বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার বিদেশি আইনজীবী লর্ড অ্যালেক্সান্ডার কার্লাইলের ভারতে ঢুকতে না পারায় কূটনৈতিক সাফল্য পেয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার। বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধকে গুরুত্ব দিয়ে বিমানবন্দর থেকে তাকে ফেরত পাঠিয়েছে ভারত। এ নিয়ে কার্লাইল বেশ খেপেছেন, তিনি ভারতের তুমুল সমালোচনা করেছেন এবং একই সঙ্গে এর পেছনে বাংলাদেশ সরকার কলকাঠি নেড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন।
অ্যালেক্স কার্লাইল কেবল বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবীই নন, এর বাইরে তার আছে স্বতন্ত্র পরিচয়। তিনি ব্রিটেনের লর্ড সভার সদস্য এবং দেশটির পরিচিত আইনজীবীও। তার সেসব পরিচয়ের সুবাদে তিনি যেকোনো দেশের ভিসা পেতে পারেন, ভারতেরও। ভারতের ভিসাও পেয়ে তিনি সে দেশ পর্যন্ত পৌঁছালেও বিমানবন্দরের চৌহদ্দি পেরুতে পারেননি। এর আগেই ভারত সরকার তার ভিসা প্রত্যাহার করে নিয়েছে, একই সঙ্গে তাকে দেশেও ফেরত যেতেও হয়েছে।
কার্লাইলের ভারতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বেগম খালেদা জিয়ার বিচারিক বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করার কথা ছিল। এ সম্পর্কিত যাবতীয় প্রস্তুতিও সম্পন্ন হয়েছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতার কারণে তার সে সংবাদ সম্মেলন হয়নি। সংবাদ সম্মেলনের সূচি ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে বাংলাদেশ প্রবল চাপ দিয়েছিল ভারতকে এবং অভিযোগ করেছিল ভারতের মাটিতে বাংলাদেশ বিরোধী তৎপরতার বিষয়ে। সেটাকে গ্রহণ করেছে ভারত, এবং ব্রিটিশ লর্ড সভার সদস্য হলেও তাকে সেটা করতে দেয়নি ভারত।
ভারতের এই ভূমিকা বন্ধুপ্রতীম প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন নিঃসন্দেহে। একই সঙ্গে বলা যায় কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের শক্তিমত্তার একটা স্মারকও। ভারতের কাছে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ যে যথেষ্ট সম্মান আদায় করতে পেরেছে এটা চমৎকার এক নজির।
বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কটা আমাদের সাধারণ চোখে একপাক্ষিক বলে মনে করা হলেও এটা বর্তমানে বেশ শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে, কার্লাইল ইস্যুতে সেটা নতুনভাবে প্রমাণিত। সাধারণ দৃষ্টিতে আমরা এতদিন মনে করে আসছি ভারতকে আমরা কেবল দিয়েই যাচ্ছি, কিছু আদায় করতে পারছি না; অনেকেই রাজনৈতিক ভাষায় বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কে ‘গোলামীর সম্পর্ক’ বলে আখ্যা দিলেও সেটা যে পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্কে পরিণত তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
এটা ঠিক যে, ভারতের সঙ্গে আমাদের অনেকগুলো ইস্যু অমীমাংসিত থেকে গেছে বছরের পর বছর। ভারত সরকারের অমনোযোগের কারণে বাংলাদেশ তার ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত; বাংলাদেশ পারছেও না এর সমাধা করতে। তিস্তা ইস্যু সহ অনেকগুলো ইস্যুতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বিভিন্ন সময়ে আশ্বাস দিলেও পশ্চিমবঙ্গ সরকার বিশেষ করে এই সময়ে মমতা ব্যানার্জি সরকারের কারণে সমাধান হচ্ছে না। মমতা সরকারের একতরফা সিদ্ধান্তে যে সব বিষয় ঝুলে আছে সেগুলো বিষয়েও আবার কেন্দ্রীয় সরকার তথা নরেন্দ্র মোদি আশ্বাস দিয়েছিলেন। তবু সমাধান হচ্ছে না কারণ এটা চূড়ান্ত পর্যায়ে পশ্চিমবঙ্গের ব্যাপার। অমীমাংসিত বিষয়ের মীমাংসা যখন ঝুলে থাকে রাজ্যে তখন কিন্তু ভারতের কেন্দ্র বাংলাদেশের পক্ষে কথা বললেও কোনো কাজে আসছে না। এখানে বাংলাদেশের আংশিক কূটনৈতিক সাফল্যকে অস্বীকার করা যাবে না; যদিও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে পুরোপুরি সফল হওয়ার সুযোগ রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে বাগে আনতে পারার মাধ্যমে।
