কাতারের সঙ্গে সব ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে ছয়টি দেশ। সৌদি আরব, মিশর, বাহরাইন, লিবিয়া, ইয়েমেন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই সম্পর্কচ্ছেদের ঘটনায় বাংলাদেশের দুশ্চিন্তার জায়গা কী? আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা এর পেছনে বড় ধরনের বিশ্বরাজনীতির প্রভাব যেমন অনুভব করছেন, তেমনই বলছেন বাংলাদেশকেও কূটনৈতিক সম্পর্কের ব্যাপারে আরেকটু সচেতন হতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রফেসর মুহা. রুহুল আমীন বলেন, জঙ্গিবাদ ইস্যুতে মুসলিম বিশ্ব যদি ঐক্য গড়তে না পারে, তাহলে সেটার সমাধান করা যাবে না। জঙ্গিবাদের সমস্যা আমাদের আছে, কিন্তু সংজ্ঞা নেই, এর উৎস নির্ধারণেও আমাদের অনেক মতভেদ আছে। জঙ্গিবাদ দূর করতে হলে একটি বৈশ্বিক উদ্যোগ দরকার বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বে। সম্প্রতি ইসলামিক আমেরিকান সম্মেলনে যদি মুসলিম বিশ্ব এক হতে পারতো তাহলে বৈশ্বিক ফোরাম গঠিত হতে পারতো। কিন্তু সেখানে ঐক্য না হয়ে বরং বিভাজন বেশি তৈরি হয়েছে। যদি এভাবে বিভাজন সৃষ্টি করা হয় আলোচনার মঞ্চ তৈরি হবে না এবং আরো সমস্যার তৈরি হবে। মুসলিম বিশ্বের সমস্যাগুলোকে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোরই সমাধান করতে হবে। আর সেটা তারা যতক্ষণ না অনুধাবন করবে ততক্ষণ সমস্যা রয়েই যাবে।

আর আমরা তো সবাই জানি বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর স্বার্থের লড়াইয়ের কারণে এটা শোষণ প্রক্রিয়া হয়েছে শাসক ও শাসিতের মাঝে আর সেটা করতে গিয়েই দ্বন্দ্বটা তৈরি হয়েছে। আইএস বা আল কায়েদার মতো এসব জটিল গ্রুপকে নিশ্চিহ্ন করতে হলে মুসলিম বিশ্বকে একতাবদ্ধ থাকতে হবে। এভাবে সম্পর্ক ছিন্ন করে হয়তো কাতারকে রাগান্বিত বা সংক্ষুব্ধ করা যাবে তার চেয়ে সংলাপ বা আলোচনার বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
তবে কাতারের সঙ্গে আরো চার মুসলিম দেশের এমন সম্পর্কচ্ছেদে বাংলাদেশেরও দুশ্চিন্তার কারণ আছে উল্লেখ করে রুহুল আমীন বলেন, অভিবাসন ও রেমিটেন্সের ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে কাতার আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। সৌদি আরব থেকে আমরা নিরাশ হয়েছি। আমাদের মূলনীতি কারো সাথে শত্রুতা নয়, সবার সাথে বন্ধুত্ব সেটাকে ধরে রেখে আচরণ করতে হবে। অর্থনৈতিক কূটনীতি বিষয়ে কাজ করতে হবে। বৈশ্বিক ফোরামে যাওয়ার পরে আমাদের লক্ষ থাকবে ঐক্য গঠন করা। সেখানে গভীর ডিপ্লোমেটিক এফিশিয়েন্সি আমাদের দেখাতে হবে। পররাষ্ট্রনীতি কি নির্ধারণ হবে সেটা দেখতে হবে। কূটনৈতিক সম্পর্ক যেন ক্ষুণ্ণ না হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। শ্রমবাজার, গিফ অ্যান্ড টেক পলিসি, ডিপ্লোমেটিক সম্পর্ক কিভাবে ঠিক থাকবে সেসব দিকেই আমাদের নজর দিতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আশেকা ইরশাদ বলেন,যদি নতুন করে মুসলিম বিশ্বে বিভেদ তৈরি হয় সেটা বিশ্বব্যাপী আরো বেশি সমস্যা তৈরি করবে। কিছুদিন আগেই ট্রাম্প সৌদি ঘুরে গেলেন তারপরই এমন সিদ্ধান্তের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে। হতে পারে এর পেছনে কোনো বিস্তারিত ভূমিকা অাছে। তবে এই ধরনের ঘটনা বিশ্ব রাজনীতিতে শুভ প্রভাব ফেলবে তা নয়। এসব সমস্যা যত একত্রিত হয়ে মোকাবেলা করা যাবে সমস্যার সমাধান তত সহজ হবে।

বাংলাদেশের দুশ্চিন্তার কারণ বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মার্কেট কাতার। আমরা ইউরোপ ও আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের উপরও নির্ভরশীল। সেখানে এমন অস্থিতিশীলতা তো অবশ্যই বাংলাদেশের জন্য দুশ্চিন্তার। বাংলাদেশকে এখন ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কোন দিকে যাবে। আমাদের পররাষ্ট্র নীতিতেই আছে, কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব। সেই জায়গাতে ভারসাম্যটা রাখতে হবে।
কাতারের সঙ্গে লিকুইড ন্যাচারাল গ্যাস বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক আছে বাংলাদেশের। আগামী বছরেই শুরু হওয়ার কথা এলএনজি প্ল্যান্ট স্থাপনের কাজ। তবে বিশ্বরাজনীতির এমন ঘটনা সেই বিষয়ের উপর খুব বেশি প্রভাব আনবে না বলেই মনে করছেন পাক্ষিক এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার ম্যাগাজিনের সম্পাদক মোল্লাহ আমজাদ হোসেন। চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন, কাতার সবচেয়ে বড় এলএনজি সাপ্লায়ার। তবে এসব দেশের সম্পর্কচ্ছেদের ঘটনা পুরোটাই ক্ষমতার দ্বন্দ্ব । এলএনজি অন্য একটি বিষয়, সেটা কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্থ হবে না আমাদের ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে।








