টি-টুয়েন্টি রানের খেলা। ব্যাটসম্যানরা ব্যাট চওড়া না করতে পারলে বোলারদের খুব একটা কিছু করারও থাকে না। প্রতিপক্ষের হাতে হালকা লক্ষ্য তুলে দিলে বোলাররা এমনিতেই চোরাগলিতে থাকেন। খেলাটা ক্রিকেট বলেই এরপরও আশাটা থাকে। যদি কোনো ম্যাজিক ঘটে! ঘটেনি। লাহোরে পাকিস্তানকে ১৪২ রানের জবাব দিতে বলেছিল বাংলাদেশ। স্বাগতিকরা জয় তুলেছে ৫ উইকেটে।
গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে শুক্রবার টস জিতে ব্যাটিংয়ে নেমে নির্ধারিত ওভারে ৫ উইকেটে ১৪১ রান তুলেছিল বাংলাদেশ। জবাব দিতে নেমে ৩ বল আর ৫ উইকেট হাতে রেখে জয়ের হাসিতে মাতে পাকিস্তান।
তিন টি-টুয়েন্টির সিরিজে প্রথমটিতে জিতে এগিয়ে গেল স্বাগতিকরা। সফরকারীরা ক্ষত সারিয়ে পরিকল্পনা সাজানোর সময় পাবেন সবে একটা রাত। শনিবারই নেমে পড়তে হবে দ্বিতীয় টি-টুয়েন্টিতে। ম্যাচ শুরু বাংলাদেশ সময় দুপুর ৩টায়।
বাংলাদেশ-১৪১/৫ (২০), পাকিস্তান-১৪২/৫ (১৯.৩)
যদি কিছু ঘটানো যায়! এমন বিশ্বাসের লক্ষ্য গড়া ম্যাচের জন্য তোপদাগা বোলিং করতে হতো। পাকিস্তান রানের খাতা খোলার আগেই শূন্য রানে অধিনায়ক বাবর আজমকে উইকেটের পেছনে লিটনের ক্যাচ বানিয়ে আশাটা দেখিয়েছিলেন শফিউল।
স্বাগতিকদের তারকা ব্যাটসম্যান অফস্টাম্পের বাইরের বলে ড্রাইভ খেলতে যেয়ে গড়বড় করে দেন। রিভিউ নিয়েছিলেন। কিন্তু টি-টুয়েন্টিতে প্রথমবার শূন্য রানে আউট হওয়া ঠেকাতে পারেননি বাবর।
অভিজ্ঞ হাফিজকে ১৭ রানে ফিরিয়ে পরে প্রত্যাশাটা চওড়া করেন মোস্তাফিজ। স্লোয়ারে ওঠা ক্যাচটি শর্ট-এক্সট্রা কাভারে তালুতে জমান আমিনুল।
এরপরই সাবধানী হয়ে পড়ে পাকিস্তান। আহসান আলি ও শোয়েব মালিক মিলে ৪৬ রানের জুটি গড়ে বিপদের সম্ভাবনা অনেকটা দূরে ঠেলে দেন।
আহসান ৩২ বলে ৩৪ করার পর তাকে বদলি ফিল্ডার শান্তর ক্যাচ বানান লেগস্পিনার আমিনুল। খানিক পরে ১৩ বলে ১৬ করা ইফতেখারকে লিটনের গ্লাভসে জমিয়ে আরেকটি ধাক্কা দেন শফিউল।
ইমাদকে (৬) বোল্ড করে আল-আমিন উইকেট তুলে হাসি চওড়া করতে চেয়েছেন। একপ্রান্ত আগলে রাখা শোয়েব মালিক ততক্ষণে যা করার করে ফেলেছেন। ফিফটি তুলে পাকিস্তানকে জয়ের কাছে টেনে নিয়ে।
ম্যাচ শেষ করেই ফিরেছেন মালিক। ৪৫ বলে ৫৮ রানে অপরাজিত থাকেন। ৫ চারে দায়িত্বশীল ইনিংস। রিজওয়ান অপরাজিত থাকেন ৫ রানে।
বোলারদের মধ্যে ৪ ওভারে ২৭ রান দিয়ে ২ উইকেট নিয়ে সফল শফিউল ইসলাম। একটি করে উইকেট নিয়েছেন মোস্তাফিজ, আল-আমিন ও আমিনুল। ফিজ সবচেয়ে খরুচে, ৪ ওভারে বিলিয়েছেন ৪০ রান।
আগে বঙ্গবন্ধু বিপিএলের স্মৃতি লাহোরে ফিরিয়েছেন তামিম ও নাঈম। ঝুলি ভর্তি রান তুলেও ফ্র্যাঞ্চাইজি আসরে স্ট্রাইকরেট স্বল্পতায় সমালোচনায় পুড়েছেন দুজনে। জাতীয় দলের জার্সিতেও চিত্রটা বদলায়নি। মন্থর ব্যাটিংয়ে টি-টুয়েন্টি বিরুদ্ধ প্রদর্শনী দেখিয়েছেন দুই ওপেনার। তাতে ৫ উইকেট হাতে রেখেও পাকিস্তানকে ছোট লক্ষ্যের বেশিকিছু দিতে পারেনি বাংলাদেশ। ফলাফল, রানের খেলায় রান-স্বল্পতায় ডুবে হার!
