও গাজা বা ইরান বিষয়ে মৌলিক নীতিগত পরিবর্তন নিশ্চিত নয়। তবে পশ্চিম তীর, সরকারের অভ্যন্তরীণ জোটগত চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পরিচালনায় পার্থক্য তৈরি হতে পারে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাটরা শক্তিশালী হলে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কি আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে? সরাসরি এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। তবে ওয়াশিংটনে রাজনৈতিক সমর্থনের ধরন বদলালে ইসরায়েলের নতুন সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক, সামরিক সহায়তা ও আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন হিসাব তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের জন্যও নির্বাচনের গুরুত্ব কম নয়। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার। মার্কিন শুল্কনীতি এবং বাণিজ্যসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ও রপ্তানি আয়ে প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তেল ও এলএনজির দাম, জাহাজ পরিবহন খরচ এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত বাংলাদেশিদের পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

ফলে বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে এই নির্বাচনের দুটি বিষয় বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। প্রথমটি হচ্ছে ট্রাম্পের শুল্ক ও বাণিজ্যনীতির ওপর কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ প্রভাব। দ্বিতীয়টি ইরান ও ইসরায়েল নিয়ে ওয়াশিংটনের নীতির সম্ভাব্য পরিবর্তন। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা শুধু কূটনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর অর্থনৈতিক প্রভাবও বাংলাদেশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

সব মিলিয়ে মঙ্গলবারের নির্বাচনে সম্ভাব্য তিনটি রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। রিপাবলিকানরা উভয় কক্ষ ধরে রাখতে পারেন, ডেমোক্র্যাটরা একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেন কিংবা উভয় কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেন। প্রত্যেকটির প্রভাব ভিন্ন। তবে নির্বাচনের ফল না আসা পর্যন্ত কোন পরিস্থিতি বাস্তবে তৈরি হবে, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।

একইভাবে ইসরায়েলে নেতানিয়াহু নতুন জোট গঠন করবেন, বিকল্প সরকার আসবে, নাকি আবার নির্বাচন হবে; সেই প্রশ্নেরও উত্তর এখনো মেলেনি।

তাই এক সপ্তাহের ব্যবধানে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দুটি নির্বাচন শুধু দুই দেশের ক্ষমতার রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই। একদিকে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি দুই বছরে আইনসভার ক্ষমতার ভারসাম্য, অন্যদিকে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ; দুই প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে ইরান যুদ্ধ, গাজার ভবিষ্যৎ, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি।

মার্কিন নির্বাচনে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট পদ নির্ধারিত হচ্ছে না, আর ইসরায়েলের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর ক্ষমতাচ্যুতিও এখনো নিশ্চিত নয়। কিন্তু দুই নির্বাচনের ফল এবং পরবর্তী রাজনৈতিক সমঝোতা আগামী দুই বছরের আন্তর্জাতিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।

(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিষয়:ট্রাম্প নেতানিয়াহু মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…