সব অভিযোগ ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’: মহীউদ্দিন খান আলমগীর

অনিয়মের মাধ্যমে ঋণ প্রদান, কমিশন নেয়া, লোকবল নিয়োগ ও পরিচালনায় অব্যবস্থাপনাসহ উত্থাপিত সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আলোচিত বেসরকারি খাতের ফারমার্স ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মহীউদ্দীন খান আলমগীর। একই সাথে তিনি দাবি করেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে যদি অনিয়ম হয়ে থাকে তাহলে তা শাখা ব্যবস্থাপকদের কারণে হয়েছে।
সোমবার সংসদে বক্তব্যে মহীউদ্দীন খান আলমগীরের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলেও দাবি করেন তিনি। এ বিষয়ে তিনি স্পিকারের ‘প্রটেকশন’ ও চেয়েছেন।
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ ও সংসদ সদস্য মহীউদ্দীন খান আলমগীর বর্তমান সংসদে সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গত সরকারে কিছু দিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বেও ছিলেন তিনি।
২০১৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকার কয়েকটি ব্যাংক অনুমোদন দিলে তার একটি (ফারমার্স ব্যাংক) পান মহীউদ্দীন খান আলমগীর। তবে কয়েক মাস ধরে ঋণ কেলেঙ্কারীর দায়ে বেশ সমালোচনার মুখে রয়েছেন তিনি। সম্প্রতি ঋণদানে কমিশন নিয়েছেন তিনি এমন প্রতিবেদনও প্রকাশ হয় গণমাধ্যমে।
সমালোচনার জবাবে আইনসভার প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় দাঁড়িয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজের বক্তব্য উপস্থাপন করে মহীউদ্দীন খান আলমগীর বলেন, তিনটি সংবাদপত্র অসত্য তথ্য প্রকাশ করেছে। তারা বলেছেন, ‘ফারমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে আমি ব্যক্তিগতভাবে ঋণ বিতরণের আগে কমিশন নিয়েছি।’
‘আমার ৭৭ বছর বয়সে আমি কখনও এত বড় অসত্য কথার সম্মুখীন হইনি। শিল্প ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় ছিলাম, কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলাম। শিল্পঋণ সংস্থার সভাপতি ছিলাম। আমার কার্যকলাপ সম্পর্কে এ ধরনের কোনো উদাহরণ কেউ দিতে পারেননি।’
ফারমার্স ব্যাংক নিয়ে অভিযোগের জবাব দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকে থাকা নিজের ব্যাংক হিসাবের ‘পুরো অংশ’ সংসদে নিয়ে আসেন মহীউদ্দীন খান।
তিনি বলেন, এই অংশে কোথাও কেউ প্রমাণ করতে পারবেন না যে কোনো ঋণ গ্রহীতার কাছ থেকে আমার এখানে কোনো অর্থ ঢুকেছে। এ প্রসঙ্গে বলা প্রয়োজন, পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী আমি ১৭ জুলাই ১৩ কেটি টাকা গ্রাহকের হিসাব থেকে আমার হিসাবে নিয়ে এসেছি। আমি এ হিসাবটি উপস্থাপন করতে চাই। এখানে ১৭ জুলাই থেকে পরবর্তী ৭ বা ১০ দিনের হিসাব আছে।
‘এ ধরনের অপরাধ সমাজে একটি সুস্থ পরিবেশ সৃষ্টি করার প্রতিকূল। সুস্থ সমাজিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠার জন্য আপনার (স্পিকার) প্রত্যবেক্ষণ চাইব।’
তিনি বলেন, প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘আমি চেয়ারম্যান থাকতে অননুমোদিত বিল দিয়েছে। কোনো অনুমোদন বহির্ভূত ঋণ ফারমার্স ব্যাংক, আমরা প্রক্রিয়াজাত করিনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন পর্যবেক্ষক দু’বছর ধরে ছিল, তারাও এটা অবলোকন করেছেন।’
‘এ ধরনের অনুমানভিত্তিক প্রতিবেদন আর্থিক ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা রাখার প্রতিকূল। এক্ষেত্রেও আপনার প্রতিরক্ষণ চাই।’
‘একই প্রতিবেদনে বলেছেন, ফারমার্স ব্যাংক অনুমোদিত ঋণের চেয়ে বেশি অননুমোদিত ঋণ দিয়েছি। এই অভিযোগও অস্বীকার করছি। ঋণ দেওয়ার কর্তব্য ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। তারা অনুমোদনের বাইরে কোনো ঋণ যদি দিয়ে থাকেন, তা তাদের দায়িত্ব। আমার জানা মতে, যত দিন চেয়ারম্যান ছিলাম এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি।’
