ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের চলমান সংঘাত কোন আকস্মিক উত্তেজনার ফল নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ-এমন মন্তব্য করেছেন কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হামাদ বিন জসিম বিন জাবের আল থানি।
কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরার ‘আল মুকাবালা’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই মন্তব্য করেন।
আল থানি বলেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ইরানবিরোধী যুদ্ধ কোন আকস্মিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ, যার লক্ষ্য মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠন করা। তার মতে, এই পরিবর্তনের প্রভাব আগামী কয়েক দশক পর্যন্ত অঞ্চলটির রাজনীতিকে প্রভাবিত করবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে ‘হরমুজ প্রণালী’ অঞ্চলে। যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সাবেক এই কাতারি নেতা অভিযোগ করেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়ানোর চেষ্টা করেছেন।
তার ভাষায়, নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রকে ভুলভাবে বিশ্বাস করিয়েছেন যে, ইরানের সরকার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পতন ঘটবে এবং যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে। তবে বাস্তবে পরিস্থিতি তার বিপরীত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি সামরিক হস্তক্ষেপে নয়, বরং সংঘাত এড়িয়ে কূটনৈতিক সমাধানে।
তিনি উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে বিভক্তিকে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেন। এ কারণে তিনি একটি যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামো ‘গালফ ন্যাটো’ গঠনের আহ্বান জানান।
তার মতে, সৌদি আরবকে কেন্দ্র করে একটি ছোট কোর গ্রুপ দিয়ে এই জোট শুরু করা যেতে পারে। যা পরে ধাপে ধাপে সম্প্রসারিত হবে। পাশাপাশি তিনি তুরস্ক, পাকিস্তান ও মিশরের মতো দেশগুলোর সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ার পরামর্শ দেন।
গাজা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ
গাজায় চলমান পরিস্থিতিকে তিনি ‘নৈতিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয়’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তার দাবি, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সংঘাতে এখন পর্যন্ত ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, গাজাকে জনশূন্য করে সেখানে একটি ‘রিয়েল এস্টেট প্রকল্প’ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
সিরিয়া ও আঞ্চলিক কূটনীতি
সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ সম্পর্কে তিনি বলেন, তিনি জনগণের দাবির প্রতি যথেষ্ট মনোযোগ দেননি। একই সঙ্গে সিরিয়ার নতুন নেতৃত্বকে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
গোপন কূটনৈতিক তথ্য
শেখ হামাদ বিন জসিম বিন জাবের আল থানি আরও জানান, নব্বই দশকের শেষ দিকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিনটন প্রশাসনের একটি বার্তা ইরানের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন, যেখানে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা ছিল। সেই সময় ইরান কাতারকে যুক্তরাষ্ট্রঘেঁষা অবস্থানে থাকা দেশ হিসেবে দেখেছিল।
সাক্ষাৎকারে সাবেক কাতার প্রধানমন্ত্রী মূলত মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাতকে একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন ধরনের সহযোগিতামূলক জোট গঠনের আহ্বান জানান।


