যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতারা জানতেন যে স্বাধীনতা এমন একটি জিনিস যা উদযাপন করতে হয়। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস উদযাপন সময়ের সাথে পাল্টেছে, কিন্তু ৪ জুলাই-এর উৎসব আমেরিকানদের জীবন যাপনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হয়ে রয়েছে।
স্বাধীনতা দিবসটি অবশ্য ৪ জুলাই হওয়ার কথা ছিল না। ১৭৭৫ সালের বসন্তে, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ব্রিটিশ নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং স্বাধীনতার জন্য প্রথম দিককার যুদ্ধগুলোর পর, তেরোটি আমেরিকান উপনিবেশ তাদের প্রতিনিধি পাঠায় ফিলাডেলফিয়ায় অবস্থিত প্রথম কন্টিনেন্টাল কংগ্রেসে। ব্রিটেনের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের বিষয়ে অনেক তর্ক বিতর্কের পর প্রতিনিধিরা সর্বসম্মতিক্রমে ২ জুলাই, ১৭৭৬ সালে স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দেয়।
পরদিন, ম্যাসাচুসেটস প্রতিনিধি জন অ্যাডামস তার স্ত্রীকে লেখা এক চিঠিতে তারিখটি সম্পর্কে বলেন, ‘এখন থেকে শুরু করে সবসময় পর্যন্ত উদযাপন অবশ্যই প্রদর্শনী ও র্যালি, খেলাধুলা, বন্দুক, ঘণ্টা, বনফায়ার এবং মহাদেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত আলো জ্বালিয়ে পালন করতে হবে।’
কন্টিনেন্টাল কংগ্রেসের অনেক প্রতিনিধিই চিন্তিত ছিলেন যে স্বাধীনতার জন্য শুধু ভোটই যথেষ্ট হবে না। তারা তাদের সিদ্ধান্ত পুরো পৃথিবীকে জানাতে চেয়েছেন। স্মরণীয় ভোটের দুই দিন পর কন্টিনেন্টাল কংগ্রেস স্বাধীনতার ঘোষণা অনুমোদন করে এবং নতুন দেশের সব প্রান্তে অনুলিপি পাঠায়। ঘোষণায় ৪ জুলাই তারিখটি লেখা ছিল, নতুন দেশটি তা স্বাধীনতা দিবস হিসেবে বরণ করে নেয়।
আমেরিকানদের উদযাপন করার বিষয়ে অ্যাডামস সঠিক ছিলেন। স্বাধীনতা যে বাস্তবতা তা প্রমাণ করার জন্য যদিও নতুন দেশটি কাজ করে যাচ্ছিল, ৪ জুলাই খুব দ্রুতই প্যারেড, কনসার্ট, ডিনার এবং আতশবাজি দিয়ে উদযাপন শুরু হয়। ১৭৭৭ সালে ফিলাডেলফিয়ায় উৎসবে হেশেন সৈন্যদের একটি ব্যান্ডের করা সঙ্গীত অন্তর্ভুক্ত ছিল- তারা ব্রিটেনের জন্য লড়াই করছিল এবং তার আগের শীতকালে তাদের বন্দী হিসেবে আটক করা হয়।
স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের প্যারেড সামরিক প্রদর্শনী হিসেবে শুরু হলেও খুব দ্রুতই তা সর্বসাধারণের উৎসব হয়ে যায়। ১৭৮৮ সালের ফিলাডেলফিয়ায় হওয়া প্যারেড এক মাইলেরও বেশি দীর্ঘ ছিল, ঘোড়ার গাড়ি এবং সর্বস্তরের কর্মীরা নানা রকমের পোশাক পরে মার্চ করে।
জেমস হাইঞ্জ স্বাধীনতা বিষয়ক একজন অবসরপ্রাপ্ত আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারিক এবং ইতিহাসবিদ, তার তথ্য অনুযায়ী আমেরিকানরা ৪ জুলাই যেভাবে উদযাপন করে তা কিছুটা স্তিমিত হয়ে যায়। ১৯ শতকের বেশিরভাগ সময় উচ্চ, কর্কশ আওয়াজ ছিল এবং এই শব্দ দেশাত্মবোধ হিসেবে বিবেচনা করা হতো- ছোট ছেলেরা আতশবাজির সাথে, খনিশ্রমিকরা ডিনামাইটের সাথে অথবা অনেক শহরে বন্দুকের আওয়াজের মাধ্যমে স্যালুট দেয়া হতো সারা দুপুর।
আঠারো’শ শতকে এই দিনটি পালন করার প্রধান বৈশিষ্ট ছিল সম্মানিত কোন নাগরিকের দেয়া দেশাত্মবোধক বক্তৃতা যা অনেক সময় দুই ঘণ্টাব্যাপী হতো। ‘সেই সময়ে এই ধরনের মিডিয়া অনুষ্ঠান হতো,’ হাইঞ্জ বলেন।
স্বাধীনতা দিবস আমেরিকানরা ভিন্ন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করার জন্যও পালন করে। আমেরিকান গৃহযুদ্ধের দাস প্রথা বিরোধী আন্দোলনের নেতারা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সাধারণত পাঁচ জুলাই মানুষকে মনে করিয়ে দিতে যে আফ্রিকান আমেরিকানদের জন্য বিপ্লবে যে মুক্তির প্রতিশ্রুতি ছিল তা পূরণ হয়নি। গৃহযুদ্ধের শুরু থেকেই দক্ষিণে থাকা আমেরিকানরা ৪ জুলাই উদযাপন বন্ধ করে দেয় কনফেডারেটদের প্রতি তাদের বিশ্বস্ততা প্রকাশ করতে। হাইঞ্জ বলেন, দক্ষিণের বেশ কিছু অংশে প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর পর্যন্ত ৪ জুলাই উদযাপন করা হয়নি।
বর্তমানে বেশিরভাগ নাগরিক আঠারো শ’ শতাব্দীর আমেরিকানদের মতোই উদযাপন করে প্যারেড, পিকনিক, প্রতিবেশিদের সাথে আনন্দ, কনসার্ট, খেলাধুলার অনুষ্ঠান এবং রাতে আতশবাজির প্রদর্শনীর মাধ্যমে। সরকারি অফিসগুলো এবং অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে এবং কর্মীরা সাধারণত পরিশোধিত ছুটি পায়।
৪ জুলাই দেশের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হবারও একটি দিন, ঠিক যেমনটি স্বাধীনতার ঘোষকরা ১৭৭৬ সালে করেছিলেন, ‘আমাদের জীবন, আমাদের ভাগ্য এবং আমাদের পবিত্র সম্মান’ আমেরিকার স্বাধীনতা রক্ষা করতে। অনেক শহরেই এবং অনেক ঐতিহাসিক জায়গায়, হাজারো অভিবাসী আনুগত্যের শপথ করে এবং স্বাধীনতা দিবসে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক মর্যাদা নেয়।










