“আজ বিকেল পাঁচটায় জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে একটি সম্মাননা পাব।”- এটা গত সপ্তাহে দেওয়া একজনের ফেসবুক স্ট্যাটাস। যিনি এই স্ট্যাটাস দিয়েছেন তিনি বিগত জীবনে অনেকবার দেশী বিদেশী সম্মাননা পেয়েছেন। সামনের দিনগুলোতে হয়তো আরো পাবেন। সুপরিচিত এই ব্যক্তিত্ব তারপরও ফেসবুকে নিজের অর্জনের কথা ফলাও করে লেখেন। লিখতে ভালোবাসেন।
তবে তিনি একাই যে এই ধরনের কাণ্ড করেন তা নয়। বাংলাদেশের সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত অনেককেই নিজের ঢোল নিজেরা বেশ জোরেশোরে পেটান। তারা এমন বিষয় নিয়েও আত্মপ্রচার করেন যা তাদের মান মর্যাদার জন্য উপযুক্ত নয়। যেমন বিকেল পাঁচটায় যে সম্মাননার কথা বিখ্যাত সেই ব্যক্তি বলেছেন সেই সম্মাননার চেয়ে আরো বড় বড় সম্মাননা তিনি অনেক আগেই পেয়েছেন।
সমসাময়িককালে ফেসবুকে কবি নির্মলেন্দু গুণ স্বাধীনতা পদক না পাওয়া নিয়ে এক জ্বালাময়ী স্ট্যাটাস দিয়ে অতঃপর স্বাধীনতা পদক লাভ করেছেন। এ থেকে ভবিষ্যতে হয়তো আরো অনেকে উদ্বুদ্ধ হবেন আরো বড় কোনভাবে আত্মপ্রচার ও পুরস্কারের দাবী জানাতে।
ফেসবুক আমাদের সামনে অনেক কিছুই উম্মোচিত করেছে। পত্রপত্রিকায় কিংবা টেলিভিশনে আগে শুধুমাত্র রাজনৈতিক নেতাদের পদক, ডিগ্রী অর্জন, খেতাব ও সম্মাননা নিয়ে প্রচার প্রচারণা থাকতো। ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হওয়ায় সব পেশা ও সাধারণ মানুষ এখন নিজেদের অর্জন নিয়ে প্রচার প্রচারণা চালাতে পারছে। সেই সুবাদে আমরা দেখতে পাই প্রায়শ সমাজের প্রতিষ্ঠিত মানুষেরা স্ট্যাটাস দেন- আজকে অমুক টিভিতে অতোটার সময় ওই অনুষ্ঠানে আমি থাকব। দেখার আমন্ত্রণ রইল।
এক দশক আগেও আত্মপ্রচারের এই সর্বব্যাপী রূপটা দেখা যায়নি। ৫ বছর আগেও চিত্রটা এমন ছিলো না। খুব বোঝা যাচ্ছে ধীরে ধীরে আত্মপ্রচার বাড়ছে। পদক ও সার্টিফিকেট প্রাপ্তি কিংবা সম্মাননা ও ডক্টরেক্ট প্রাপ্তি কিংবা বিভিন্ন জরিপের তালিকায় স্থান পাওয়া নিয়ে এক ধরনের হৈ চৈ করা প্রচার ইদানীংকালে অনেক বেশি বেশি চোখে পড়ে।
স্বভাবতই মনে প্রশ্ন জাগে- বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে এই যে আত্মপ্রচার ও আত্মতুষ্টির চোখে পড়ার মতো উপস্থিতি সেটা কী বাঙালী সংস্কৃতির অংশ? অর্থাৎ এটা এই দেশের মানুষের মধ্যে ছিল। কিন্তু প্রচার মাধ্যমের অভাবে এতোদিন প্রকটভাবে টের পাওয়া যায়নি। নাকি এটা একটা নতুন বাঙালী সংস্কৃতি যা যা ধীরে ধীরে বিকশিত হচ্ছে।
মনে পড়ে প্রায়১০/১২বছর আগে আমার এক ডাক্তার বন্ধুকে অর্থবিষয়ক একটি পত্রিকা সম্মাননা দিয়েছিল। ক্রেস্টটি সে তার অফিস কক্ষে রেখেছিল। ওই সম্মাননা অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য সে একটি ক্ষুদ্র চাঁদা দিয়েছিল। পরবর্তীতে আরো কয়েকটি সম্মাননা সে পেয়েছে। সেই বন্ধুটি একবার আমার কাছে এসেছিল পরামর্শের জন্য। ইউরোপের একটি প্রতিষ্ঠান তাকে ইমেইল পাঠিয়েছে। বিষয় হলো তারা তার অবদানের অন্য বিশ্বের বাছাই করা আরো ১০০ জনের সঙ্গে তাকেও পুরস্কৃত করতে চায়।
এ কারণে তাকে একটা ফরম পূরণ করে পাঠাতে হবে সঙ্গে দিতে হবে ২০ হাজার ডলার। এছাড়া পুরস্কার নেওয়ার জন্য তাকে আমন্ত্রণ জানানো হবে। নিজ খরচে তাকে সেখানে যেতে আসতে হবে। থাকার পয়সাও নিজেকেই দিতে হবে। আমার বন্ধু অনেক আগ্রহ নিয়ে আমাকে তাদের পাঠানো আগের তিন বছরের পুরস্কারপ্রাপ্তদের তালিকা দেখালো। অনেক নামকরা লোকজন সেই তালিকায় আছে।
