যত যন্তর-মন্তর থাক এখানে সবাই অসহায়, বাকরুদ্ধ। এ রাস্তার কোনো বাপ-মা নাই। সেই ছাপ্পান্ন সালের ডি আই টি এখনও এখানে গর্বের তকমা। গলার রগ ফুলিয়ে বলি ‘আমাগো বাসা ডিআইটি রোডে, মাগার মেইন রোডে’। কি বড়ত্বের গর্ব! কিন্তু যাকে নিয়ে গর্ব তার দুর্দিনে কারো কোনো হাত নেই। এবার বর্ষায় বারবার ঢাকা শহর যখন ডুবসাঁতার দিচ্ছে তখন মালিবাগ ও খিলগাঁও চৌধুরিপাড়া কোনো রকম জেগে আছে। কিন্তু কয়েক মাস আগে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন আর ওয়াসার সংযোগ ঠিক করতে গিয়ে যে অস্ত্রোপচার চালানো হয়, তার সেলাইটি বাকি থেকে যায় বহুকাল। অর্থাৎ রাস্তা খোঁড়া হয়, ড্রেনের পাইপ বসানো হয়, ওয়াসার সংযোগ ঠিক করা হয়, কিন্তু পরে আর তা ইট সুরকি বালি দিয়ে ভরাট করে আগের জায়গায় আনা হয়নি। এবার স্মরণাতীত কালের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টির ধকল সামলে আগস্ট আসতে আসতে অন্য সড়কগুলো যখন শরীরে ব্যথা নিয়ে কোনো রকমে গতি ফিরিয়ে এনেছে, তখন রামপুরা ডিআইটি রোডের শরীরে ঘা থেকে পচন ধরে গেছে। চিকনগুনিয়া জ্বর চলে গেলে গিটে গিটে ব্যথা থাকে, কিন্তু ঘা হয়ে পচনক্রিয়ার কথা শোনা যায়নি। এই রাস্তাটির ক্ষেত্রে পচন থেকে শুরু করে অঙ্গহানীর চূড়ান্তটা ঘটে গেছে। প্রকৃত পক্ষে এই পচন ধরা পক্ষাঘাতগ্রস্ত রাস্তাটি বাড্ডা থেকে মৌচাক পর্যন্ত।
দেশের অনেক গ্রামে রাস্তার বেহাল দশা হলে গ্রামের মানুষ চরম ক্ষোভে ধানের চারা রোপন করে দেয়। যাতে গণমাধ্যমে চিত্র দেখে সরকার বাহাদুর ইট বালি খোয়া আর পিচ নিয়ে ব্যস্তত্রস্ত হয়ে ছুটে যায়। এরকম প্রতিবাদ জানিয়ে সফলও হয়েছে অনেক মানুষ। কিন্তু এখানে খিলগাঁও এর ‘গাঁও’ শব্দটি টিকে থাকলেও এটি এখন ম্যাগাসিটির এক টুকরো ইউরোপ। চাইলেই ধানের চারাও পাওয়া যায়না, রোপনের মানুষ তো নয়ই। এই খিলগাঁওয়ে এখন সন্ধে কাটাতে আসে দূর দুরান্তের তরুণ-তরুণী। ভারি ভারি বাইকে ছিপছিপে তরুণের পেছনে তন্বী তরুণী। ম্যাক্সিকান, ইউরোপিয়ান, আমেরিকান মেনু সঙ্গে বাংলার কিছু নতুন পুরোন খাবার, আপন কফির ভরপুর ঠান্ডা চকলেট ব্লেন্ড বিংবা এক কাপ চায়ের সঙ্গে অ্যালমন্ড গুড়ো। অ্যাপোলিয়ানোর পাস্তা তো আছেই। আবুল হোটেল থেকে খিলগাঁও তালতলায় নেমে গেলে সন্ধ্যাটা জমে যায়। কর্মব্যস্ত বা হতাশ জীবন চনমনে হয়ে যায়। কিন্তু দিন কিংবা রাত যেকোনো সময় আবুল হোটেল থেকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের দিকে যেতে রামপুরা বাজার পর্যন্ত রাস্তা যেন নতুন এক পার্বত্য এলাকা, এ এক বিপদজনক চরাই উৎরাই। কাদা পানি একাকার। রাস্তার পিচ, ইটের সোলিং, সুরকি সবই উঠে গেছে। বড় বড় খাদ আর ডাঙা হিসেব করে পেচিয়ে চলছে যাত্রীবোঝাই বাস। ঘোলা কাদা জল আছড়ে পড়ে চারদিকে। কখনো মনে হয় বাঁধ ভাঙা স্রোত পাল্লা দিয়েছে বাসের সাথে। আশে পাশে দাঁড়িয়ে থাকলে আর নিস্তার নেই। 
