১৫ই আগস্ট, মার্ক টেইলর ও আমরা

আমার কিছু বন্ধুর জন্মদিন ছিল গতকাল ১৫ আগস্ট। আমি মনে মনে সবাইকে উইশ করলেও প্রকাশ্যে কাউকেই শুভেচ্ছা দিইনি। জানাতে আমার ইচ্ছাও হয়নি, কেমন যেন লেগেছে। এতে অনেকেই না হলেও কেউ কেউ মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছেন, কেউ অভিমান করেছেন; কেউ রেগে গেছে, যাদের অধিকার আছে তারা। এক বন্ধু ফেসবুকে তার জন্মদিন বঙ্গবন্ধুর নামে উৎসর্গ করেছে দেখে আমি তাকে ধন্যবাদ দেওয়ার পরে আমার আরেক ফেসবুকে বন্ধু আমাকে আক্রমণ করেছে শক্ত ভাষায়। তিনি হয়তো আমাকে খুব ভালোবাসেন, না হয় ঈর্ষা করেন, তাই এমন করেছেন তা আমি বুঝি।
আমি ক্রিকেট খেলা খেলা খুব একটা দেখি না, বুঝিও খুব কম। তবে ফেসবুক বন্ধুর ক্রিকেট খেলা নিয়ে একটা পোস্ট পড়ে খুব ভাল লাগল। ঘটনা ১৯৯৯ সালের। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট টিম এসেছে পাকিস্তানে টেস্ট খেলতে। মার্ক টেইলর তাদের দলের অধিনায়ক। অধিনায়ক তার নিজের ৩৩৪ রানের মাথায় এসে ইনিংস ঘোষণা দিয়ে বসলেন। সবাই খুব অবাক হলো। কারণ হাতে উইকেট আর ওভার দুটোই ছিল। তিনি ইচ্ছা করলে ৩৪০ বা ৩৫০ রান করতে পারতেন, তবুও তিনি করলেন না। সবাই বলাবলি শুরু করলেন, মার্ক টেইলর কেন এটা করলেন। নিশ্চিত ড্র খেলা, এভাবে শেষ করলেন!
এ কথা শেষ অবধি টেইলরের কানেও গেল। তিনি যা বললেন তাতে সবাই হতবাক। তখনো সর্বকালের সেরা ব্যাটসমাইন ডন ব্রেডম্যান, যার রান ছিল ৩৩৪। মার্ক টেইলর ডন ব্রেডম্যানকে সেরা রাখতেই ইনিংস ঘোষণা দিয়েছেন। এটা জানার পর সবার মাথা নুইয়ে গেল মার্ক টেইলরের কাছে, মার্ক টেইলর উঠে গেলেন ভিন্ন উচ্চতায়। এটাই তো সম্মান দেখানো, নিজেকে বড় প্রমাণ করার সুযোগ।
আরেক ঘটনা অতি সাম্প্রতিক কালের। ভারতের নির্বাচনে বিপুল ভোটে জিতে গেল বিজেপি। বিশ্বের অন্যতম বিশাল গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদির শপথ অনুষ্ঠান হবে। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি পিছিয়ে দিয়েছিলেন শপথ অনুষ্ঠান মহাত্মা গান্ধীর মৃত্যু দিবসের কারণে, এই কথা ভারতেই প্রচার আছে।
সবাই, এমনকি স্বাধীনতা বিরোধী, মুসলিম লীগ, জামাতসহ স্বাধীনতার বিরোধী চৈনিক বামরাও বিশ্বাস করে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কারণেই আমরা পেয়েছি স্বাধীন বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে। স্বাধীনতার কারণেই শুধু নন, স্বাধীনতাকে ব্যবহার করে আমাদের দেশে যারা ব্যক্তিগত বা পারিবারিকভাবে খুব লাভবান হয়েছেন তাদের একটা বিরাট অংশ কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হেয় করার জন্য মরিয়া প্রায়। বঙ্গবন্ধু না থাকলে মহান মুক্তিযুদ্ধকালে হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে আটকা থাকা (!) বেগম খালেদা জিয়াকে কখনোই তদানিন্তন মেজর জিয়া ঘরে নিতেন না। তিনি এখন আজ ১৫ আগস্ট ভুয়া জন্মদিন পালন করেন, কী তৃপ্তি পান তাতে!
এক কালের গণমানুষের কবি, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের প্রথম সারির সেনাপতি ও হালের বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ মীর আব্দুস শুকুর আল মাহমুদের কথাই ধরুন না কেন! উনার কোনো ডিগ্রি নেই। কিছু পত্রিকা রেখে বঙ্গবন্ধু বাকি পত্রিকা বন্ধ করে সাংবাদিকদের সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে চাকরি দিলেন। আল মাহমুদ এইট পাশ। কোথায় যাবে চাকরির জন্য। কারণ তিনি তো মিথ্যা তথ্য দিয়ে তখনকার সরকার আর বঙ্গবন্ধুকে বেইজ্জতি করার জন্য নিবেদিত প্রাণ পত্রিকা দৈনিক গণকন্ঠের সম্পাদক ছিলেন। যার মালিকানায় ছিল বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় প্রত্যয়ী জাতীয় সামাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)।
আল মাহমুদকে বঙ্গবন্ধু বিশেষ বিবেচনায় সরকারের একটি দপ্তরের পরিচালক করেন। তিনি এখন, জামায়াতের বুদ্ধিজীবী। এইট পাশ হবার পরেও, সরকারের ও দেশের বিরুদ্ধে কাজ করার পরেও বঙ্গবন্ধু তাকে সম্মানের সাথে খেয়ে পরে বাঁচার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। সেই আল মাহমুদ এখন সেই বঙ্গবন্ধুর
পরিবারকে ধ্বংস করার যড়যন্ত্রের অংশীদার!
