ঢাকা লিগে আশির দশকে মাঠ কাঁপাতেন তিন লেগস্পিনার। ওমর খালিদ রুমি, তানভীর মাজহার তান্না ও ওয়াহিদুল গনি। প্রথম দুজন প্রতিষ্ঠিত নাম আরও আগে থেকেই। পরে শুরু করেন ওয়াহিদুল গনি। ১৯৮৮ সালে চট্টগ্রামে পাকিস্তানের বিপক্ষে এশিয়া কাপের একটি ম্যাচে খেলারও সুযোগ হয় তার। মোহামেডানের হয়ে ক্লাব ক্রিকেট খেলেছেন ২০ বছর। সীমিত ওভারের ম্যাচেও ডেথ ওভারে বোলিং করতেন। এমনকি ইনিংসের শেষের দিকেও এই লেগির হাতে বল তুলে দিতে আস্থা পেতেন অধিনায়ক। ঢাকার ক্রিকেটে বর্তমান অবস্থা দেখলে এসব গল্প মনে হতে পারে! কেননা এখন ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিত নন কোনও লেগস্পিনার!
২০১৪ সালে উজ্জ্বল সম্ভাবনা নিয়েই শুরু করেছিলেন জুবায়ের হোসেন লিখন। প্রথমবারের মত টেস্ট স্কোয়াডে স্পেশালিষ্ট লেগস্পিনার হিসেবে ডাকা হয় তকে। কিন্তু ৬ টেস্টে ১৬ উইকেটে থমকে আছে তার ক্যারিয়ার। পরে এসেছেন তানবীর হায়দার। দুই ওয়ানডে খেলেই ব্রাত্য! নিজেকে কতটা দূরে নিয়ে যেতে পারবেন তা নিয়ে আছে সংশয়।
তাহলে কী আর ভালমানের লেগস্পিনার আসবে না বাংলাদেশে? যারা লম্বা সময় ধরে সার্ভিস দেবে? লেগস্পিনের কারিগর ওয়াহিদুল গনি জানালেন, অনেক সম্ভাবনা আছে। শুধু প্রক্রিয়াটা ঠিক নেই। তার মতে, প্রক্রিয়া ঠিক করার দায়-দায়িত্ব নির্বাচক, ম্যানেজমেন্ট, কোচ ও অধিনায়কের। চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপে বিসিবির কোচ ওয়াহিদুল গনি জানিয়েছেন লেগস্পিনার তুলে আনতে করণীয়, বর্তমান অবস্থা ও সম্ভাবনার কথা-
আপনার সময়টার কথা জানতে চাই..
১৯৭৪ সালে যখন দেশের ক্রিকেট মোটামুটি একটা ধাপ থেকে শুরু হয়। তখনও কম লেগস্পিনার ছিল। ওমর খালিদ রুমি ভাই, তানভীর মাজহার তান্না ভাই ছিলেন, আর আমি করতাম। লেগস্পিনের আর্টটা খুব কঠিন। তাই কম বোলার পাওয়া যেত। তারপরও আমরা তিনজনই ভাল লেভেলে খেলে গেছি। কারণ ওই সময় কিছু মানুষ ছিলেন যারা বুঝতেন লেগস্পিনের আর্ট কী। এজন্য মোটামুটি খেলে গেছি। এখন এই জিনিসটা খুব কম। আমাদের ভেতরে জেতার প্রবণতা বেশি চলে এসেছে। ক্লাব লেভেলে টিম করেই জেতার জন্য। তারা এখন আর লেগস্পিনের ওই সুযোগটা নেয় না, লেগস্পিনারকে সুযোগটা দেয়ও না। এজন্য লেগস্পিনার খুব কম আমাদের দেশে। আমার ক্যাপ্টেন (মোহামেডান) ছিলেন এএসএম ফারুক ভাই। তিনি বুঝতেন। কিছু মানুষ থাকতে হবে যারা বুঝবে লেগস্পিন। ওরকম লেগস্পিন বোঝার মত লোকের অভাব রয়ে গেছে। সে মন-মানসিকতা নেই। ওই যে বললাম, জিততে চায়।
বাংলাদেশ দলে খেলতে পারে এমন সম্ভাবনাময় স্পিনার এখন আছে কি?
