ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে ধাক্কা খেলেও এখন আবারও শক্ত অবস্থানে ফিরে এসেছেন বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ।
সংস্থাটির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক রাজ্য নির্বাচনের ফলাফল মোদিকে আগামী দশক পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার পথ তৈরি করে দিয়েছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়, সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বিজেপির বড় জয় এবং একই সময়ে তামিলনাড়ু ও কেরলা রাজ্যে ক্ষমতাসীনদের পরাজয় বিরোধীদের দুর্বল করে দিয়েছে। এর মাধ্যমে মোদির দল বিজেপি উত্তর ভারতের বাইরে আরও বিস্তৃত রাজনৈতিক প্রভাব গড়ে তুলেছে।
ব্লুমবার্গের ভোট বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ৭৫ বছর বয়সী মোদি এমন এক রাজনৈতিক কৌশল বাস্তবায়ন করছেন যার লক্ষ্য ২০২৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরিয়ে আনা। সেটি সম্ভব হলে তিনি ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা নেতাদের একজন হয়ে উঠতে পারেন।
ওয়াশিংটনের আটলান্টিক কাউন্সিল-এর দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, বিজেপি এখন এমন শক্ত অবস্থানে রয়েছে যে, তারা চতুর্থ মেয়াদে জয় পাওয়ার সবচেয়ে বড় দাবিদার হিসেবে নির্বাচনে যাবে।
হিন্দু ভোট একত্রীকরণে জোর
ব্লুমবার্গের বিশ্লেষণে উঠে আসে, ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে মোদি মূলত ভারতের হিন্দু ভোটকে একত্রিত করার কৌশল নিয়েছেন। ভারতের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ হিন্দু হলেও ঐতিহ্যগতভাবে এই ভোট জাতিগত ও আঞ্চলিক বিভাজনে ছড়িয়ে ছিল।
২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিরোধীরা কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও সাম্প্রতিক রাজ্য নির্বাচনে আবারও বিজেপির পক্ষে হিন্দু ভোটের বড় ধরনের সংহতি দেখা গেছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়।
বিজেপি ধর্মীয় পরিচয়, জাতীয় নিরাপত্তা এবং সরকারি সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার বিষয়কে সামনে এনে প্রচারণা চালিয়েছে। একই সঙ্গে বিরোধীদের ‘সংখ্যালঘু তোষণকারী’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক
পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনের আগে প্রায় ৯০ লাখ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। ভারতের নির্বাচন কমিশন বলেছে, ভুয়া ও অবৈধ অভিবাসীদের বাদ দিতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তবে বিরোধীদের অভিযোগ, দরিদ্র ও মুসলিম ভোটারদের টার্গেট করেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা বিজেপির পক্ষে সুবিধা তৈরি করেছে।
ভারতের রাজ্যসভার সদস্য কপিল শৈবাল বলেন, ‘উদার গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়েছে।’
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান
বিশ্লেষণে বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গে এক দশক আগে মাত্র তিনটি আসনে জয় পাওয়া বিজেপি এবার ২০৭টি আসন জিতে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে।
এই নির্বাচনে মোদি নিজেই প্রধান প্রচারক হিসেবে মাঠে নামেন। তিনি মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি সরকারকে অবৈধ অভিবাসন, সংখ্যালঘু তোষণ এবং দুর্নীতির অভিযোগে আক্রমণ করেন।
একই সঙ্গে নারী ভোটার ও তরুণদের উদ্দেশে চাকরি, নগদ সহায়তা ও আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেন।
অর্থনৈতিক সংস্কারে নতুন সুযোগ
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বাড়তে শুরু করায় ভারতের অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যেই মোদি জ্বালানি ব্যবহার কমানো এবং অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছেন।
রাজনৈতিক এই সাফল্য মোদিকে নতুন অর্থনৈতিক সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেবে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগ ও উৎপাদন খাত সম্প্রসারণে তিনি আরও সক্রিয় হতে পারেন।
আর্থিক পরিষেবা প্রতিষ্ঠান ‘নোমুরা হোল্ডিংস ইনকর্পোরেটেড’-এর অর্থনীতিবিদ সোনাল ভার্মা বলেন, ভারতের উৎপাদন খাতের প্রতিযোগিতা বাড়ানো, জমি অধিগ্রহণ আইন সহজ করা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের পুনঃপ্রশিক্ষণ দেওয়া এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।
বিরোধীদের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ
আগামী বছর গুজরাট, পাঞ্জাব, গোয়া এবং উত্তর প্রদেশে নির্বাচন বিরোধীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধীরা এখনও বিভক্ত এবং বিজেপির বিরুদ্ধে শক্ত ঐক্য গড়ে তুলতে পারেনি।
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র নেতা হান্নান মোল্লা বলেন, ‘বিরোধীরা এখনও ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি। তাই অন্তত আগামী এক দশকে বিজেপি বা মোদির বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো চ্যালেঞ্জ আমি দেখছি না।’