এ তো গেল তথাকথিত বড় বড় মানুষের কথা। এমন অনেকেই আছেন যারা ছিলেন খুব গরীব। তারা পরে স্বাধীনতা আর বঙ্গবন্ধুর কারণে কখনো বা নাম ভাঙ্গিয়ে অনেক টাকার মালিক হয়েছেন। তারা এখন পারলে বঙ্গবন্ধুর গুষ্ঠি উদ্ধার করেন। খবরের কাগজে দেখলাম, অনেকে নিজের নাম বাপের নাম পরিবর্তন করে ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা হয়ে পুলিশে চাকরি নিয়েছেন। তারাও বঙ্গবন্ধুর গুষ্ঠি উদ্ধার করেন, করবেন পরেও। কিছু বড় আমলা ভূয়া মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট দিয়ে সচিব হয়েছেন, স্যালুট নিয়েছেন, তারাও মনে মনে বঙ্গবন্ধুর গুষ্ঠি উদ্ধার করেন। রক্ত শুদ্ধ হতে সময় লাগে। পারিবারিক সংস্কৃতি পরিবর্তন হতে সময় লাগে। এক জনমে হয় না।
কয়েক বছর আগেও দেখেছেন, পুলিশের কিছু সদস্য রিকশাওয়ালাদের অহেতুক পেটায়। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন যে, আসলে ওরা (পুলিশের কিছু সদস্য) যখন ছোট ছিল তখন গ্রামের মাতুব্বরের ছেলেদের হাতে অহেতুক পিটুনি খেয়েছে, রিকশাওয়ালাদের অহেতুক পিটিয়ে তারা তাদের সেই পুরাতন দিনের আঘাতের কাল্পনিক প্রতিশোধ নেন। গ্রামের মাতব্বরের ছেলের হাতে মাইর খেয়ে খেয়ে বড় হয়েছেন। এমন কোনো কোনো (সবাই না) সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তা দেখবেন তারা পিয়ন দারোয়ান দিয়ে হাত-পা, শরীর টিপায়, ড্রাইভার দিয়ে গাড়ির দরোজা খোলায়, দেরি হলেই মহাবিপদে পড়ে ড্রাইভার। শরীর ভালো থাকার পরেও কাজের লোক দিয়ে জুতা খোলায়, হাতপাখা দিয়ে বাতাস করায়, কারণ ছাড়াই মানে অহেতুক ধমকায়, ক্ষমতা দেখায়। আসলে সে যখন ছোট ছিল তখন সে বা তার বাবা/মা গ্রামের মাতুব্বরদের বা জমিদারদের নফর হয়ে এই সেবা দিত। তাই এখন বঙ্গবন্ধুর করা স্বাধীন দেশে সে সুযোগ পেয়ে তার পুরাতন কষ্টের প্রতিশোধ নেয় বলে মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন। তারা আভিজাত্যের ভাব দেখায় যা তাদের কোনোদিনই ছিল না।
সবাই হয়তো দেখে থাকবেন। কিছুদিন আগেই ইংল্যান্ডের সদ্যবিদায় প্রধানমন্ত্রীর একটা খবর আর ছবি ভাইরাল হয়েছিল। বাসা বদলের সময় সদ্যবিদায় প্রধানমন্ত্রী নিজে বাসার মালামাল বোঝাই কার্টুন টানছেন। তিনি চাইলে কত লোক আসত তাকে সাহায্য করতে। তবুও এটাকে তিনি নিজের কাজ মনে করে নিজে করেছেন, অসম্মানের মনে করেননি। এই মানসিকতার অভাব হয়তো বা আমাদের অন্যতম বড় সমস্যা।
১৫ আগস্ট আমরা যারা জন্মগ্রহণ করেছি তারা যদি আমাদের জন্মদিনটা উৎসবের মত উৎযাপন না করে বঙ্গবন্ধু নামে উৎসর্গ করি। তিনি তো স্বাধীনতার মহানায়ক, সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। তার নামে নিজের কিছু উৎসর্গ করতে পারাও গর্বের, অহংকারের। মৃত্যুদিবসের মিলাদ বা দোয়া কিন্তু অনেক পুরাতন একটা রেওয়াজ। ৫০ বছর আগে কয়জন জন্মদিনের উৎসব করত, ছিল কি এটা আমাদের বাঙ্গালী কালচারে সে সময়! এটা করে আমরা মার্ক টেইলরের মত ভিন্ন উচ্চতায় উঠে যেতে পারি। এটাই তো সম্মান দেখানোর মাধ্যমে নিজেকে বড় প্রমাণ করার খুব বড় সুযোগ।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)