কার্লাইল প্রসঙ্গে বাংলাদেশ-ভারতের এই ভূমিকায় খেপেছেন এই ব্রিটিশ আইনজীবী। তার অভিযোগ এরমাধ্যমে ভারত বাংলাদেশের ‘দাসত্ব’ স্বীকার করে নিয়েছে। তিনি অভিযোগ করেছেন এর মাধ্যমে বাংলাদেশ অনৈতিকভাবে ভারতকে ‘চাপ’ দিয়েছে। এখানে ‘দাসত্ব’ আর ‘চাপ’ শব্দদ্বয় লক্ষণীয়। কূটনৈতিক ক্ষেত্রে আমরা অন্যের ‘দাস’, অন্যের চাপের কাছে ‘নতি স্বীকার’ করি এমন অভিযোগ অনেকের। বাংলাদেশ ভারতের দাসত্ব স্বীকার করেছে; বাংলাদেশ ভারতের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে- এমন নানাবিধ উপমা ও অভিযোগ করা হয়ে থাকে, এবং এমনটা শুনতেই আমরা অভ্যস্ত ছিলাম। কিন্তু অ্যালেক্স কার্লাইলের এমন বক্তব্য রীতিমত চমকে দিয়েছে আমাদের।
এটা ঠিক যে কার্লাইল ভারতে ঢুকতে না পেরে সে দেশের ওপর প্রচণ্ড রেগে আছেন। রাগের মাথায় তিনি ভারতকে বাংলাদেশের ‘দাস’ পর্যন্ত বানিয়ে নিয়েছেন, ভারত বাংলাদেশের চাপের কাছে নতি স্বীকার করেছে বলেও অভিযোগ করেছেন। এর কোনটাই ঠিক নয়। কারণ বৃহৎ প্রতিবেশি এক দেশ যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চাইতে এগিয়ে আছে তারা প্রতিবেশির অনুরোধ কিংবা যুক্তিকে মেনে নিলেই এর মাধ্যমে দাসত্ব স্বীকার করা হয় না। এটা একটা দেশের কূটনৈতিক সাফল্য, যা অর্জন করতে পেরেছে বাংলাদেশ। ভারতে অ্যালেক্স কার্লাইলের সংবাদ সম্মেলন ঠেকাতে বাংলাদেশ যুক্তি দিয়ে ভারতকে বুঝাতে পেরেছে যে এটা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বিচারিক বিষয়ে প্রতিবেশী দেশকে ব্যবহার করা হচ্ছে। ভারত বাংলাদেশের সে যুক্তিকে গ্রহণ করেছে বলে কার্লাইলের প্রোফাইলের দিকে না তাকিয়ে বাংলাদেশের চাওয়াকেই প্রাধান্য দিয়েছে। এটা একদিকে যেমন কূটনৈতিক সাফল্য, অন্যদিকে কূটনৈতিক ভব্যতা। দাসত্ব কিংবা চাপের বিষয়টি গৌণ। এখানে ভারত আবার ভিসা প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে যথাযথ যুক্তি দিয়েছে যেখানে বাণিজ্যিক প্রসঙ্গ ছিল। এই ভিসা প্রত্যাহারের বিষয়ে বাণিজ্যিক সম্পর্কের যোগের বিষয়টি একটা উপলক্ষ, কিন্তু লক্ষ্য যে ছিল বাংলাদেশের আপত্তি কিংবা অনুরোধ সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।
অ্যালেক্স কার্লাইলের এই অভিযোগ অন্য কারণেও গুরুত্বপূর্ণ। তার অবস্থানগত ও পেশাগত পরিচয়ের বাইরেও তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবী। তাকে অনেকেই আবার বিএনপির ‘লবিস্ট’ বলেও আখ্যা দিয়ে থাকেন। তিনি আবার একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ী যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে সারাবিশ্বে লবিং ও অপপ্রচার চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছিলেন, একই সঙ্গে জামায়াত ছাড়া সকল বাংলাদেশিদের কাছে ধিক্কৃত হয়েছিলেন। তিনি যার আইনজীবী হিসেবে নিযুক্তি পেয়ে ভারতে ঢুকতে না পেরে দুই দেশ সম্পর্কে বিষোদগার করলেন সেই খালেদা জিয়া ও তার দল সদা সর্বদাই ভারতবিরোধী রাজনীতি করে এসেছে। বিএনপির আজন্ম অভিযোগ ছিল আওয়ামী লীগ ‘ভারতের দাস’। খালেদা জিয়া এও বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশের ফেনি পর্যন্ত ভারতের অংশ হয়ে যাবে।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ছিয়ানব্বইয়ের পর দুই হাজার আট সালে নির্বাচনে জেতার পর এবার টানা দশ বছর সময় পার করার পথে। দীর্ঘ এই সময়ে বাংলাদেশের কোন অঞ্চলই ভারতের অংশ হয় নি, উপরন্তু আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত ছিটমহলগুলোর সম্মানজনক সমাধান করেছে। মজার বিষয় হচ্ছে, খালেদা জিয়া এক সময় আওয়ামী লীগকে ‘ভারতের দাস’ বলে মন্তব্য করতেন সেই খালেদা জিয়ার আইনজীবীই এখন ভারত বাংলাদেশের দাসত্ব স্বীকার করেছে বলে মন্তব্য করছেন। এটা কি বিএনপির পরাজয় নয়?
