‘নির্বাচনে বিজয় একটা আনুষ্ঠানিকতা মাত্র’, নির্বাচনে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের ওই ধরণের বক্তব্যকে দলটির রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছেন বিশিষ্ট জনেরা। তারা বলছেন: নির্বাচনকে সামনে রেখে এমন নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনীতিবীদরা এমন হালকা চালের কথাবার্তা বলে থাকেন। পাশাপাশি, গণতান্ত্রিক ধারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এমন কার্যক্রম পরিহারের পরামর্শও তাদের।
শুক্রবার সকালে ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু ভবনের সামনে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উপলক্ষে দলের ত্রাণ উপকমিটির রিকশা-ভ্যান বিতরণ অনুষ্ঠানে ওবায়দুল কাদের বলেন: প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়নে-অর্জনে জনগণ খুশি, কাজেই আগামী নির্বাচন নিয়ে আমাদের কোনো প্রকার সংকোচ, কোনো প্রকার ভয় নেই। কারণ উন্নয়ন-অর্জন করে আমাদের কর্ম দিয়ে আমরা ভয়কে জয় করে ফেলেছি। নির্বাচনে বিজয় একটা আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।
আওয়ামী লীগের এ আত্মবিশ্বাস নির্বাচনকে সামনে রেখে দলটির জন্য কতটুকু সুফল বয়ে আনবে, এ প্রশ্নের জবাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন: আমাদের জাতীয় নির্বাচন সামনে, আমরা স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা করতে পারি যে, সকল রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। গণতান্ত্রিক ধারায় এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু গত জাতীয় নির্বাচনে একটি বড় রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেনি। অংশগ্রহণ না করাটাও দলের ইচ্ছের ওপর নির্ভর করে। কোন রাজনৈতিক দল যদি নির্বাচনে অংশ করতে চায় তাহলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে, আর না করতে চাইলে তাদের জোর করার কোন বিধানও গণতন্ত্রে নাই। আমরা যেটি লক্ষ করেছি গত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি শুধু অংশগ্রহণ থেকেই বিরত থাকেনি, নির্বাচন যাতে না হয় সেজন্য চেষ্টা করেছে। সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার নির্যাতন করেছে। চলন্ত গাড়িতে অগ্নি সংযোগ করে মানুষ হত্যা করা সহ নানা অপকর্মে তারা লিপ্ত ছিলো। এটা গণতন্ত্রের জন্য খুবই খারাপ-মন্দ দৃষ্টান্ত। সেই জায়গা থেকে আমি এবার আশা করবো শুধু বিএনপিই নয়, কোন রাজনৈতিক দলই মনে হয় না সেদিকে আবার যাবে। ক্ষমতাসীনদল আওয়ামী লীগের কাছে আমার আশা, তারা তাদের রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে এগিয়ে যাবে। বিএনপি এবং অন্যান্য দলও তাদের কৌশল নির্ধারণ করবে। সব কিছুই থাকতে হবে গণতান্ত্রিক নিয়ম নীতির মাধ্যমে। গণতান্ত্রিক নির্বাচনী যে প্রক্রিয়া রয়েছে সেখান থেকে কোন দল বিচ্যুত হোক সেটাও আমরা চাইবো। কোন দল গণতন্ত্রকে পাশ কাটিয়ে কিছু করতে চাইবে সেটা আমরা সমর্থন করবো না।

বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের সাফল্যের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, আমি মনে করি এখন দেশের সার্বিক যে রাজনৈতিক অবস্থা, একটি স্থিতিশীলতার মধ্যদিয়ে দেশে এগিয়ে চলেছে। সরকার একটা গতিশীলতা অর্জন করেছে, জাতিসংঘ যেভাবে সল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের প্রক্রিয়াতে স্বীকৃতি দিয়েছে তাতে আমি মনে করি আমাদের সকল রাজনৈতিক দল উজ্জ্বিবিত হবে। রাজনীতি তো দেশের মানুষের জন্য, দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য রাজনীতিবীদরা রতাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে। নির্বাচনী ম্যান্ডেট নিয়ে প্রত্যেক রাজনৈতিক দলই চাইবে দেশ পরিচালনায় অংশগ্রহণ করতে। নির্বাচনের আগে হয়তো আমরা আরও জোট দেখতে পাবো, রাজনৈতিক দল গুলো এক সঙ্গে হবে। এগুলো গণতান্ত্রিক রীতি নীতিতে সত্য। কিন্তু কোন ভাবেই যেনো গণতন্ত্রের সুযোগ লো এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া না হয় যাতে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন আসে, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন আসে।