যারা রিক্সায় এই হাজীপাড়া, পশ্চিম রামপুরা, চৌধুরিপাড়া পার হন তারা নিজের কোমর রক্ষা নিয়ে সংশয়ে পড়ে যান। কতজন যে কোমরের ব্যথায় কঁকিয়ে উঠেছেন অথবা এই এলাকা থেকে দীর্ঘস্থায়ী কোমর-যন্ত্রণা নিয়ে ঘরে ফিরেছেন তার হিসাব নেই। মনে ব্যথা নিয়েও কম মানুষ যান নি।কয়েকদিন আগের কথা। এক দম্পতি মোটর সাইকেলে ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ আমেজে যাচ্ছিলেন। বোঝা যায় শপিংএ হয়তো যাচ্ছিলেন। এখানে পানির ভেতর দিয়ে চালিয়ে দিলেন গাড়ি। পারও হয়ে গেলেন লুকিয়ে থাকা একটি বড়সড় গর্ত। কিন্তু মহিলাটি চিৎকার দিয়ে উঠলেন, আমার মোবাইল….। তার পরবর্তী এক ঘন্টার কিছু সময় আমি সেখানে দাঁড়ানো ছিলাম। দূরে মোটর সাইকেলটি রেখে এ দম্পতি কাপড় চোপড় ভিজিয়ে পানির মধ্যে হাতড়ে ফিরছিলেন মোবাইল। দৃশ্যটি দেখে খুব খারাপ লেগেছে। বালকসুলভ চিন্তা থেকে মনে হচ্ছিল তারা মাছ ধরছেন। এমন ঘটনার সাক্ষী বা শিকার যে কতজন তার হিসাব নেই। এই তো সেদিন বেশ পরিপাটি এক তরুণী রিক্সায় যাচ্ছিলেন। ঠিক হাজীপাড়া পেট্রোলপাম্প পেরিয়ে এসে রিক্সাটি একটি গর্ত থেকে আলগোছে নুইয়ে পড়লো। তরুণী পানি ঝাপটে উঠে পড়লেন ঠিক। দেখে মনে হলো খুব বেশি ব্যথা পাননি। রিক্সাটিও উঠে দাঁড়ালো। রাস্তায় দুর্ঘটনার এই যন্ত্রণা তো আর মানুষের সামনে রাষ্ট্র করা যায় না। আবার হাওহাও করে কান্নাকাটিও করা যায় না। হয়তো তরুণী ব্যথা সয়েই ভেজা কাপড়ে রিক্সায় উঠে চলে গেলেন। সেদিন সকালে হঠাৎ বৃষ্টি নামলো। রাস্তায় সাইকেল হাঁটিয়ে নিজেও পায়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন এক চায়ের দোকানি। রাস্তায় এক ধাক্কায় তার সাইকেলে কার্টনে থাকা ড্যানিশ কন্ডেন্স মিল্কের বেশ কিছু ডিব্বা টুপ-টাপ করে পড়ে গেল। লোকটির কি বেহাল অবস্থা! দিনে অন্তত ১০টি তো এমন দুর্ঘটনা ঘটেছেই। সে হিসেবে গত চার মাসে ১২’শটি দুর্ঘটনা ঘটেছে এখানে। এসব দুর্গতি নিয়ে টিভি রিপোর্ট হয়েছে বেশ কিছু। সেগুলো দেখে এই এলাকার মানুষ বিনোদিত হয়েছে। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি।
কিছুদিন আগে ক্রিটিক ও পারি পত্রিকার সম্পাদক লাইলা খালেদা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন ‘আমাদের মেয়র সাহেব অসুস্থ তাই ‘ডি আই টি রোডও অসুস্থ, কাকে বললে রোড ভালো হবে? উভয়েরই সুস্থতা কামনা করি।’ হ্যা, মেয়র না ফিরলে মনে হয় রাস্তাটি ফিরে যাবে ষাটের দশকের মেঠো পথে। যখন ডিআইটি এই রাস্তার প্রকল্পই নেয় নি। মাটির রাস্তা দিয়ে বহুক্ষণ পর পর দুয়েকটি রিক্সা যায়। সন্ধা নামতে নামতে রাস্তাটি স্মশান হয়ে যায়। এখন জনবাহুল্যে তা হওয়ার জো নেই। শুধু রাস্তাটি হয়ে যাবে গ্রাম্য এক অবহেলিত মেঠো পথ।
এইসব ভাবনার ভেতর লক্ষ করা গেল গত দুদিন রাতে ডাইনোসারের মতো একাধিক নির্মাণ যন্ত্র আর শতাধিক শ্রমিক পুরোনে ইট, সুরকি নিয়ে দ্রুততার সঙ্গে গর্ত বোজাচ্ছে। রাস্তার সুয়্যারেজের স্লাব তুলে জমে থাকা কাদামাটি সাফা করছে। রীতিমত এক যজ্ঞ। পরিকল্পনা নেই, স্থায়ী কাজের চিহ্ন নেই। কোনো রকম একটা কিছু করে রাস্তাটির বেহাল দশা ঢেকে ফেলার তৎপরতা। কারণ কী? জানলাম, ক’দিন বাদেই মৌচাক মালিবাগ ফ্লাইওভার উদ্বোধন। বিশাল আজদাহা ফ্লাইওভারটি নিয়েও বহু কথা রটেছে। বহু ভুলে ভরা নাকি এই ফ্লাইওভারে যানজট হবেই। এ কারণে উর্ধাকাশেই ট্রাফিক সিগন্যাল বসানো হয়েছে। আর সে উপলক্ষেই এই রাস্তার বেহাল দশা আপাতত ঢেকে ফেলা হচ্ছে। কোনোরকম দারিদ্র লুকানোর মতো ‘মেঝেতে গর্ত ছিল…..কিনেছি কার্পেট তাই সস্তা দরে’। লোপামুদ্রার সেই গানটির কথা খুব মনে পড়ে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







