আঠারো বছর আগে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ড। লম্বা সময় ধরে চলেছে বিচার। দীর্ঘ সময় জুড়ে যেমন ধৈর্য ধরে থেকেছেন হত্যাকাণ্ডের শিকার শাজনীনের পরিবার; তেমনি শেষ পর্যন্ত অভিযোগ থেকে রেহাই পাওয়া একাধিক মানুষ লম্বা সময় কারাভোগ করেছেন।
এরকম দীর্ঘসূত্রতায় ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন হাজার হাজার মামলার লাখ লাখ মানুষ। একপক্ষ ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়ছে। আর অন্যপক্ষ বিচার প্রক্রিয়ায় সাজা ভোগ করছে বিনাদোষে
দু’ পক্ষের জন্যই কষ্টকর এ সময় থেকে রেহাই পাওয়ার উপায় কী?
এমন সমস্যা থেকে দেশকে রক্ষা করতে সবচেয়ে আগে সঠিক জায়গার জন্য যোগ্য মানুষ বাছাই করা দরকার বলেই মনে করছেন ফৌজদারী আইন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ খুরশিদ আলম খান।
তিনি চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, যেখানে এফআইআর করা হয় বা মামলার ড্রাফট করা হয়; সেসব যারা করেন অনেক সময় দেখা যায় তারা অনেক কিছুই বোঝেন না। তাই এসব কাজে যোগ্যদের নিয়োগ দিতে হবে।
সমস্যা সমাধানে মামলার দীর্ঘসূত্রিতা কমানোর কোনো বিকল্প নেই। আদালতে একটি মামলায় সাক্ষীর কথা বলে বার বার সময় চাওয়া হয়, চার্জশিট দাখিল করতে সময় নেওয়া হয়। সেসব কমাতে পারলে এই সমস্যা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে প্রসিকিউশনকে আরো বেশি শক্তিশালী ও যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
একই কথা বলছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন।
চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন, এই সমস্যান সমাধান আনতে প্রথমত মামলার দীর্ঘসূত্রিতা দূর করতে হবে। একটি মামলার বিচার শেষ করতেই যদি ২০-২৫ বছর লেগে যায় তাহলে কেউই ন্যায় বিচার পায় না। আর যদি সেই মামলায় কেউ আটক থাকেন তাহলেও দেখা যায় এই লম্বা সময় তাকে সাজা ভোগ করতে হয়।
“হয়তো শেষ পর্যন্ত দেখা যায় তার কোনো অপরাধই ছিল না। সন্দেহের বশবর্তী হয়ে তাকে মামলার আসামী করা হয়েছিল।”
সমস্যার সমাধানে দুজনেই জোর দেন অবকাঠামোগত আর মানবশক্তি বাড়ানোর উপর। সেক্ষেত্রে দুজনেরই দাবি দক্ষ ও যোগ্য মানুষটির হাতেই সঠিক কাজটি অর্পন করতে হবে।
বাংলাদেশে নিম্ন আদালত ও উচ্চ আদালত মিলিয়ে প্রায় ৩৬ লাখ মামলা পেন্ডিং রয়েছে। দ্রুত সেসবের সমাধান না করতে পারলে সংখ্যাটা আরো বাড়ছে প্রতিনিয়ত।
এই সমস্যার সমাধানে করণীয় সম্পর্কে শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন বলেন, ছোট ছোট যেসব ক্রিমিনাল কেস সেগুলো এক থেকে ছয় মাসের মধ্যে সমাধান করতে হবে আর যেগুলো বড় সড় মামলা খেয়াল রাখতে হবে সেগুলোতেও যেন ২০ বা ২৫ বছর লেগে না যায়। কারণ তাহলে যেমন বাদী ন্যায়বিচার পায় না তেমনই বিবাদীরও সঠিক বিচার হয় না। প্রধান বিচারপতি একসময় সান্ধ্য আদালতের কথা বলেছিলেন। সেটা হলেও কাজটা অনেক সহজ হয়ে যাবে।
মামলা করার সময় হয়তো বেশ কিছু মানুষকে জড়িয়ে মামলা করা হলো। কিন্তু বিচার সম্পন্ন হওয়ার পর দেখা গেলো কেউ কেউ পুরোপুরিই নির্দোষ ছিলেন। কিন্তু মামলা চলাকালীন লম্বা সময়ব্যাপী তিনি হয়তো আটকই ছিলেন। এই সমস্যাটা যারা ভোগ করেন তাদের ক্ষেত্রেও মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির কোনো বিকল্প নেই। আবার কেউ যদি জামিন নিতেও চান। তাহলেও সেটা বিশাল ঝক্কির ব্যাপার। ভালো আইনজীবী খুঁজে নিতে হয়, অনেক টাকা-পয়সারও ব্যাপার।
তবে এই সমস্যার সমাধানে দুজনেরই মত দেশের আইন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর পক্ষে।
খুরশিদ আলম খান বলেন, ‘আইনে অনেক জায়গায় অনেক ঘাটতি আছে। সেসব সমাধান না করতে পারলে এই বিশাল সমস্যার সমাধান সম্ভব না। সেসব জায়গায় আগে আমাদের কাজ করতে হবে। আর যেখানে মামলার ড্রাফটের কাজটি করা হয় সেখানে বিশেষজ্ঞদের নিয়োগ দিতে হবে।’
“সেখানে যেন একজন এক্সপার্ট মামলা লেখক, একজন আইনজীবী এবং একজন সমাজবিজ্ঞানী থাকেন। তাছাড়া যেন কেউ বিনা দোষে সাজা না ভোগ করে সেই পদক্ষেপ নিতে তাকে আটক না করে অন্য পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।”
একই কথা বললেন শেখ হাফিজুর রহমান কার্জনও। তিনি আরো যোগ করেন, ‘দেশের বিচার ব্যবস্থায় এখনো দুর্নীতির দুষ্টচক্র আছে। কেউ যদি সৎভাবে নিজের কাজটা সম্পন্ন করতেও চায় তাহলেও তা সম্পন্ন করা সম্ভব হয় না। সেটা থেকে বেরোতে পারলেই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে। সঙ্গে দেখতে কোনো কোন বিষয়গুলো মামলা নিস্পত্তি করতে বিলম্ব ঘটাচ্ছে। সেসবের উপর বিশেষভাবে নজর রাখতে হবে।’










