মুক্তিযুদ্ধে কণ্ঠযোদ্ধা হিসেবে বিশেষ অবদান রাখায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের দুই সঙ্গীত শিল্পী সুজেয় শ্যাম এবং ইন্দ্রমোহন রাজবংশী’সহ পাঁচ গুণী ব্যক্তিকে সম্মননা দিয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের আয়োজনে চার দিনব্যাপী মুক্তিসংগ্রাম সাংস্কৃতিক উৎসবের তৃতীয় দিনে এ সম্মাননা প্রদান করা হয়। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সেলিম আল দীন মুক্তমঞ্চে তাদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম।
এসময় দেশের মুক্তিযুদ্ধ, প্রশাসনিক ব্যবস্থার পুনর্গঠন এবং উন্নয়ন রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমামকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। দেশের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যখাত এবং রাজনীতিতে বিশেষ অবদান রাখার জন্য এবাদুল বুলবুল এবং আবৃত্তিকার ও সংস্কৃতিকর্মী হিসেবে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরুপ হাসান আরিফকে সম্মাননা প্রদান করা হয়।
সম্মাননা পাওয়ার পর শিল্পী ইন্দ্রমোহন রাজবংশী বলেন: ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় এসে সম্মাননা পেয়ে আমি অত্যন্ত আনন্দিত, গর্বিত এবং ধন্য। মুক্তিযদ্ধের সময় প্রতিবাদী গান গাওয়ার সাহস অনেকেই করেননি, কিন্তু সেই দুঃসাহস দেখানোর সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। এই গানের জন্যই আমরা কন্ঠযোদ্ধারা খান সেনাদের প্রকাশ্য শত্রুতে পরিণত হয়েছিলাম।’
‘‘ছয় দফার পর থেকেই মূলত দেশের স্বাধীনতার জন্য গান গাওয়া শুরু করি। ৭০ সালে যখন নির্বাচনের আগে বঙ্গবন্ধুকে ছেড়ে দেওয়া হলো তারপর থেকে এসব গান প্রচুর গাওয়া হতো। নির্বাচনের আগেই আমরা বুঝতে পেরেছিলাম যে, আওয়ামীলীগকে কেউ রুখতে পারবে না। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর ভাষণই আমাদেরকে স্বাধীনতার পথ দেখিয়েছে, আমাদেরকে সাহস যুগিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের স্বাধীনতার ডাকের পর আমরা কণ্ঠযোদ্ধারা বেতার কেন্দ্রে পুরোদমে কাজ শুরু করি।’
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এই কণ্ঠযোদ্ধা বলেন: ‘সম্মুখযুদ্ধ করার উদ্দেশে আমি আগরতলায় গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ক্যাম্পে নাম লিখেছিলাম। ক্যাম্পে একদিন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে আমার গাওয়া গান বাজছিলো, তখন ক্যাম্পের প্রধান ড. প্রফুল্ল কুমার সরকারকে আমার কণ্ঠের গান প্রচারের কথা জানায়। তখন তিনি বলেছিলেন, সম্মুখযুদ্ধে আপনি একটি রাইফেল নিয়ে মোকাবেলা করবেন, কিন্তু আপনার কণ্ঠে হাজার হাজার রাইফেলের শক্তি আছে। সকল বাঙালিদের প্রেরণার উৎস আপনার গলা। তখন তিনি আমাকে কলকাতায় অবস্থিত বেতার কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেন।’
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সুরকার ও সঙ্গীত শিল্পী সুজেয় শ্যাম মুক্তিযুদ্ধের স্মুতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন: ‘বঙ্গবন্ধুর জন্যই আমার স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি। ৭ই মার্চে বেতারে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার পরই আমাদের রক্তে বাঙালির চেতনার জাগরণ সৃষ্টি হয়েছিলো। আমি কন্ঠযোদ্ধা হিসেবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগদান করি ৮ জুন। দেশের জন্য মুক্তিযোদ্ধারা জীবন দিয়ে গেছেন আওয়ামীলীগ, বিএনপি কিংবা জাতীয় পার্টির জন্য নয়, দেশের স্বাধীনতার জন্য।’
এসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন: ‘বঙ্গবন্ধুর পুরো পরিবার বুকের তাজা রক্ত দিয়ে বুঝিয়ে গেলেন তারা দেশকে কত ভালোবাসতেন। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালে অনেকেই বঙ্গবন্ধুর সাথে বেঈমানি করেছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ে তুলতে বর্তমান তরুণদেরই কাজ করে যেতে হবে।’
অনুষ্ঠান শেষে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের এই দুই গুণী শিল্পী উপস্থিত দর্শকদের মুক্তিযুদ্ধ পূর্ব ও মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ের নিজ কণ্ঠের জনপ্রিয় গান গেয়ে শুনান। এসময় দর্শকরা দাড়িয়ে এবং হাততালি দিয়ে দুই কণ্ঠযোদ্ধাসহ অন্যান্য সকল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান জানান।
আধুনিক রাষ্ট্র গঠনে আওয়ামীলীগ সরকারের কথা বর্ণনা দিতে গিয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম বলেন: ‘২০২০ সালে হবে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে হবে বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী। দুই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই রুপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নে এগিয়ে যাচ্ছি। আজকে আমরা আধুনিক ও উন্নয়নশীল দেশে পা দিয়েছি। আর কয়টি শর্ত পূরণ করলে আমরা মধ্যম আয়ের দেশে চলে যাবো। ২০৪১ সালে বাংলাদেশ হবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর আধুনিক ও উন্নত একটি দেশ। ভবিষ্যৎ সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে প্রথম সারির সৈন্য হিসেবে তরুণদের একসাথে কাজ করতে হবে।’
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বেশি করে শোনার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের প্রধান মূলমন্ত্র ছিলো বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ। বক্তব্যে প্রত্যেকটি বাক্যের মধ্যে হৃদয় থেকে উৎসারিত বাণী রয়েছে, যেটি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে, মনে সাড়া জাগায়। গভীর তাৎপর্যতার জন্যই ইউনেস্কো ভাষণকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়েছে। ভাষণে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার কথা বলেছেন, সেই স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি। কিন্তু মুক্তির কথা বলতে তিনি শোষিত মানুষের দারিদ্র্য, ক্ষুধা, অশিক্ষা, অন্ধকার, কুসংস্কার, ধর্মান্ধ ও অর্থনৈতিক মুক্তির কথা বলেছিলেন। সেই মুক্তি অর্জন করে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যেই এগিয়ে যাচ্ছে আওয়ামীলীগ সরকার।’
উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারাজানা ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক শেখ মনজুরুল হক, ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রর পরিচালক অধ্যাপক বশির আহমেদসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা।









