রাশিয়ার ক্রেমলিন-বিরোধী নেতা অ্যালেক্সেই নাভালনির মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে অভিযোগ তুলেছে ইউরোপের পাঁচ দেশ। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, সুইডেন ও নেদারল্যান্ডস দাবি করেছে, দক্ষিণ আমেরিকার বিষাক্ত ‘পয়জন ডার্ট ফ্রগ’ থেকে পাওয়া এক ধরনের টক্সিন ব্যবহার করে নাভালনিকে হত্যা করা হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে দেশগুলো জানায়, দুই বছর আগে আর্কটিক অঞ্চলের একটি দণ্ড উপনিবেশে আটক অবস্থায় নাভালনিকে বিষ প্রয়োগ করা হয়। তবে মস্কো এই অভিযোগকে ‘প্রচারমূলক অপপ্রচার’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, নাভালনির দেহ থেকে সংগৃহীত নমুনা বিশ্লেষণে নিশ্চিতভাবে এপিবাটিডিন নামের এক ধরনের নিউরোটক্সিনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এই বিষ দক্ষিণ আমেরিকার পয়জন ডার্ট ফ্রগে পাওয়া যায় এবং এটি রাশিয়ায় স্বাভাবিকভাবে পাওয়া যায় না।
যুক্তরাজ্য বলেছে, এই বিষ প্রয়োগের ঘটনা রাশিয়ার উদ্বেগজনক আচরণের ধারাবাহিকতারই অংশ।
উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে যুক্তরাজ্যে রুশ দ্বৈত গুপ্তচর সের্গেই স্ক্রিপালকে বিষ প্রয়োগের ঘটনায় জনসম্মুখে তদন্ত চালানো হয়। গত বছর সেই তদন্তে উপসংহার টানা হয় যে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নভিচক স্নায়ুবিষ প্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
যৌথ বিবৃতিতে আরও বলা হয়, রাশিয়া দাবি করেছে নাভালনি স্বাভাবিক কারণে মারা গেছেন। কিন্তু এপিবাটিডিনের বিষক্রিয়া ও উপসর্গ বিবেচনায় তার মৃত্যুর কারণ বিষপ্রয়োগ হওয়াই অত্যন্ত সম্ভাব্য।
এতে আরও বলা হয়, এই ঘটনা রাসায়নিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ কনভেনশন এবং জীবাণু ও টক্সিন অস্ত্র কনভেনশন লঙ্ঘনের পুনরাবৃত্তির ইঙ্গিত দেয় এবং রাশিয়াকে জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।
তবে কীভাবে নাভালনির দেহের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু জানানো হয়নি।
পয়জন ডার্ট ফ্রগ কী?
পয়জন ডার্ট ফ্রগ হলো দক্ষিণ আমেরিকার রেইনফরেস্টে পাওয়া ছোট আকারের উজ্জ্বল রঙের ব্যাঙ। এদের ত্বক থেকে নিঃসৃত হয় বিভিন্ন ধরনের শক্তিশালী বিষ।
এপিবাটিডিন হলো এমনই একটি নিউরোটক্সিন, যা শরীরের স্নায়ুতন্ত্রে আঘাত করে। এটি শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, শরীরের অনিয়ন্ত্রিত কাঁপুনি, হৃদস্পন্দন কমে যাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
ইউরোপীয় বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, নাভালনির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত পদার্থটি পরীক্ষাগারে প্রস্তুত করা হয়েছিল। কারণ এ ধরনের বিষ ল্যাবে তৈরি করা সম্ভব। এর কার্যকারিতা অনেকটা স্নায়ুবিষের মতো।
কে ছিলেন অ্যালেক্সেই নাভালনি?
অ্যালেক্সেই নাভালনি ছিলেন রাশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী বিরোধী নেতা। ২০০৮ সালে তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস কোম্পানি গ্যাজপ্রম ও তেল কোম্পানি রসনেফটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে আলোচনায় আসেন।
২০১০ সালে তিনি রসপিল নামে একটি দুর্নীতিবিরোধী প্রকল্প চালু করেন। ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ফাউন্ডেশন ফর ফাইটিং করাপশন, যা রাশিয়ার শীর্ষ রাজনৈতিক মহলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
২০২০ সালে তিনি একবার স্নায়ুবিষে আক্রান্ত হন, যার জন্য তিনি ক্রেমলিনকে দায়ী করেন। পরে চিকিৎসার জন্য তাকে জার্মানিতে নেওয়া হয়।
চিকিৎসা শেষে রাশিয়ায় ফেরার পাঁচ মাসের মাথায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং জীবনের শেষ তিন বছর কারাগারে কাটান। ২০২৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তার মৃত্যুর ঘোষণা দেওয়া হয়।
তার মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয় ২০২৪ সালের মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলন শুরুর ঠিক আগে। পরে সম্মেলনের সূচিতে পরিবর্তন এনে তার স্ত্রী ইউলিয়া নাভালনাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।
শনিবার সামাজিক মাধ্যমে ইউলিয়া নাভালনা বলেন, প্রথম দিন থেকেই আমি নিশ্চিত ছিলাম আমার স্বামীকে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। এখন তার প্রমাণ মিলেছে। দুই বছর ধরে সত্য উদঘাটনে ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রচেষ্টার জন্য আমি কৃতজ্ঞ।
১৯৭৬ সালে মস্কো অঞ্চলে জন্ম নেওয়া নাভালনি রাশিয়ার রুডিএন বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। পরে অর্থনীতিতেও ডিগ্রি অর্জন করেন।








