তারিখ ৩ আগস্ট…সময় সকাল ৮.১০…স্থান রাজধানীর বিমান বন্দর রেলস্টেশন…গন্তব্য কলকাতা। খুব হুটহাট সিদ্ধান্ত নিয়েই এবারের ভারত সফর ছিল। তড়িঘড়ি যে কোনো সিদ্ধান্তে ভাল হবার মাত্রা অবধারিত থাকে তবে দিল্লি ,আগ্রা, দার্জিলিং সহ কলকাতার চেনা অচেনা বহু পথে সফর শেষ করে ফিরে এসে দেখলাম বেরিয়ে পড়ার দ্রুত সিদ্ধাতে কোনো হ্যাপা পোহাতে হয়নি বরং পথে পথে পেয়েছি বহু চেনা অচেনা মানুষ আর বহুদিন মনে রাখার মত কিছু বন্ধু। যাই হোক যে বিষয়টি নিয়ে আজ লিখব বলে বসেছি কথার মারপ্যাচ না বাড়িয়ে সেটিই বরং লিখি পরে একদিন লিখব ১২ দিন সফরের বারোয়ারী গল্প।
বাংলাদেশ আর কলকাতার মৈত্রী এক্সপ্রেস কলকাতার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় সকাল ৮: ১০ এ। ট্রেন পথ যেহেতু প্রথম তাই বেশ টেনশন নিয়ে ভোর ৫টার মধ্যে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়লাম। প্রকৃতির নিয়ম মেনে বাচ্চাদের জন্য একটু মন খারাপ হল তবে আবারো বাস্তবতার নিয়মে গাড়ির গতি বাড়তেই পেছনে পড়ে রইল ঘর বাড়ি মাথার মধ্যে চিন্তা সাত সকালে যেন জ্যাম ট্যাম এ না পড়ি। যদিও ওই সকালে জ্যামের কোনো সম্ভাবনা নেই তারপরও বিশ্বাস হতে চায় না এ শহরের অনেক কিছু। যাই হোক সময়ের বহু আগে আমিই যে একাই এসে পড়িনি টের পেলাম স্টেশনে গিয়ে।
সে এক বিশাল লম্বা লাইন প্রায় মেইন রাস্তা ছাড়িয়ে গেছে…বুঝলাম না এই লাইনের কারণ এবং শেষ কোথায়। জেনে জানলাম ইমগ্রেশন …চেকিং সহ নানা প্রক্রিয়া কে কার আগে পার হবে সেই জন্য এই দীর্ঘ লাইন। যাই হোক যথা সময় সব প্রক্রিয়া শেষ করে উঠলাম ট্রেনে …খুঁজে নিলাম নিজেদের আসন। তবে ট্রেনে ওঠার সময়ই পিছু ডাক.. ভাবলাম কেরে বাবা….দেখলাম যেহেতু টিভি রিপোর্টার সেই সুবাদে ২ /১ জন হয়তো চেনে সেই সুবাদে কেউ একজন সেলফি তোলার আমন্ত্রণ জানালো। ছেলেটির নাম খোকা থাকে চট্টগ্রাম ব্যবসার জন্য কলকাতা এখন তার ঘড় বাড়ি। বললাম সবে তো শুরু এখনো বহু পথ …..যেতে যেতে বহু ছবি তুলব। ভীষণ গল্পবাজ খোকা মিনিটে মিনিটে নানা উপকার করার ইচ্ছা নিয়ে কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা জানতে ছুটাছুটি সহ মজার গল্প শুরু করে। এক সময় বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়লো।
ট্রেন ছুটছে……..চলার প্রায় ২০ / ২৫ মিনিট পর আমার জায়গা থেকে একটু সামনের আসনে বসা এক ব্যক্তির দিকে চোখ পড়ছিলো বারবার। মুখটা দেখিনি তারপরও তাকে বেশ চেনা চেনা মনে হচ্ছিল। ভাবলাম ধুর এই আমার এক অসুখ হয় দুনিয়া শুদ্ধ সব লোককে চেনা লাগে নয়তো অচেনা। কিন্তু কিছু কি ভুল হচ্ছে..সেই একি আচরণ… না ভুল হবার না….লোকটির ৫/৬ মিনিট পর পর বড় বেশি যত্ন করে চুল আচঁড়াবার ধরণটা দেখার পর মনে হল এমন একটি লোককে বহু বছর আগে বহু জটলার মধ্যে আমি বারবার চুল আচঁড়াতে দেখেছি। কিন্তু তারপরও মনে করতে পারলাম না লোকটি আসলে কে ? ধুর মনের উপর আর চাপ না বাড়িয়ে খোকাকে একটু গলা উচিয়ে দেখলাম বেচারা মনযোগ দিয়ে গান শুনছে। আমিও ট্রেনের পর্দা সরিয়ে বাহির পানে চোখ রাখলাম।