আছে। তবে এখনই জাতীয় দলে খেলার মত নেই। সময়ের ব্যাপার আছে। বয়সভিত্তিক দলে অনেক রকমের বোলার আছে। যাদের একটু সময় নিয়ে, ৩-৪ বছরের মধ্যে তৈরি করতে পারি। পরবর্তীতে নিশ্চিতভাবেই তারা জাতীয় দলে খেলবে।
ক্লাব পর্যায়ে লেগস্পিনকে নিরুৎসাহিত করা হয়। খেলার সুযোগ দেয়া হয় না। তাহলে এদের ভবিষ্যৎ কী?
ভবিষ্যৎ আছে। আমি মনে করি যে, একটা সময় সবাই উপলব্ধি করতে পারবে। মানুষ বুঝতে পারবে একটা টিমে লেগস্পিনার কত দরকার। আমরা কিন্তু সবাই বলছি অ্যাটাকিং একটা লেগস্পিনার দরকার। সবাই কিন্তু বলছে, কিন্তু প্রক্রিয়াটা চালু হয়নি। এটা হবে যখন, তখন অনেক লেগস্পিনার পাবেন। ব্যাপারটা কী একটা উদাহরণ থাকতে হয়। যেমন, শেন ওয়ার্ন বা আব্দুল কাদির। ভাল একটা প্রতিভা যখন জাতীয় দলে চলে আসবে তখন ওকে দেখে আরও উৎসাহিত হবে। আগে বুঝতে হবে লেগস্পিনের উপকারিতা কী। লেগস্পিনার হয়ত অত কন্ট্রোল বোলিং করবে না। কিন্তু উইকেট নিয়ে দেবে। এই জিনিসটা উপলব্ধি হচ্ছে না।

জুবায়ের হোসেন তো ভালই করছিল। হঠাৎ তাকে বাদ দেয়া হল। সেক্ষেত্রে ধৈর্য তো ধরতে হয়।
ওই যে, প্রক্রিয়াটা নেই। শেন ওয়ার্ন তার প্রথম টেস্টে ভারতের সাথে যেটা খেলেছে, ২০০ রান দিয়ে একটা উইকেট নিয়েছে। নির্বাচকরা জানত ওয়ার্নের ভেতরে কী আছে। ওকে ড্রপ দেয়নি। খেলিয়ে গেছে। আমাদের এই জিনিসটা নেই। লিখনের ব্যাপারে, ও ঠিক ছিল, কিন্তু মিডিয়া ওকে অনেক উপরে তুলে দিয়েছিল। মিডিয়ার উচিত হয়নি তাকে একেবারেই গ্রেট পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। সে এমন কিছুই করেনি। তার মাত্র শুরু ছিল। এমন একটা টিমের সাথে ডেব্যু হয়েছে, জিম্বাবুয়ে, যারা স্পিন খেলতে পারে না। তার পারফরম্যান্সকে আমি ছোট করছি না। বোঝাতে হবে এই টিমটা এরকম, এইসব কারণে তুমি ভাল করেছ। এরপরে আরও উপরে গেলে কঠিন প্রতিপক্ষ আসবে, তোমাকে আরও শিখতে হবে। ওই জিনিসটা ওর সাথে হয়নি। প্রক্রিয়াটা ঠিক ছিল না। এখনও আমি মনে করি জুবায়ের অনেক তরুণ। লেগস্পিনারের যে গুণ দরকার তার মধ্যে সেগুলো আছে। ওকে সঠিকভাবে ব্যবহার করাটা হল সবচেয়ে বড় জিনিস। যেমন, আব্দুল কাদির সবসময় বলে ইমরান খান না থাকলে আমি কোনোদিন আবদুল কাদির হতে পারতাম না। কারণ ব্যবহার করতে হবে। এমন মানুষ দরকার।
বোলারটির নিজেরও তো দায়িত্ব থাকে নিজেকে গড়ে তোলার..
