দেশের বড় স্কুলগুলোতে একসময় শিশু সংগঠনের শাখা থাকতো। তাছাড়া স্কুলগুলোতে বছরব্যাপী নানা শিক্ষা সহায়ক সাংস্কৃতিক কার্যক্রম হতো।
বর্তমানে শিক্ষার্থীদের শুধু পড়াশোনার ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়ায় স্কুলগুলোতে শিশুদের মানসিক বিকাশে সহায়ক কার্যক্রম খুব একটা নেই। নামকরা-অচেনা সব স্কুলেরই একই অবস্থা।
মেয়েদের জন্য দেশের প্রসিদ্ধ একটি স্কুল ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজ। কথা বলেছিলাম এখানকার প্রধান শাখার বিভিন্ন শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। তারা জানায়, এই স্কুলে মাঝেমধ্যে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রতিযোগিতা হয়। ওইসব প্রতিযোগিতায় যারা যারা অংশ নিতে ইচ্ছুক, তাদেরকে নাম দিতে বলা হয়। যারা পারে, তারা অংশ নেয়। কিন্তু যারা পারে না, তারা অংশ নেয় না।
শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদাভাবে কোন সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের ক্লাস হয় না, বা আলাদাভাবে শেখানো হয় না। এই স্কুলে কোন শিশু সংগঠনের কার্যক্রম নেই। শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ অবসরে সময় কাটায় মোবাইল ফোনে বা টিভি দেখে।
এই বিষয়ে প্রশ্ন করেছিলাম রাজধানীর বিখ্যাত গভমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলের শিক্ষার্থীদের। তারা জানায়, তাদের স্কুলে শিক্ষা সহায়ক কিছু কার্যক্রম হয়, কিন্তু পড়াশোনার চাপে এগুলোতে অংশ নেয়ার খুব একটা সময় পায় না। এরপরও অবসর পেলে হয় তারা টিভি দেখে, অথবা মোবাইল ফোনে, ফেসবুকে সময় কাটায়। কোন শিশু সংগঠনের কার্যক্রমও এই স্কুলে নেই।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো: আব্দুল খালেক বলেন, আগে এসব কার্যক্রম কম হতো। তিনি যোগ দেয়ার পর গত কয়েক বছর ধরে আগের চেয়ে শিক্ষা সহায়ক কার্যক্রম বেশি হচ্ছে।
কথা বলেছিলাম ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলও কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। তাদের স্কুলে শিক্ষা সহায়ক সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের সুযোগ আছে, তবে সবাই এতে অংশ নেয় না। বাইরের প্রতিযোগিতায় অনেকে অংশ নেয়। কোন শিশু সংগঠন এখানে সক্রিয় নয়। শিক্ষার্থীরা অবসর সময় কাটায় মোবাইলে গেমস, ফেসবুক, ইউটিউবে।
এই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ সেলিনা বানু জানান, এখানে বিভিন্ন ধরণের সাংস্কৃতিক কার্যক্রম চালু আছে। তবে আগের মতো বিভিন্ন ধরনের দেশীয় খেলাধুলা বা ওইরকম বিনোদনের ব্যবস্থা নেই।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘এখন শিক্ষার্থীরা একটু সময় পেলেই এক কোনায় বসে ফেসবুকে মগ্ন হয়ে পড়ে। আমাদের সময় এমনটি ছিলো না। আমরা ঘুড়ি ওড়াতাম, কানামাছি ভোঁ ভোঁ খেলতাম। কত আনন্দের ছিল!’
কেস স্টাডির তিনটি স্কুলের চেয়ে রাজধানীর নাখালপাড়া হোসেন আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের অবস্থান একটু নিচে। সেখানকার ছাত্রদের সাথে কথা বলে জানলাম, স্কুলে মাঝে মধ্যে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম হয়, তবে নিয়মিত নয়।
বিষয়টি স্বীকার করে স্কুলের প্রধান শিক্ষক ফরিদা বেগম জানান, তাদের স্কুলে বছরের শুরুতে এ ধরণের কার্যক্রম বেশি হয়। বছরের শেষ দিকে পরীক্ষা ও অন্যান্য ব্যস্ততা থাকায় এগুলো সম্ভব হয়ে ওঠে না। তবে সারা বছরই এসব কার্যক্রম থাকা দরকার বলে মনে করেন তিনি।
বড় স্কুলগুলোতে খেলার মাঠ থাকলেও ছোট বা কিন্ডারগার্টেন স্কুলে তা নেই। বিশেষ করে রাজধানীতে। শিশু সংগঠনগুলোও স্কুলগুলোতে সক্রিয় নয়। খেলাধুলা বা সংস্কৃতি চর্চা ছাড়া শুধু পড়াশোনা বেষ্টিত হয়ে একটি আবদ্ধ পরিবেশে বেড়ে উঠছে শিশুরা। তাদেরকে এই আবদ্ধ পরিবেশ থেকে মুক্তি দেয়া দরকার। এজন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সচেতনতা দরকার বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে কথা হয় কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে। তাদের সবার একই মত। পড়াশোনা আগের চেয়ে প্রতিযোগিতামূলক হয়ে গেছে। পরীক্ষার চাপ সামলাতেই ব্যস্ত থাকতে হয় শিশুদের। বাধ্য হয়ে কোচিংয়ে দিতে হয়। হোমওয়ার্ক রেডি করতে হয়। বাচ্চারা দম ফেলার ফুরসত পায় না। বাচ্চাদের চাপ কমাতে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা উঠিয়ে ফেলার মত দিয়েছেন অনেকে।
তবে অনেকেই স্বীকার করেছেন, অভিভাবক হিসেবে তাদেরও দোষ আছে। তারা শুধু বাচ্চার ভালো রেজাল্ট চান। এজন্য যা করার তা করেন। পরিণামে হারিয়ে যায় শিশুটির অমূল্য শৈশব। বেড়ে উঠতে থাকে সংস্কৃতিবিমুখ হয়ে।