কর্মচারী নিয়োগেও কোনো অনিয়ম ঘটেনি বলে দাবি করেন মহীউদ্দীন খান।
তিনি বলেন, ‘তারা (সাংবাদিক) তথ্য পেয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার করার ক্ষেত্রে আমার কিঞ্চিৎ ভূমিকা ছিল। আপনি (স্পিকার) অনুশাসন দেবেন যাতে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার মেনে চলে।’
শাখা ব্যবস্থাপকদের উপর দোষ চাপিয়ে মহীউদ্দীন খান বলেন, ‘অনুমোদিত ঋণের বিরপরীতে টাকা দেওয়া বা সঞ্চালন করার এখতিয়ার ব্যাংকের ম্যানেজারসহ সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের। তারা এক্ষেত্রে অনুমোদনের বাইরে যদি কোনো ঋণ দিয়ে থাকেন এটা তাদের দায়িত্ব। আমি যতিদিন চেয়ারম্যান ছিলাম আমরা জানামতে এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি।’
রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পাওয়া ফারমার্স ব্যাংক ২০০৩ সালে যাত্রা শুরুর কয়েক বছরেই ধুকতে থাকে। ব্যাংকটিতে ঋণ বিতরণে শত শত কোটি টাকা অনিয়ম ধরা পড়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক পর্যবেক্ষকও বসিয়েছিল।
বিভিন্ন চাপের মুখে পড়ে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানের পদ থেকে মহীউদ্দীন খান আলমগীর গত ২৮ নভেম্বর পদত্যাগ করেন। একই দিন অডিট কমিটির চেয়ারম্যানের পদ ছাড়েন মাহবুবুল হক চিশতী। তিন সপ্তাহের মাথায় অপসারণ করা হয় ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম শামীমকেও।
গত ২১ ডিসেম্বর সিলেটে স্বয়ং অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ব্যাংকটির দুর্দশার জন্য এর প্রতিষ্ঠাতাদের দায়ী করেন। সেদিন তিনি বলেন, ‘এর প্রতিষ্ঠাতাই ব্যাংকটিকে লুটপাট করে শেষ করে দিয়েছে।’
আবার গত ২৩ জানুয়ারি সংসদে পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ জানান. ফারমার্স ব্যাংকে জলবায়ু তহবিলের ৫০৮ কোটি টাকা রাখা হয়েছিল। কিন্তু তারল্য সংকটে থাকা ব্যাংকটি এখন সে টাকা ফেরত দিতে পারছে না
সম্প্রতি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে দেওয়া এক প্রতিবেদনে ফারমার্স ব্যাংককে দেশের আর্থিক খাতের জন্য ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
মহীউদ্দীন খান সরকারি চাকরি ছাড়ার পর ১৯৯৬ সালে আওয়া্মী লীগ থেকে সংসদ সদস্য হন; পরে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী করা হয় তাকে।
সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে দুর্নীতি মামলায় সাজা হয়েছিল তার। পরে উচ্চ আদালত তা বাতিল করে।
বিভিন্ন অনিয়মের কারণে ফারমার্স ব্যাংক নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ অনুসন্ধান করে। তাদের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিষেধাজ্ঞা না মেনে ফারমার্স ব্যাংকের নতুন ঋণ দেওয়ার কথা উঠে আসে। এসব অনিয়মের কথা ফারমার্স ব্যাংক স্বীকারও করেছে বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনে যে অনিয়মগুলো চিহ্নিত করা হয়, সেগুলো হল-নীতিমালা অনুসরণ না করে গ্রাহকদের ঋণ দেওয়া, অস্তিত্ববিহীন/সাইন বোর্ড সর্বস্ব প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়া, ঋণ নিয়মাচার লঙ্ঘন করে ব্যাংকের পরিচালকসহ অন্য ব্যাংকের পরিচালকদের ঋণ দেওয়া, অপর্যাপ্ত/ত্রুটিপূর্ণ জামানতের বিপরীতে ঋণ দেওয়া ও এক ঋণগ্রহীতার সর্বোচ্চ ঋণসীমার অতিরিক্ত ঋণ সুবিধা দেওয়া।
সংসদীয় কমিটির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক প্রতিবেদন দেখে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘ব্যাংকগুলো যেসব অনিয়ম করেছে, পড়লেই গা শিউরে ওঠে। এসব অনিয়মের দায় বোর্ডকে নিতে হবে। তারা দায় এড়াবে কীভাবে?’