খেলোয়াড়কে তো বুঝতে হবে, যত উপরের দিকে যাবে চ্যালেঞ্জটা তত বেশি। যারা ওদের হ্যান্ডেল করে তাদের উপর দায়িত্বটা এখানে বেশি। যারা লেগস্পিন বোঝে তারা যদি হ্যান্ডেল না করে, তাহলে তো হবে না। যখন জাতীয় দলে জুবায়ের যাচ্ছে ওকে কে হ্যান্ডেল করে আমি জানি না। লেগস্পিন বোঝে এরকম কোনও কোচ যদি না থাকে…!

ওয়ার্ন-কুম্বলেদের পর বিশ্ব ক্রিকেটে ওই মানের লেগস্পিনার পাওয়া যায়নি। এখন আবার জাগতে শুরু করেছেন ইমরান তাহির, রশিদ খান, অ্যাডাম জাম্পা, ইয়াসির শাহ। এখন বাংলাদেশ জাগতে পারে কীভাবে?
আমরা লেগস্পিনার নেই না। বাঁহাতি স্পিনার যারা আছে দেশের মাটিতে ভাল করে, উইকেট থেকে সহযোগিতা পেয়ে। বাইরে পারি না। এখানে উইকেট পক্ষে তৈরি হয়। সাউথ আফ্রিকা সফরে স্পিনাররা ভাল করেনি। বিপিএলে দেখা যাচ্ছে রশিদ খান ছাড়া আর কোনও স্পিনার ভাল করছে না। স্কিল থাকতে হয়, তারপর সবকিছু। নিউজিল্যান্ডে সোধির মত লেগস্পিনার আছে, আফগানিস্তানে আছে। সব দেশ চেষ্টার জায়গায় চেষ্টা করছে লেগস্পিনার পেতে। আমাদের সেই প্রক্রিয়াটা নেই। প্রক্রিয়া থাকলে নিঃসন্দেহে ২-৩ বছরের মধ্যে ভালমানের লেগস্পিনার চলে আসত। ১৮-১৯ বছরের কিছু ছেলে আছে, ওদের সুযোগ দিতে হবে। আমরা অনেক বাঁহাতি স্পিনার খেলাচ্ছি, কী হচ্ছে? কিছুই হচ্ছে না। এখানে কী একটা-দুইটা লেগস্পিনার থাকতে পারে না! জাতীয় লিগের একটা রাউন্ড বাকি আছে। টায়ার টু। যেখানে চারটা টিম খেলে। রাজশাহী বিভাগ চ্যাম্পিয়ন হয়ে গেছে। বাকি তিনটা টিমের কোনও সুযোগ নেই। ওখানে একটা খেলা বাকি আছে। ওখানে চাইলে তো আমরা একটা লেগস্পিনার খেলাতে পারি। প্রক্রিয়াগুলো জানতে হবে। আমাদের মধ্যে এগুলোর অভাব। প্রচণ্ড রকমের অভাব।
এগুলো নিয়ে কাজ করবেন কারা?
নির্বাচকরা। আমরা কথা বলি এটা নেই, ওটা নেই। কিন্তু আমরা কাজটা কী করছি সেটা দেখছি না। একটা বাঁহাতি স্পিনার খেলছে, সারাদিন বল করে উইকেট পাচ্ছে না। বা অন্য স্পিনার খেলছে। একটা লেগস্পিনার খেলিয়ে দেখেন না। সে পায় কিনা। এই জিনিসগুলো আমদের ভেতরে তৈরি হয়নি।

হাথুরুসিংহে তো তানবীরকে দিয়ে চেষ্টা করেছিলেন একজন লেগিকে সবসময় দলে রাখতে..
