ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ যথার্থই বলেছেন: ‘যে দেশে গুণের কদর হয় না, সে দেশে গুণীজন জন্মায় না’। প্রতিনিয়ত আমরা গুণীজনদের গুণ বা কর্মদক্ষতার সঠিক মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হচ্ছি।
ব্যর্থতার ফলস্বরূপ সেভাবে গুণীজনের দেখা পাচ্ছে না বাংলাদেশ কিংবা পেলেও তাদের আমরা ধরে রাখতে পারছি না। আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস। শিক্ষক দিবসে এ মহান পেশার সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি অশেষ শ্রদ্ধা ও ভালবাসা। তবে মাঝে মধ্যে পত্রিকায় প্রকাশিত কিছু সংবাদ আমাদের ব্যথিত করে তোলে। শিক্ষকতা পেশা এবং মর্যাদার সাথে অন্যান্য পেশার তুলনা করে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে থাকে বিশেষ মহলের কতিপয় ব্যক্তিবর্গ।
বিষয়টি খুবই সাংঘর্ষিক, কেননা শিক্ষকতা পেশার সাথে মানে ও যোগ্যতায় অন্য কোন পেশার তুলনা নিতান্তই ছেলেমানুষি ব্যতিরেকে আর কিছুই নয়। শিক্ষক সমাজ জাতির বিবেক সুতরাং তাদেরকে যৌক্তিক দাবি আদায়ের নিমিত্তে মাঝে মধ্যে রাস্তায় দেখাটাও জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক। কারণ, শিক্ষকদের মূল কাজ হল, ছাত্র/ছাত্রীদেরকে সত্য সুন্দরের সন্ধান দেওয়া এবং জ্ঞান অন্বেষণে উদ্বুদ্ধ করা।
শিক্ষকদের প্রতিনিয়ত পরীক্ষার মধ্য দিয়েই যেতে হয়। কারণ, পেশাটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং এবং প্রতিযোগিতাময়। কেননা যুগের সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষকদের আধুনিক ও সর্বশেষ উদ্ভাবনী জ্ঞানের সাথে সংযুক্ত হতে হয়। অন্য পেশায় পেশাজীবীদের চাকুরি জীবনে খুব কম সময়ই পরীক্ষার সন্মুখীন হতে হয়।
শিক্ষকদের ক্লাশে লেকচার ডেলিভারি দেওয়ার পূর্বে বিভিন্ন সহায়ক এবং আপডেট ভার্সনের বই থেকে সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে ছাত্রদের মাঝে আলোচনা করতে হয়। ছাত্রদের যে কোন ধরনের প্রশ্নের যৌক্তিক এবং চমকপ্রদ উত্তর সরবরাহের জন্য শিক্ষকেরা সর্বদাই সচেষ্ট থাকেন। যে সব স্কুল/ কলেজ/ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট রয়েছে অর্থাৎ একজন শিক্ষককে এক সেমস্টার ৪- ৫ টি কোর্স পড়াতে হয়, তাহলে ঐ শিক্ষককে কি পরিমাণ অবর্ণনীয় পরিশ্রম করতে হয় একবার চিন্তা করা যায় !
ক্লাশ লেকচারের বাইরেও অ্যাসাইনমেন্ট, ব্যবহারিক পরীক্ষা, রিপোর্ট তৈরী, টার্ম পেপার, মনোগ্রাফ, থিসিস পেপার নিয়েও ছাত্র/ছাত্রীদের সঙ্গে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত সময়ের একটি বড় অংশ কাটাতে হয়। তাছাড়া শিক্ষকরা কেবল তাদের নিজেস্ব শ্রেণিকক্ষের/ বিভাগের ছাত্রদের জন্য নয়, সমগ্র স্কুল/কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোন ছাত্র- ছাত্রীর যে কোন সমস্যার সমাধান করতে প্রাণান্তকর প্রচেষ্টায় অব্যাহত থাকেন।
এসবের বাইরে একাডেমিক কমিটির মিটিং, প্রশ্নপ্রত্র প্রণয়ন, পরীক্ষায় দায়িত্ব পালন করা, বিভাগের উন্নয়ন সংক্রান্ত কাজে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করা, খাতা মূল্যায়ন এবং সর্বশেষ ফলাফল প্রদান করা শিক্ষকদের নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়।
এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা প্রশাসনিক বিভিন্ন দায়িত্ব যেমন: হলের প্রাধ্যক্ষ, প্রক্টরিয়াল বডি, শারীরিক শিক্ষা বিভাগ, পরিবহন শাখা, লাইব্রেরী পরিচালনা, মেডিকেল সেণ্টারের তদারকি, সিনেট এবং সিন্ডিকেট বোর্ডে তাদের মেধা ও প্রজ্ঞার সমন্বয়ের মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
তাছাড়া, যে কোন মন্ত্রণালয়ে উন্নয়নমূলক কাজের পূর্বে কাজের সুষ্ঠু তদারকি, কাজের মান এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে গবেষণা করা হয়। আর এ গবেষণার মূল পরামর্শক হিসেবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন স্বনামধন্য প্রফেসরকে নিয়োগ দেওয়া হয়। কারণ, গবেষণার মাধ্যমে লব্ধ ফলাফল অনুযায়ী কাজ করতে পারলে কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন করার কোন সুযোগ থাকে না।
তাছাড়া, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা তাদের গবেষণা কাজের দক্ষতা এবং সফলতায় সারা বিশ্বে সমাদৃত। হোক সেটি সামাজিক, ফলিত অথবা মৌলিক বিজ্ঞানের উপর গবেষণা। আর গবেষণার মাধ্যমে নানামুখী পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে মৌলিক বিষয়টি বের হয়ে আসে, যা অন্য পেশার লোকজনের কাছ থেকে আশা করা দুরূহ।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা তাঁদের নিজেদের মানোন্নয়ন এবং পাঠ্যক্রমের জন্য বাইরের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রী নিয়ে আসছেন। সেখানে তাদেরকে যে কোন একটি মৌলিক বিষয়ের উপর গবেষণা কার্য সম্পাদন করেই উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন করতে হয়।