বাংলাদেশ ইনিংসের প্রথম ওভার। বাঁহাতি স্পিনার ইমাদ ছোট ছোট কদমে এসে বল ছুঁড়ছিলেন। তামিম তারচেয়েও ছোট ছোট কদমে ব্যাট নড়িয়ে গেলেন! প্রথম ওভারে টানা চার ডটের পর নিতে পারেন কেবল ২ রান।
খানিক পরে হাসনাইনের এক ওভারে একটি করে ছয়-চারে ১০ নিয়ে আশা জাগিয়েছিলেন নাঈম। শেষপর্যন্ত খোলস ছাড়া হয়ে ওঠেনি তারও। পাওয়ার প্লের ৬ ওভারে ৩৫ নিতে পেরেছেন দুই ওপেনার। যেখানে তামিমের ১৯ বলে ১৫, নাঈমের ১৭ বলে ২০।
দলীয় ৫০ আসে ৪৬ বলে। মন্থর ব্যাটিংয়ে দুশ্চিন্তার বোঝা ভারি হচ্ছিল। উইকেটে আহামরি কিছু ছিল না। পেসাররা না গতিতে, স্পিনাররা না টার্নে কাবু করতে পারছিলেন। কিন্তু তামিম-নাঈম যেন কাবু হবেন পণ করেই নেমেছিলেন!
ফল, শুরুর জুটিতে পঞ্চাশ যে ধীরলয়ে, ইনিংসের অর্ধেক ছোঁয়ার সময় ১০ ওভারে স্কোরবোর্ডে ধীরলয়েই জমা পড়ে সবেমাত্র ৬১, বিনা উইকেটে। যাতে তামিমের ৩১ বলে ৩১, নাঈমের ২৯ বলে ২৯।
বল সহজেই ব্যাটে আসছিল। প্রতিপক্ষকে প্রচুর ডট দিয়ে আসলে নিজেরাই চাপ চড়িয়ে নিয়েছেন তামিম ইকবাল ও নাঈম শেখ। জুটির রান তোলার মতো দুজনে আউটও হয়েছেন গা ঝাড়া দিয়ে ওঠার আগেই।
শাদাবের যে ওভারে একটা ছক্কা হাঁকিয়েছিলেন তামিম, নড়েচড়ে বসার আগেই সেই ওভারে ভাঙে ১১ ওভারে মাত্র ৭১ তোলা উদ্বোধনী জুটি। ডিপ মিডউইকেটে বল ঠেলে দুই রান তুলতে যেয়ে রানআউটে ফেরেন বাঁহাতি তামিম। ৩৪ বলে এক ছয় আর ৪ চারে ৩৯ রানের ইনিংস তার। স্ট্রাইকরেট ১১৪.৭০।
নাঈম আরেকটু বেশি, ৪৩ রান করেছেন ঠিকই, সেজন্য বল খেলেছেন ৪১টি। ৩ চারে সঙ্গে ২ ছক্কা আছে তার নামের পাশে, স্ট্রাইকরেটটা তামিমের চেয়েও খারাপ, ১০৪.৮৭। শাদাবকে বাতাসে ভাসিয়ে লংঅনে ইফতেখারের তালুতে জমা হয়েছেন তিনি।
সদ্যগত বিপিএলে ঢাকা প্লাটুনের হয়ে ১০৯.৩৯ স্ট্রাইকরেটে তামিম ৩৯৬ রান, আর রংপুর রেঞ্জার্সের হয়ে নাঈম ৩৫৯ রান ১২৩.৭৫ স্ট্রাইকরেটে তুলেছিলেন। নামের পাশে পর্যাপ্ত রান জমিয়েও স্ট্রাইকরেটের কারণে সমালোচনা এড়াতে পারেননি তারা। একই কারণে এবার ভুগল জাতীয় দলও!
তামিম-নাঈম সেই যে তালা দিয়ে যান রান-চাকায়, পরের দিকের ব্যাটসম্যানরা আর সেটার চাবি খুঁজে পাননি। প্রয়োজনের সময় হাত খুলতে যেয়ে লিটন ১৩ বলে ১২, আফিফ ১০ বলে ৯, সৌম্য ৫ বলে ৭ করে বুঝিয়ে যান মন্থর গতির ক্ষতিটা আজ অন্তত পুষিয়ে দিতে পারছেন না।
শাদাবের গুগলি লংঅনে ভাসিয়ে দৌড় শুরু করে রান পূর্ণ করতে না পেরে রানআউট হন লিটন। অভিষিক্ত পেসার হারিস রউফের বলে বোল্ড আফিফ। বাউন্ডারি হাঁকিয়ে ইনিংস শুরু করা সৌম্য শাহিন আফ্রিদির স্লোয়ারে হতে দিয়েছেন স্টাম্প এলোমেলো।
এরপরও টাইগারদের সংগ্রহ ১৪১ পর্যন্ত গেছে। ২ চারে ১৪ বলে অপরাজিত ১৯ করে অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ, আর ৩ বলে অপরাজিত ৫ করে মিঠুন ইনিংসের শেষটা টানায়। সেটা পর্যাপ্ত ছিল না। বোলাররা লড়ার মানসিকতা দেখিয়েও লড়াইয়ে জিততে পারেননি তাই!