হাথুরুকে যা দেবেন সে মনে করবে সেটাই সেরা। হাথুরু একটা জিনিস বোঝাতে চেয়েছে আমাদের, দেখ লেগস্পিনার একটা দরকার। কিন্তু আমার যেটা আছে সেটা ওই ক্লাসের না। কোচ হয়ত মনে করেছে হবে। তানবীর হায়দার ব্যাটিং অলরাউন্ডার হিসেবে আছে। ওর যে স্পিড সেটা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য উপযোগী নয়। ও একটু আস্তে বল করে। জুবায়েরের মধ্যে আছে, ওকে বানানো যেত। নূর হোসেন মুন্না ছিল। ও ছিল সবচেয়ে সম্ভাবনাময়। সে ছেলেটা কেন নষ্ট হল এগুলো নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। নির্বাচকরা বা অফিসিয়াল বলে মাঠে ও খারাপ খেলেছে। ওকে বসিয়ে আরেকটা দেখ। কিন্তু ও কেন খারাপ খেলছে, কী করতে হবে। নিচের লেভেলে এনে ঠিক করার এই প্র্যাকটিস আমাদের নেই। মুন্না খুব ভাল প্রসপেক্ট ছিল। ব্যাটিং, ফিল্ডিংয়েও দারুণ ছিল। একটা ছেলের সম্ভাবনা আছে কিন্তু সে কেন পারছে না। বিপথে গেল ওকে থামানো বা রাইট ট্র্যাকে আনাও দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
নতুন যারা আসবে তাদের গড়ার পরিবেশ কীভাবে আনা যায়?
ক্লাব লেভেলে এগুলো সম্ভব না। তারা জিততে চায়, চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য ফাইট করার ব্যাপার আছে। কিন্তু বোর্ডের যে খেলাগুলো আছে, বয়সভিত্তিক দলে বাধ্যতামূলক করে দিতে পারে। রবি স্পিন হান্টে ১০ জন সিলেক্ট করেছি, তার মধ্যে ৬টা লেগস্পিনার। এখন নির্বাচক, বিভাগীয় কোচদের উচিত হবে ওই ছেলেগুলোকে খেলানো, বাধ্যতামূলক করে দেওয়া উচিত। এভাবে বিল্ডআপ হতে পারে। যেমন জাতীয় লিগে কিছু ম্যাচের গুরুত্ব নেই। সেখানে খেলতে পারে। এভাবেই আমাদের বিল্ডআপ করতে হবে। বোর্ডের টুর্নামেন্ট বিসিএএল, এনসিএল, বয়সভিত্তিক ক্রিকেট, জাতীয় দলের প্রীতি ম্যাচ, অনুশীলন প্র্যাকটিস ম্যাচে খেলিয়ে ওদের তৈরি করা যেতে পারে। তিনটা-চারটা বোলারকে পিক করে পরবর্তী তিন বছর আমরা ওদের গড়ে তুলব। সব জায়গায় খেলাব। এমন মানসিকতা থাকতে হবে। জাতীয় লিগ বোর্ডের টাকায় হয়। এখানে কেন খেলানো যাবে না, আমি বুঝে উঠতে পারি না। চাইলেই সম্ভব। বিভাগীয় ম্যানেজমেন্ট হয়ত চায় তাদের নিজেদের ছেলেদেরই খেলাতে। কিন্তু ক্রিকেট নিয়ে চিন্তা করতে হবে। আমাদের দেশের ক্রিকেট এটা। উন্নতি কীভাবে করা যায়। বোর্ড এটা করতে পারে।
আপনি তো স্পিনার হান্টের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। লেগস্পিনার কেমন আছে?
যারা আছে তাদের সম্ভাবনা অনেক। ঢাকাতেই আপনাকে ৩০-৪০টা ছেলে দেখাতে পারব। যারা এত সুন্দর লেগস্পিন করতে পারে! ট্যালেন্ট আছে, কোচও আছে, আপনি তাদের খেলাচ্ছেন না। এখানে সবার দায়িত্ব আছে। নির্বাচকদের দায়িত্ব আছে, ম্যানেজমেন্ট দায়িত্ব আছে। স্পিনারটিকে যখন খেলতে দেন মাঠে ওকে হ্যান্ডেল করতে ক্যাপ্টেন লাগবে। এই জিনিসগুলো একটা প্রক্রিয়া, প্রক্রিয়ার মধ্যে আসতে হবে। প্রত্যেকটা পর্যায়ে সহযোগিতা করতে হবে। সাহস যোগাতে হবে। চার পক্ষের মধ্যে কারও গাফিলতি থাকলে আর হবে না।