আমি আমার বন্ধুকে বলেছিলাম, ওই পরিমাণ টাকা কোথাও দান করে দিতে! এরপর আর আমার বন্ধু আমাকে তার পুরস্কার প্রাপ্তির কথা জানায় না। ধারণা করি এতোদিনে সে হয়তো আরো কিছু পুরস্কার পেয়েছে। আমার মনে পড়ে একবার তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক একটি আঞ্চলিক পুরস্কারের প্রকল্প বাছাই কমিটিতে আমাকে রাখা হয়েছিলো। সেসময়ে বাংলাদেশে ওই বিষয়ের উপর উল্লেখ করার মতো তেমন কোন প্রকল্প ছিলো না।
আমি কী ঘটতে যাচ্ছে বুঝতে পেরেও এ কাজে নিজেকে যুক্ত করিনি। এই অঞ্চলের দেশগুলোর কয়েকটি সংস্থা এরপর কয়েকবছর একে অন্যকে পিঠ চাপড়িয়েছে, পুরস্কার দিয়েছে এবং নিয়েছে। সেই সুবাদে দেশ ভ্রমণ আর পত্রিকায় কাভারেজ। পুরস্কার দেওয়া নেওয়ার এই চর্চাটি অনেক বছর ধরেই চলছে। এতো গেলো আমি যা জানি কিংবা জানতে পেরেছি সেই কথা। আমি নিশ্চিত যে আপনারা যারা আমার এই লেখা পড়ছেন তাদের কাছে এমন আরো অনেক গল্প আছে।
প্রশ্ন হলো এ কোন সংস্কৃতির মধ্যে ঢুকে পড়ছে এই দেশ ও দেশের মানুষ। দেশ-বিদেশ থেকে এভাবে সার্টিফিকেট, পদক কিংবা সম্মাননা প্রাপ্তির যে প্রতিযোগিতা সেটাকে দীর্ঘ মেয়াদে সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য অকল্যাণকর মনে হয়। বিশেষ করে এই প্রতিযোগিতায় যখন একটি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রতিষ্ঠানও ব্যক্তি জড়িয়ে পড়েন। যেমন, গণমাধ্যম।
একটি রাষ্ট্রের তিনটি মূল কাঠামো যখন স্ব-স্ব দায়িত্বের দিক থেকে কোন ধরনের বিচ্যুতির মধ্যে পড়ে যায় তখন গণমাধ্যমের দায়িত্ব হয় বিষয়টি তাদের নজরে এনে বিচ্যুতি সংশোধন করা। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করছি তথাকথিত সার্টিফিকেট, পদক এবং সম্মাননার ইঁদুর দৌড়ে গণমাধ্যমও জড়িয়ে পড়ছে। তাহলে কী আমাদের দেশের আগামী প্রজন্ম এসব তথাকথিত পদক ও সার্টিফিকেট দেখে জ্ঞানী গুণীদের সম্মান দেবে?
এবং নিজেরা ও সার্টিফিকেট ও তালিকায় নাম উঠানোর পেছনে ছুটবে? তাহলে কী যারা নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন দেশও দেশের মানুষের জন্য তাদের অনুসারী থাকবে না এই দেশে? আমার খুব ভয় হয় তাদেরকে নিয়ে যারা মনে প্রাণে চান যে তাদেরকেও সম্মাননা দেওয়া হোক, সার্টিফিকেট দেওয়া হোক, পুরস্কার দেওয়া হোক কিংবা তাদের কথা ও প্রচার হোক কিন্তু অভিজ্ঞতার অভাব কিংবা সঠিক পন্থা অবলম্বন না করতে পারায়
চ্যানেলের অভাবে অর্থ দিয়ে কিংবা সিন্ডিকেট করে পুরস্কার, পদক কিংবা সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে পারছেন না। আপনাদের কি মনে হয় না যে, তারা এক ধরনের মানসিক চাপের মধ্যে থাকছেন। সেই চাপকে ফেসবুক স্ট্যাটাস লিখে রিলিজ করছেন। কেউ বা অন্য কোনো ভাবে সেই চাপ মুক্ত হচ্ছেন। যেমন, সরকারি কর্মকর্তাদের কেউ কেউ সাম্প্রতিক কালে নিজেদের পদ পদবী ব্যবহার করে পাঠ্যপুস্তকে তাদের ছড়া, কবিতা ও প্রবন্ধ ঢুকিয়ে দিয়েছেন নিজেদের নামটা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য।
এভাবেই হয়তো একদিন সত্যিকারের গুণীদের কদর কমে যাবে। আর কদর বাড়বে প্রচারসর্বস্ব ও রাজনৈতিক মদদপুষ্ট ব্যক্তি ও গোষ্ঠীদের। তখন সেটাই হবে স্বাভাবিক এক বিষয়। সেই ঢামাঢোলে বিভ্রান্ত হবে আগামী প্রজন্ম। যা চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আমাদের আর অন্য কিছু করার থাকবে না, যদি না আমরা এই সর্বনাশা আত্মপ্রচার থেকে নিজেদের বিরত না করি।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