একজন আমলাকে বা অন্য পেশাজীবী যাদের সাথে মাঝে মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তুলনা করার প্রয়াস চালানো হয় তাদের উদ্দেশ্যই বলা হচ্ছে, প্রমোশনের/পদোন্নতির জন্য পেশাজীবীদের কোন মৌলিক গবেষণার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদোন্নতির জন্য মৌলিক গবেষণা অনস্বীকার্য।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল দায় দায়িত্ব শেষ করে মৌলিক গবেষণা করা চাট্টিখানি কথা নয় ! আর একজন মহান শিক্ষক প্রতিনিয়ত এ কাজটি করে যাচ্ছেন অবলীলায়। গবেষণার ফলাফল থেকে পলিসি/নীতি প্রণয়নকারীরা সে গুলো প্রয়োগের মাধ্যমে সমাজ থেকে অন্যায় অবিচার দূর করার সুযোগ পাচ্ছেন কিংবা সমাজের উন্নয়নে কাজে লাগাচ্ছেন তথা মানুষের মানুষের জীবনযাত্রা ও অগ্রগতি বেগবান হচ্ছে।
গবেষণার মাধ্যমে শিক্ষকরা নতুন বিষয়ের অনুসন্ধান করেন অথবা প্রচলিত জ্ঞানের যাচাই বাছাই করে থাকেন সর্বদাই, যার ভিত্তিতে একটি উন্নত ও মানবিক সমাজ গঠন খুবই সহজতর হয়। সুতরাং এ মহান পেশার সাথে অন্য কোন পেশার তুলনা বাঞ্ছনীয় নয়।
অন্যান্য দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছেলেটি বা মেয়েটি শিক্ষক হয়। আমাদের দেশেও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এ রীতিটি এখনো বহাল রয়েছে। স্কুল, কলেজে সচরাচর মেধাবী শিক্ষার্থীটি শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন না। কেননা, সম্মান, অর্থ কিংবা পদমর্যাদা কোনভাবেই মেধাবী ছেলে বা মেয়েটিকে এ পেশার দিকে আকৃষ্ট করতে পারে না।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মর্যাদার প্রশ্নে যেভাবে খাটো করার অপপ্রয়াস চালানো হচ্ছে (ইউজিসি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন খর্ব হবে-দৈনিক যুগান্তর, ২ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং), অদূর ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র/ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা পেশাটিকে অপছন্দ করবে তাতে সন্দেহ নেই। তখন দেশের কি অবস্থা দাঁড়াবে ভেবে দেখলেই গা শিউরে উঠে।
কারণ, উপযুক্ত ব্যক্তিদের যোগ্য জায়গায় বসানোও রাষ্ট্র ও সরকারের গুরু দায়িত্ব। তাই মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আগ্রহী করে তুলতে এ পেশাটিকে আরো মর্যাদাশীল করে তুলতে হবে। অন্যথায় হিতে বিপরীত হবে সবকিছুতেই।
জাতীয় পর্যায়ের নানা রকমের অনুষ্ঠানে সেমিনার পেপার তৈরি, প্রেজেণ্টেশন তৈরি, মূল বক্তব্য উপস্থাপন ইত্যাদি কাজগুলো শত ব্যস্ততার মধ্যেও শিক্ষক সমাজ তৈরি করে থাকেন। প্রত্যেকটি বিষয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ, উপযুক্ত মূল্যায়ন এবং কর্মপরিধি নির্ণয়ে শিক্ষকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
তাছাড়া সরকারের কোন কারণে ভুল সিদ্ধান্ত নিলে তার সমালোচনা যৌক্তিক কারণসহ শিক্ষক সমাজই করে থাকেন তাদের নীতি নৈতিকতার কারনে। পাশাপাশি কোন ভাল কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ প্রশংসা করতেও ভুলেননি জাতির বিবেকগণ।
অন্য কোন পেশাজীবীরা এ কাজটি ভুলেও করেন না যেটি শিক্ষক সমাজ নির্দ্বিধায় করে থাকেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে লালন, পালন ও এর বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলার স্বরূপ নির্ধারণ করলে শিক্ষকদের ভূমিকা সহজেই উঠে আসে। আধুনিক প্রজন্মকে দেশপ্রেমের তাড়নায় উদ্ভাসিত করতে শিক্ষকদের সমতুল্য কেউ গুরুদায়িত্ব পালন করতে পারে না।
কাজেই, মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকদের সম্মান, সামাজিক মর্যাদা, অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব ও পেশার প্রতি মেধাবীদের আকৃষ্টকরণে যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণের কোন বিকল্প নেই। আশা রাখবো, সরকার সহ সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান শিক্ষকদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যথাযথ ভূমিকা পালন করবে। শিক্ষক দিবসে সকল মহান শিক্ষকের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








