মঙ্গলবার ভোরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার জেরে একইদিন দু’পক্ষের শিক্ষকগণ প্রশাসনিক ভবনের সামনে পাল্টাপাল্টি অবস্থান নিয়ে কর্মসূচি পালন করে। ফলে বাধাগ্রস্থ হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রম। ক্ষতিগ্রস্তের শিকার হয় রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থা।
পাল্টাপাল্টি অবস্থান কর্মসূচি পালনের সময় দু’পক্ষের শিক্ষকদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়, যা ছিলো অশ্রাব্য।
দুটি ঘটনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এ আচরণের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ফলে সমালোচিত হতে হচ্ছে পুরো শিক্ষক সমাজকে।
শিক্ষকদের এই আচরণ শুধু প্রথম ঘটনার মধ্যেই (হাতাহাতির) সীমাবদ্ধ থাকতে পারতো। কিন্তু দেখা যায় ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। তবে এবার হাতাহাতি নয়, উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়। যাকে আমরা বলি অশ্রাব্য গালিগালাজ।
প্রথম ঘটনাটি নাহয় ধরে নিলাম ভোর রাতে ঘটেছে এবং তা অনাকাঙ্ক্ষিত। কিন্তু পরবর্তীতে প্রশাসনিক ভবনের সামনে অশ্রাব্য গালিগালাজের বিষয়টিকে কীভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত বলবেন!
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজনীতি করবেন, শিক্ষকরা করবেন না তা কি হয়? প্রশ্ন থাকতে পারে। হ্যাঁ, শিক্ষকরা রাজনীতি করতেই পারেন। কিন্তু সে রাজনীতি শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষার মানকে নষ্ট করে কেন? শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে কেন?
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দেশের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে অধিকার সংরক্ষণের আন্দোলনে শিক্ষকদের ছিলো স্বর্ণোজ্জ্বল ভূমিকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতির ছিলো একটা স্বর্ণালী যুগ। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ষাটের দশকের শিক্ষা বিষয়ক আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর নির্বাচন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ অর্থাৎ প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্রদের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও ছিল স্বর্ণোজ্জ্বল ভূমিকা।
১৯৬৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক ড. জোহার রক্ত দেশে একটি গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়ে দিয়েছিল। সেই গণঅভ্যুত্থানের কারণেই আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের পতন ঘটে এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা তথা জেলখানা থেকে শেখ মুজিবকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ড. জোহার রক্তে দেশের রাজনীতির মোড় সম্পূর্ণ ঘুরে যায়। আজও দেশের ছাত্র-শিক্ষক সমাজের সকলের মনে গেঁথে আছেন শিক্ষক ড. জোহা। তিনিই দেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতনামা শিক্ষক-বুদ্ধিজীবীদের কতটা নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে তা আমাদের সকলেরই জানা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই মুক্তিকামী ছাত্রদের পরিচর্যা করেছেন, শিক্ষকগণই ছাত্রদের দেশপ্রেমিক হিসেবে গড়ে তুলেছেন। কিন্তু আজ? শিক্ষক রাজনীতি কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়ে? ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কই বা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে?
শিক্ষকদের মধ্যকার সম্মানবোধের এত অবনতি হবে তা ভাবিনি। অবাক হই! ক্ষমতালোভে শিক্ষকরা যখন নিজ রাজনৈতিক দলের শিক্ষকদের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছেন। জানি এ দ্বন্দ্ব চিরস্থায়ী নয়, স্বার্থের। একদিন হয়তো দ্বন্দ্বের বিষয়টি ঠিকই মিটে যাবে। কিন্তু যে সম্মানহানী হয়েছে সে সম্মান কি কখনো ফিরিয়ে আনা সম্ভব?
বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে এমনটি কোনোভাবেই প্রত্যাশা করতে পারি না। মানতে পারছি না এ পরিস্থিতি। শিক্ষক রাজনীতির নেতিবাচক প্রভাব আজ সর্বত্রই। কিন্তু সেই রাজনীতি যখন শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে, তখন আর রাজনীতি থাকে না। সেটা হয় অপরাজনীতি। এই অপরাজনীতি একদিকে যেমন শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশকে নষ্ট করছে, অন্যদিকে সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য তা কোন কল্যাণ বয়ে আনছে না।
এভাবে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যদি স্বার্থের কারণে মারামারিতে জড়িয়ে পড়েন, তা অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায়। যদিও অন্য বিশ্ববিদ্যালয়েও এমন ঘটনা ঘটছে। সম্পূর্ণ বিষয়টা শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উপরই বর্তায়।
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষকরা হলেন সেই মেরুদণ্ডের পরিচালনা শক্তি। কিন্তু আজ আমরা যাচ্ছি কোন পথে। শিক্ষকরা আমাদের কী শেখাচ্ছেন? কী পথ দেখাচ্ছেন? বড়ই ভাবনার বিষয়।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