সময় পার হয়ে গেছে প্রায় ঘন্টা। চেনা চেনা লাগা সেই চুল আচঁড়ানো লোকটাকে দেখলাম এবার উঠে দাড়িয়ে তার সঙ্গী সাথীদের সঙ্গে আলাপ সালাপ করছে। এখনো আমি তার মুখ দেখিনি। দেখলাম ধীর পায়ে ঘুরে দাড়ালো আস্তে আস্তে আমার দিকে এগিয়ে আসছে বলাটা ভুল হবে.. কারণ আমার সিটের পেছন দিকটাতেই প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে সবাইকে কয়েকবার এদিকটাই আসতেই হয় তিনিও তার ব্যতিক্রম নন।
তিনি আসলেন …এবং আমার কাছে এসে থমকে দাড়ালেন …..আমি চিনলাম ..উনি হাসলেন…আমি বললাম আরে আপনি …কেমন আছেন আনোয়ার ভাই ? সেই আনোয়ার ভাই যিনি নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হয়েও আমার কাছে পরিচিত আর মনে রাখার মত হয়ে আছেন ৫ বছর আগে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন এর নির্বাচন এর কারণে।
শুরু হল আলাপ। প্রথমেই জানতে চাইলাম কি ব্যাপার যুদ্ধে নামার আগে শরীরটাকে ঠিকঠাক রাখার জন্যই কি কলকাতা যাত্রা। আমি শুধু ঢিল ছুড়লাম সাথে সাথে যে লেগে যাবে বুঝলাম ফিরতি জবাবে। খানিক হেসে বললেন যুদ্ধে নামতে হলে শরীরটারে তো ঠিক রাখতে হবে সেই জন্য এক সপ্তাহের জন্য একটু যাচ্ছি কলকাতা ডাক্তার দেখাবো। ছুটছে ট্রেন …চলছে আলাপ…বললাম আনোয়ার ভাই সত্যি কি আপনি এবার নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে মেয়র পদে লড়াইয়ে নামবেন নাকি সেটা গুজব নাকি পিছু হটবেন। বরাবরি অনোয়ার ভাই এর চেহারার মাঝে এক ধরণের বিষন্নতা থাকে কখনো সখনো আত্মবিশ্বাসটাও নিশ্বাসের মত উঠানামা করে।
উচ্ছাস না থাকলেও বেশ স্পষ্ট করে জানালেন এবার আমি মেয়র পদে লড়বো। জানতে চাইলাম একদিন আপনি যাকে বিজয়ী করতে দলীয় পদ থেকে বহিস্কার হয়েছিলেন ? যার জন্য দেশ কাপাঁনো ওসমান পরিবারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য দাড়িয়ে ছিলেন ?…যাকে বিজয়ী করতে শহর শুদ্ধ লোককে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে ছিলেন? যার বিজয়ের জন্য নিজের জীবনবাজী রেখেছিলেন? যার বিজয়কে নিজের বিজয় ভেবে নিয়েছিলেন? যাকে বিজয়ী করতে আপনি তার পাশে ২৪ ঘন্টা মরনাস্ত্র হিসেবে কাজ করেছিলেন আজ ৫ বছর পর পাশা উল্টে কেন তার প্রধান শত্রু হয়ে নির্বাচনী মাঠে মেয়র পদে লড়াইয়ে নামতে চাইছেন? আপনার শক্তিটা কি ওসমান পরিবার নাকি জনগণ?
উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে আনোয়ার ভাই এর আচরণে বুঝেনিলাম দেশ কাঁপানো ওসমান পরিবারকে ফিরে পেয়ে দেশ মাতানো নারায়ণগঞ্জের বর্তমান মেয়র ডাক্তার সেলিনা হায়াত আইভির হাত তিনি বহু আগেই ছেড়ে দিয়েছেন। জানালেন, আমি নির্বাচন করব ইত্যেমধ্যে নিবাচন উপলক্ষ্যে ওয়ার্ড ওয়ার্কও শেষ করেছেন। জনগণ তার সাথে আছে…শক্তি আর আর্শীবাদ হিসেবে পাশে আছে ওসমান পরিবার। বললেন সেলিনা হায়াত আইভির সঙ্গে নেই তৃণমুলের কর্মীসহ ওয়ার্ডের কর্মীরা।
খুব দুঃখ আর অসহায় ভাবে বললেন আপনারা তো ৫ বছর আগের সব কিছু যানেন আমি আইভীর জন্য কি কি করেছি কিন্তু প্রতিদান কিংবা প্রাপ্য হিসেবে অর্জন কিছু নেই। বললেন মেয়র আইভী আওয়ামী লীগের হয়েও আওয়ামী লীগকে ধারণ করেন না! মেয়র হবার পর বহু অনুরোধ করবার পরও একদিনের জন্যও নারায়নগঞ্জ আওয়ামী লীগ অফিসে একটিবারের জন্যও আসেনি আইভী। ক্ষোভ নিয়ে জানালেন আইভীর মুখের কথা আর কাজে কোন মিল নাই। যে আওয়ামী লীগ হবার পরও নিজের দলকে ধারণ করেন না তার সাথে থাকাটা ভুল হয়েছিল বলে অনুতাপ আনোয়ার হোসেন এর কন্ঠে।
বললাম তার মানে টিকে থাকলে এবারও তাহলে লড়াইটা জমবে আর লড়াই জমাতে শরীর ফিট রাখতে চিকিৎসার কোন বিকল্প নেই সেই চিকিৎসা নিতেই আনোয়ার ভাই ছুটছেন কলকাতার পথে। ট্রেনও থামেনি আলাপও চলছে।
অনেক কথার শেষ দিকে এসে শেষ পর্যন্ত জানতে চাইলাম দলীয় মনোনয়ন আপনি পাবেন তো ? ভীষন চিন্তায় ভাঁজ পড়লো কপালে …..কয়েক সেকেন্ড নীরবতা..তারপর বললেন জানিনা কি হবে? চেষ্টা চালিয়ে যাব। তবে কার ভরসায় কে যে চেষ্টা চালাবে সেই চেষ্টা কতখানি সফল হবে সেই টেনশন ছিল আনোয়ার ভাই এর চোখে মুখে। ট্রেনে প্রথম দফার আলাপ আপাতত সেখানেই শেষ করলাম। ভাবলাম অনেক আলাপ হবে রাস্তা অনেক। কিছু পরে দেখলাম চট্টগ্রামের সেই খোকা আর খোকার আরেক বন্ধু ভীষণ ভাব জমিয়ে ফেলেছে আনোয়ার ভাই এর সঙ্গে। মনে হল কতকালের চেনা। ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনের উত্তাপ তখন দেশ এর সীমানা ছাড়িয়ে ভারতের সীমানায় আঁচ ছড়াচ্ছে।
ভারতীয় ইমিগ্রেশন পার হবার খানিক আগে আনোয়ার ভাই বললেন আপনারা পাশে থাকবেন তো? বললাম…. আপনার পাশে দরকার দল….নারায়ণগঞ্জের ভোটার আর… নারায়ণগঞ্জবাসীর ভরসা। আমি তো খবরের মানুষ দেখা হলেও হতে পারে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)










