আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রেসিডেন্ট তোমোকো আকানে এবং আদালটির একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আবদুলায়ে সেয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার ১৮ আগস্ট মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এ ঘোষণা দেন।
সংবাদমাধ্যম বিবিসি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে আইসিসির বিরুদ্ধে নেওয়া ধারাবাহিক পদক্ষেপের সর্বশেষটি হলো এই নিষেধাজ্ঞা। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, আইসিসির কর্মকর্তারা এমন দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের বিচারের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছেন, যারা আদালটির এখতিয়ার স্বীকার করে না।
রুবিও আইসিসিকে দুর্নীতিগ্রস্ত ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত আদালত হিসেবে উল্লেখ করে অভিযোগ করেন, আদালত তার ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে এবং এখতিয়ারের সীমা অতিক্রম করেছে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপর কোনো ধরনের আক্রমণ যুক্তরাষ্ট্র মেনে নেবে না।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রতিক্রিয়ায় আইসিসি জানিয়েছে, তারা তাদের বিচারক, প্রসিকিউটর ও কর্মীদের পাশে রয়েছে। আদালতের মতে, বিচারিক কর্মকর্তারা আইন প্রয়োগের কারণে যখন নিষেধাজ্ঞা বা হুমকির মুখে পড়েন, তখন তা আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোকেই দুর্বল করে।
আইসিসি আরও বলেছে, সদস্য দেশগুলোর দেওয়া দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আদালতের কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু করা আইনের শাসনের জন্য উদ্বেগজনক।
আফগানিস্তানে মার্কিন সেনা ও কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড এবং গাজায় কথিত যুদ্ধাপরাধের তদন্ত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আইসিসির বিরোধ চলছে। গাজা ইস্যুতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুসহ দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও ওয়াশিংটনের ক্ষোভের অন্যতম কারণ।
নেতানিয়াহু তার বিরুদ্ধে ওঠা যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি আইসিসিকে ইহুদিবিদ্বেষ প্রভাবিত বলেও অভিযোগ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কোনোটিই আইসিসির সদস্য নয়। তবে ফিলিস্তিন ২০১৫ সালে আদালটির সদস্য হওয়ায় ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সংঘটিত কথিত অপরাধ তদন্তের এখতিয়ার আইসিসির রয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন এর আগে আইসিসির অন্তত ১১ কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তাদের মধ্যে নয়জন বিচারক ও প্রধান প্রসিকিউটর রয়েছেন। এসব নিষেধাজ্ঞার আওতায় সম্পদ জব্দ, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং মার্কিন প্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন ধরনের সেবা পাওয়ার ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার কারণে মার্কিন ব্যাংক ও ডলারে লেনদেনকারী আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসন শুধু কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপেই থেমে থাকেনি। গত মাসে মার্কো রুবিও আইসিসির ১২৫ সদস্য দেশকে আদালটি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। ওয়াশিংটন আইসিসির কার্যক্রম বন্ধ বা আদালটিকে বিলুপ্ত করার লক্ষ্যে চাপ বাড়াচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত আইসিসি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের বিচার করার আন্তর্জাতিক এখতিয়ার রাখে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কোনো বিষয় আদালতে পাঠালেও আইসিসি তা তদন্ত ও বিচার করতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। তাদের অভিযোগ, আইসিসির ওপর চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইন ও জবাবদিহির ব্যবস্থাকে দুর্বল করা হচ্ছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ চারটি মার্কিন মানবাধিকার সংগঠন আইসিসিকে দুর্বল করার প্রশাসনিক উদ্যোগকে অসাংবিধানিক দাবি করে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। সংগঠনগুলোর দাবি, নিষেধাজ্ঞার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিতে আইসিসির সঙ্গে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এর আগে আইসিসির তিন বিচারকও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আদালতে মামলা করেন। তাঁদের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞা বিচারকদের ওপর বেআইনি চাপ সৃষ্টি এবং বিচারিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা।
ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের (আইইইপিএ) আওতায় প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষমতা আইনসম্মতভাবেই প্রয়োগ করা হয়েছে।