এ বিষয়ে রাষ্ট্র বিজ্ঞানের সহযোগী প্রভাষক শান্তনু মজুমদার একটু অন্যভাবে দেখছেন। চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন: আওয়ামী লীগ নেতাদের এ ধরণের বক্তব্যকে ততটা সিরিয়াসলি নিই নাই। নির্বাচনকে সামনে রেখে অনেক কথা চালাচালি চলে। আমি যদি ভুল না করি কিছুদিন আগে মির্জা ফখরুল সাহেব বলে ছিলেন, অসংহিস ভাবে যদি না হয়, দাবি আদায়ে রাস্তায় নামবে বিএনপি। এখন প্রশ্ন হলো এ ধরণের গণতন্ত্রকে আমরা কতটুকু ওয়েট দিবো। নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনীতিবীদরা এমন হালকা চালের কথাবার্তা বলে থাকেন। এটাকে আমি ততোটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি না। আমরা মনে হয় আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী প্রস্তুতি শুরু করতে যাচ্ছে বা শুরু করে দিয়েছে। বিরোধী দল কতোটুকু অপ্রস্তুত আছে তার চেয়ে আওয়ামী লীগের বড় চ্যালেঞ্জ হবে দলের ভেতর মনোনয়ন প্রত্যাশীদের নিয়ন্ত্রণ করা। দলীয় সভাপতির সিদ্ধান্তে হয়তো কেউ প্রতিবাদ করবে না। কিন্তু যারা মনোনয়ন পাবেন তাদের পক্ষে যারা মনোনয়ন পাবেন না, তারা কতোটা সক্রিয় থাকবেন? এটা মনে হয় আওয়ামী লীগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। ১০ বছর ক্ষমতায় থাকার পর এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে, আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়া মানেই নির্বাচিত হওয়া। সেই জায়গা থেকে আওয়ামী লীগের নিজের মধ্যে শৃঙ্খলা ধরে রাখাটা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা সবাই প্রত্যাশা করি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হোক।

এদিকে কোনঠাসা বিএনপি এমন অবস্থায় আওয়ামী বিরোধীদের অবস্থান কী হবে, এ প্রশ্নের জবাবে আরেফিন সিদ্দিক বলেন: আওয়ামী বিরোধী যে শক্তির কথা বলা হয় সেটা আসলে মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে আমরা দেখেছি, মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে। বঙ্গবন্ধু ছিলেন আমাদের অবিসংবাদিত নেতা। পাকিস্তানের সর্বোশেষ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু সারা পাকিস্তানের নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগ অধিকাংশ আসন অর্জন করেছিলো। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়ে ৭ কোটি মানুষ যখন ঝাপিয়ে পড়ে আওয়ামী বিরোধী বলে কোন বিষয় ছিলো না। এখানে যেটা ছিলো স্বাধীনতার বিরোধীতা। পরবর্তীতে বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে চলেছে, কিছু স্বাধীনতা বিরোধী আলবদর আলসামস রাজাকার নিজেদের বিভিন্নভাবে সংঘবদ্ধ করে সরকারের নানা ধরণে বিরোধীতা করেছে এবং পরবর্তীতে জাতির জনককে স্বপরিবারে হত্যা করেছে। সেই স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির এ দেশে রাজনীতি করার কোন অধিকার থাকতে পারে না। কিন্তু তারা বিভিন্ন নামে রাজনীতি করেছে এবং ক্ষমতায়ও এসেছে। ভবিষ্যতেও তারা ষড়যন্ত্র থেকে দূরে সরে যাবে সেটা মনে হয় না। ষড়যন্ত্র এখনও লক্ষ করা যাচ্ছে। আমি মনে করি মক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ যারা আছেন, তাদের এ ব্যাপারে সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে। দেশের ১৬ কোটি মানুষের অধিকাংশই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী এবং স্বার্বভৌমত্ব রক্ষায় বদ্ধ পরিকর। সেই জায়গা থেকে বলতে পারি স্বাধীনতা বিরোধীদের চক্রান্ত কখনই সফল হবে না।
এ বিষয়ে শান্তনু মজুমদার বলেন,‘আওয়ামী বিরোধী যে চক্রটা ছিলো তারা বিভিন্ন নামে বাংলাদেশে রাজনীতি করে এসেছে। এখন যেটা দেখা যাচ্ছে, নতুন কোন দল নয় তারা আওয়ামী লীগেই আশ্রয় নিচ্ছে। অনেকে মনে করেছিলো, এমন পরিস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধে পক্ষে আরও অনেকগুলো দল রাজনীতিতে আসবে। কিন্তু সেটা হয়নি। আবার বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাম রাজনৈতিক দল গুলোও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারছে না। সে জায়গা থেকে বিরোধীরা আওয়ামী লীগেই ঢুকে যাচ্ছে। যার প্রমাণ আমরা এর মধ্যেই দেখেছি। এখন এটাকে আওয়ামী লীগ এটাকে কীভাবে মোবাবেলা করবে সেটা দেখার বিষয়।’
জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নানা রাজনৈতিক দল নানা পরিকল্পনা-কৌশল করবে, যা সামনের দিনগুলোতে আরও চোখে পড়বে বলেও জানান তারা।