বাস্তবতা হলো, খালেদা জিয়া কিংবা অ্যালেক্স কার্লাইলের এই দাসত্ব ও চাপ সম্পর্কিত কোন অভিযোগই আদতে সত্য নয়। কার্লাইলকে ভারতে ঢুকতে না দেওয়া নিয়ে বাংলাদেশের ভূমিকার বিপরিতে ভারতের সেটাকে সম্মান করা স্রেফ কূটনৈতিক বিষয়। এখানে আওয়ামী লীগ সরকার সফল হতে পেরেছে। ভারত কার্লাইলের ভিসা প্রত্যাহারকালে বাংলাদেশের চাপের প্রসঙ্গ আনে নি সঙ্গত কারণেই, এনেছে তাদের ভিসা প্রাপ্তি সম্পর্কিত বিষয়। এটাই কূটনৈতিক ভাষা কিংবা লড়াই।
খালেদা জিয়ার আইনজীবী অ্যালেক্স কার্লাইল যখন ভারতে প্রত্যাখ্যাত হলেন ঠিক এর আগে থেকেই বিএনপি ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়তে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চালিয়েছে। তবে বিএনপির এই ভূমিকায় ভারত যে সাড়া দিয়েছে সে প্রমাণ মেলে না। কার্লাইলের প্রত্যাখ্যাত হওয়াও এক্ষেত্রে আরেকটা উদাহরণ কি এক্ষেত্রে, বলা যাচ্ছে না এখনই!
আসছে ডিসেম্বরে বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচনের সম্ভাবনা রয়েছে। দশম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি বলে বিশ্বের অনেকগুলো দেশই সে নির্বাচনে আপত্তি জানিয়েছিল। ওই সময়ে আওয়ামী লীগের পাশে ছিল ভারত সরকার। বলা হয়ে থাকে আওয়ামী লীগের পক্ষে কেবল ভারত সরকারের সমর্থন থাকার কারণে যুক্তরাষ্ট্র সহ অনেকগুলো দেশের আপত্তি সত্বেও সকল প্রতিকূলতা কাটিয়ে ওঠেছিল আওয়ামী লীগ। এবার আবার সামনে যখন নির্বাচন এবং বেগম খালেদা জিয়া জেলে থাকায় বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। এমন অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র আগামি নির্বাচন নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছে তখন আগেভাগেই আওয়ামী লীগ সরকারের চাওয়ামত কার্লাইলকে ফেরত পাঠিয়েছে ভারত- এনিয়ে বিএনপির উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ রয়েছে।
কার্লাইলের ভারত-পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয় নি, স্রেফ এই বাক্যে পুরো বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করাটা ঠিক হবে না। ভারত বিষয়ক তার তিক্ত অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশে বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও লাভবান হয়েছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের এই লাভ কেবল খালেদা জিয়ার একজন আইনজীবীকেই ঠেকানো নয়, এর সুদূরপ্রসারি প্রভাবও রয়েছে দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক রাজনীতিতেও। এটা আগামি নির্বাচন পর্যন্ত কতটুকু থাকে সেটাও দেখার বিষয়!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)






